ঢাকা ০২:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকা ওয়াসা বোর্ড বিলুপ্ত, এমডি মনিরুজ্জামানের হাতে সব ক্ষমতা দুঃখের কথা শুনেই সহায়তার হাত বাড়ালেন মানবিক ডিসি জাহিদ পাওনা টাকা চাওয়ায় ব্যবসায়ীকে মারধর, যুবদল নেতা আল আমিনের বিরুদ্ধে মামলা আরব দলগুলোর সমর্থন পেলে ক্ষমতা হারাতে পারেন নেতানিয়াহু বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে টোলের নামে চাঁদাবাজি, ক্ষুব্ধ পর্যটক ও যাত্রীরা ১২ কেজি এলপিজির দাম ৩০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব ভোটার স্থানান্তরের আবেদনের সময় বাড়ল ১ নভেম্বর পর্যন্ত উখিয়ায় এসআই কিবরিয়াসহ ৩ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ১ লাখ ইয়াবা ও পিস্তল গায়েবের অভিযোগ নেতানিয়াহুর বদলে ‘কম ক্ষতিকর’ প্রধানমন্ত্রী চান গাজাবাসী বরগুনায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত

বাঙালি বিয়ের মজার এক সংস্কৃতি বরের জুতা চুরি

  • ফিচার ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৮:৪১:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১০৬২ বার পড়া হয়েছে

বিয়েতে আপনি কনে পক্ষ, সে হোক কনে আপনার বোন, খালা, ফুফু কিংবা কোনো আত্নীয়। আর আপনি বরের জুতা চুরি এবং সেই সুবাদে বরের পকেট খসানোর ভাগিদার হোননি এমন গল্প বোধহয় কোনো বাঙালির নেই। এটি বাঙালি বিয়ের এক মজার সংস্কৃতি। শহর হোক কিংবা গ্রাম এমনকি বিলেত, বাঙালি বিয়ে মানেই বরের জুতা চুরি হবেই।

বাঙালি বিয়ের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে বরের জুতা চুরি একটি বহুল পরিচিত ও মজাদার রীতি। বিয়ের সময় বর যখন স্টেজে বা মণ্ডপে বসতে যান, তখন সাধারণত তাকে জুতা খুলে রাখতে হয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই কনের বোন, কাজিন বা ঘনিষ্ঠ বান্ধবীরা সুযোগ বুঝে বরের জুতা লুকিয়ে ফেলে। এরপর শুরু হয় দর-কষাকষির পর্ব। জুতা ফেরত পেতে বর বা তার পক্ষকে দিতে হয় টাকা বা উপহার। এই পুরো বিষয়টি হাসি-ঠাট্টা ও আনন্দের মধ্যেই সম্পন্ন হয়, যা বিয়ের আনুষ্ঠানিক গাম্ভীর্যের মাঝে এক ধরনের স্বস্তি ও রঙিন আমেজ তৈরি করে।

jagonews

এই রীতিটির সুনির্দিষ্ট লিখিত ইতিহাস না থাকলেও গবেষক ও সংস্কৃতিবিদদের মতে, এর উৎপত্তি উত্তর ও মধ্য ভারতের হিন্দু বিবাহ প্রথা থেকে। রাজপুত ও ব্রাহ্মণ সমাজে বহু শতাব্দী ধরেই বিয়ের সময় বর ও কনের পরিবারের মধ্যে মজার খেলাধুলার অংশ হিসেবে জুতা লুকানো হতো। পরবর্তী সময়ে এই রীতি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে বাঙালি বিয়ের সংস্কৃতিতেও জায়গা করে নেয়। যদিও এটি ধর্মীয় কোনো বিধান নয়, তবে সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এটি আজও প্রতিষ্ঠিত।

