ঢাকা ১০:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর মহা দুর্নীতিবাজ, টিপু মুন্সির ভায়রা আবু নাসের চৌধুরীর ঢাকায় পোষ্টিং শিক্ষা প্রকৌশলী আলেক হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পিলার ও কয়েন চক্রের মূলহোতা ফরিদপুরের আওয়ামী নেতা আব্দুস সোবহান মিথ্যা বলাৎকারের মামলায় পাঁচ মাস ধরে কারাবন্দি শ্রমজীবী মোতালেব হোসেন দুর্নীতির অভিযোগ ঝুলে থাকতেই এলজিইডির শীর্ষ পদে বেলাল হোসেন শহীদুল্লাহ সিন্ডিকেটের ৩৮৭ কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্য আমিনবাজার ভূমি অফিসে ঘুষের আখড়া নাজির-ক্যাশিয়ার সাজেদুল ও সহযোগীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ ভবভদী আদর্শ যুব সংঘ’-এর উদ্যোগে অসহায়দের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ ভোলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

দুর্নীতির অভিযোগ ঝুলে থাকতেই এলজিইডির শীর্ষ পদে বেলাল হোসেন

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নতুন প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. বেলাল হোসেনের রুটিন দায়িত্ব গ্রহণের পর সংস্থাটিকে ঘিরে বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল হওয়া গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তার এই দায়িত্ব পাওয়া প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে সরকারি ব্যাখ্যায় এটি একটি নিয়মিত ও অস্থায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা, অন্যদিকে অভিযোগের মাত্রা ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখছে।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফা অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে মো. বেলাল হোসেনকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি স্থায়ী পদায়ন নয় এবং তিনি প্রায় ছয় মাস এই দায়িত্ব পালন করবেন। প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকেই এ ধরনের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে এবং এতে ব্যতিক্রমের সুযোগ সীমিত।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রধান প্রকৌশলীর পদটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি এলজিইডির সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী পদগুলোর একটি। এই পদ থেকে প্রকল্প অনুমোদন, বাজেট ব্যবস্থাপনা, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। ফলে দায়িত্বটি অস্থায়ী হলেও এর গুরুত্ব ও ক্ষমতা কোনো অংশেই কমে না। এমন অবস্থায় দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে এই দায়িত্বে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

দুদকে দাখিল করা অভিযোগপত্রে মো. বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্ঞাত আয়ের বাইরে শত কোটি টাকার বেশি সম্পদ অর্জন, উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন না করেই বিল উত্তোলন, একই প্রকল্পে একাধিকবার বরাদ্দ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, এবং অবৈধ পদোন্নতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। অভিযোগকারী হিসেবে এলজিইডিরই একজন কর্মকর্তা নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন, যিনি দাবি করেছেন যে এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে সংঘটিত হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বেলাল হোসেন চাকরিজীবনের শুরুতে একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে সীমিত আর্থিক অবস্থায় কর্মজীবন শুরু করেন। তবে পরবর্তী সময়ে তার সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, প্লট, বহুতল ভবন এবং বিভিন্ন জেলায় বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির মালিকানা তার নামে রয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, এসব সম্পদের বাজারমূল্য শত কোটি টাকারও বেশি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগগুলো বর্তমানে যাচাই-বাছাইয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। যাচাই শেষে কমিশন প্রয়োজন মনে করলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করবে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট তদন্তের অগ্রগতি, সময়সীমা বা সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করা হয়নি। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—যদি তদন্ত চলমান বা আসন্ন হয়, তাহলে তদন্তাধীন কর্মকর্তাকে শীর্ষ পদে রেখে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক নাগরিক সমাজ প্রতিনিধি মনে করছেন, এটি একটি নীতিগত দ্বন্দ্বের বিষয়। একদিকে আইনের মূল নীতি অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সততা ও পেশাগত সুনাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, গুরুতর অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এমন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে রাখা হলে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এলজিইডির ভেতরের কর্মকর্তাদের মধ্যেও এই নিয়োগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শীর্ষ পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ থাকলে মাঠপর্যায়ে এক ধরনের অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সময় কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ভোগেন, কারণ ভবিষ্যতে কোনো সিদ্ধান্ত তদন্তের আওতায় এলে তা ব্যক্তিগত ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এতে স্বাভাবিক প্রশাসনিক গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