বরের জুতা চুরি শুধু একটি খেলা নয়, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সূক্ষ্ম কৌশল। বিয়ের সময় দুই পরিবারের মানুষ একে অপরের সঙ্গে খুব কাছাকাছি আসে, কিন্তু অনেকেই একে অপরকে ভালোভাবে চেনেন না। এই মজার দর-কষাকষির মধ্য দিয়ে বরপক্ষ ও কনেপক্ষের মধ্যে সহজেই হাসি, কথা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়। এতে বিবাহের শুরুতেই দুই পরিবারের মধ্যে এক ধরনের সৌহার্দ্য ও স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হয়।

jagonews

এই রীতির আরেকটি দিক হলো বরের ধৈর্য ও উদারতার প্রতীকী পরীক্ষা। কনের পরিবারের তরুণীরা যখন জুতো লুকিয়ে নানা দাবি তোলে, তখন বর কীভাবে তা সামলান, কতটা হাসিমুখে দেন এসবও যেন এক ধরনের সামাজিক ইঙ্গিত বহন করে। ধারণা করা হয়, এতে কনের পরিবার বরের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা পায়। পাশাপাশি বর যে উপহার বা টাকা দেন, তা কনের বোনদের জন্য স্মরণীয় আনন্দ হয়ে থাকে।

আধুনিক সময়ে এই রীতি আরও বেশি বিনোদনমূলক রূপ নিয়েছে। এখন অনেক বিয়েতে আগেভাগেই জেনে নেওয়া হয় জুতা লুকানো হবে, কত টাকা চাওয়া হবে সবই যেন এক ধরনের পরিকল্পিত আনন্দ। তবে কখনো কখনো এই মজাটাই বাড়াবাড়িতে রূপ নেয়। অতিরিক্ত টাকা দাবি বা অসম্মানজনক আচরণ হলে তা পারিবারিক অস্বস্তির কারণও হতে পারে। তাই এখন অনেকেই বলেন, এই রীতি যেন আনন্দের সীমা না ছাড়ায়।

jagonews

সব মিলিয়ে বরের জুতা চুরি বাঙালি বিয়ের একটি রঙিন ও প্রাণবন্ত অংশ। এটি শুধু হাসির উপলক্ষ নয়, বরং দুই পরিবারের সম্পর্ককে সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ করে তোলার এক সামাজিক মাধ্যম। ধর্মীয় আচার যেখানে গাম্ভীর্য বহন করে, সেখানে এই ছোট্ট খেলা বিয়েকে আরও মানবিক ও আনন্দমুখর করে তোলে। তাই শত পরিবর্তনের মাঝেও বাঙালি বিয়েতে বরের জুতো চুরি আজও সমান জনপ্রিয় ও প্রত্যাশিত একটি ঐতিহ্য।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা ওয়াসা বোর্ড বিলুপ্ত, এমডি মনিরুজ্জামানের হাতে সব ক্ষমতা

বাঙালি বিয়ের মজার এক সংস্কৃতি বরের জুতা চুরি

আপডেট সময় ০৮:৪১:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

বিয়েতে আপনি কনে পক্ষ, সে হোক কনে আপনার বোন, খালা, ফুফু কিংবা কোনো আত্নীয়। আর আপনি বরের জুতা চুরি এবং সেই সুবাদে বরের পকেট খসানোর ভাগিদার হোননি এমন গল্প বোধহয় কোনো বাঙালির নেই। এটি বাঙালি বিয়ের এক মজার সংস্কৃতি। শহর হোক কিংবা গ্রাম এমনকি বিলেত, বাঙালি বিয়ে মানেই বরের জুতা চুরি হবেই।

বাঙালি বিয়ের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে বরের জুতা চুরি একটি বহুল পরিচিত ও মজাদার রীতি। বিয়ের সময় বর যখন স্টেজে বা মণ্ডপে বসতে যান, তখন সাধারণত তাকে জুতা খুলে রাখতে হয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই কনের বোন, কাজিন বা ঘনিষ্ঠ বান্ধবীরা সুযোগ বুঝে বরের জুতা লুকিয়ে ফেলে। এরপর শুরু হয় দর-কষাকষির পর্ব। জুতা ফেরত পেতে বর বা তার পক্ষকে দিতে হয় টাকা বা উপহার। এই পুরো বিষয়টি হাসি-ঠাট্টা ও আনন্দের মধ্যেই সম্পন্ন হয়, যা বিয়ের আনুষ্ঠানিক গাম্ভীর্যের মাঝে এক ধরনের স্বস্তি ও রঙিন আমেজ তৈরি করে।

jagonews

এই রীতিটির সুনির্দিষ্ট লিখিত ইতিহাস না থাকলেও গবেষক ও সংস্কৃতিবিদদের মতে, এর উৎপত্তি উত্তর ও মধ্য ভারতের হিন্দু বিবাহ প্রথা থেকে। রাজপুত ও ব্রাহ্মণ সমাজে বহু শতাব্দী ধরেই বিয়ের সময় বর ও কনের পরিবারের মধ্যে মজার খেলাধুলার অংশ হিসেবে জুতা লুকানো হতো। পরবর্তী সময়ে এই রীতি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে বাঙালি বিয়ের সংস্কৃতিতেও জায়গা করে নেয়। যদিও এটি ধর্মীয় কোনো বিধান নয়, তবে সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এটি আজও প্রতিষ্ঠিত।

বরের জুতা চুরি শুধু একটি খেলা নয়, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সূক্ষ্ম কৌশল। বিয়ের সময় দুই পরিবারের মানুষ একে অপরের সঙ্গে খুব কাছাকাছি আসে, কিন্তু অনেকেই একে অপরকে ভালোভাবে চেনেন না। এই মজার দর-কষাকষির মধ্য দিয়ে বরপক্ষ ও কনেপক্ষের মধ্যে সহজেই হাসি, কথা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়। এতে বিবাহের শুরুতেই দুই পরিবারের মধ্যে এক ধরনের সৌহার্দ্য ও স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হয়।

jagonews

এই রীতির আরেকটি দিক হলো বরের ধৈর্য ও উদারতার প্রতীকী পরীক্ষা। কনের পরিবারের তরুণীরা যখন জুতো লুকিয়ে নানা দাবি তোলে, তখন বর কীভাবে তা সামলান, কতটা হাসিমুখে দেন এসবও যেন এক ধরনের সামাজিক ইঙ্গিত বহন করে। ধারণা করা হয়, এতে কনের পরিবার বরের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা পায়। পাশাপাশি বর যে উপহার বা টাকা দেন, তা কনের বোনদের জন্য স্মরণীয় আনন্দ হয়ে থাকে।

আধুনিক সময়ে এই রীতি আরও বেশি বিনোদনমূলক রূপ নিয়েছে। এখন অনেক বিয়েতে আগেভাগেই জেনে নেওয়া হয় জুতা লুকানো হবে, কত টাকা চাওয়া হবে সবই যেন এক ধরনের পরিকল্পিত আনন্দ। তবে কখনো কখনো এই মজাটাই বাড়াবাড়িতে রূপ নেয়। অতিরিক্ত টাকা দাবি বা অসম্মানজনক আচরণ হলে তা পারিবারিক অস্বস্তির কারণও হতে পারে। তাই এখন অনেকেই বলেন, এই রীতি যেন আনন্দের সীমা না ছাড়ায়।

jagonews

সব মিলিয়ে বরের জুতা চুরি বাঙালি বিয়ের একটি রঙিন ও প্রাণবন্ত অংশ। এটি শুধু হাসির উপলক্ষ নয়, বরং দুই পরিবারের সম্পর্ককে সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ করে তোলার এক সামাজিক মাধ্যম। ধর্মীয় আচার যেখানে গাম্ভীর্য বহন করে, সেখানে এই ছোট্ট খেলা বিয়েকে আরও মানবিক ও আনন্দমুখর করে তোলে। তাই শত পরিবর্তনের মাঝেও বাঙালি বিয়েতে বরের জুতো চুরি আজও সমান জনপ্রিয় ও প্রত্যাশিত একটি ঐতিহ্য।