একজন মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে শীর্ষ নেতৃত্বের নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীর্ষে যদি বিতর্ক থাকে, তাহলে নিচের স্তরে দুর্নীতিবিরোধী নির্দেশনা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। তার মতে, এতে কর্মীদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে একটি নিয়মিত ব্যবস্থা, তবুও সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ মনে করছে যে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারত। তাদের মতে, কেবল জ্যেষ্ঠতা নয়, সততা ও সুনামকেও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় আনা উচিত ছিল।

একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনআস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর অভিযোগ থাকা অবস্থায় কাউকে শীর্ষ দায়িত্ব দিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে যে দুর্নীতির অভিযোগের কোনো বাস্তব প্রভাব নেই। এতে দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এলজিইডি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে পরিচিত। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, বাজার উন্নয়নসহ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব এই সংস্থার ওপর ন্যস্ত। এসব প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন জড়িত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংস্থায় দুর্নীতি হলে তার প্রভাব শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নিম্নমানের অবকাঠামোর কারণে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে এলজিইডির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই জনস্বার্থে বড় গুরুত্ব বহন করে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, তদন্ত প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি, যাতে সত্য উদঘাটিত হয় এবং দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

এদিকে এসব অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যেও মো. বেলাল হোসেনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ বা রিসিভ হয়নি বলে জানা গেছে। সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার অবস্থান বা ব্যাখ্যা অজানাই রয়ে গেছে, যা বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতা অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহ ও প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে দেয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারত এবং জনগণও একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা পেত।

সব মিলিয়ে, এলজিইডির নতুন প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণ প্রশাসনের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একদিকে নিয়ম ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ ও জনআস্থার প্রশ্ন—এই দুইয়ের সমন্বয় করা সহজ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, তদন্ত প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও স্বাধীনভাবে এগিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনে সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ অপরাধী নন—এটি আইনের মৌলিক নীতি। তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে সততা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এলজিইডির শীর্ষ পদে মো. বেলাল হোসেনের রুটিন দায়িত্ব গ্রহণ সেই দায়িত্ব পালনের পরীক্ষাই এখন সামনে এনে দিয়েছে। তদন্তের ফলাফল ও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এই বিতর্ক কোন পথে গড়ায় এবং এলজিইডি তার বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা ধরে রাখতে পারে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ

দুর্নীতির অভিযোগ ঝুলে থাকতেই এলজিইডির শীর্ষ পদে বেলাল হোসেন

আপডেট সময় ০৪:৪৮:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নতুন প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. বেলাল হোসেনের রুটিন দায়িত্ব গ্রহণের পর সংস্থাটিকে ঘিরে বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল হওয়া গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তার এই দায়িত্ব পাওয়া প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে সরকারি ব্যাখ্যায় এটি একটি নিয়মিত ও অস্থায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা, অন্যদিকে অভিযোগের মাত্রা ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখছে।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফা অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে মো. বেলাল হোসেনকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি স্থায়ী পদায়ন নয় এবং তিনি প্রায় ছয় মাস এই দায়িত্ব পালন করবেন। প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকেই এ ধরনের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে এবং এতে ব্যতিক্রমের সুযোগ সীমিত।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রধান প্রকৌশলীর পদটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি এলজিইডির সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী পদগুলোর একটি। এই পদ থেকে প্রকল্প অনুমোদন, বাজেট ব্যবস্থাপনা, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। ফলে দায়িত্বটি অস্থায়ী হলেও এর গুরুত্ব ও ক্ষমতা কোনো অংশেই কমে না। এমন অবস্থায় দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে এই দায়িত্বে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

দুদকে দাখিল করা অভিযোগপত্রে মো. বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্ঞাত আয়ের বাইরে শত কোটি টাকার বেশি সম্পদ অর্জন, উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন না করেই বিল উত্তোলন, একই প্রকল্পে একাধিকবার বরাদ্দ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, এবং অবৈধ পদোন্নতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। অভিযোগকারী হিসেবে এলজিইডিরই একজন কর্মকর্তা নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন, যিনি দাবি করেছেন যে এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে সংঘটিত হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বেলাল হোসেন চাকরিজীবনের শুরুতে একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে সীমিত আর্থিক অবস্থায় কর্মজীবন শুরু করেন। তবে পরবর্তী সময়ে তার সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, প্লট, বহুতল ভবন এবং বিভিন্ন জেলায় বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির মালিকানা তার নামে রয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, এসব সম্পদের বাজারমূল্য শত কোটি টাকারও বেশি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগগুলো বর্তমানে যাচাই-বাছাইয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। যাচাই শেষে কমিশন প্রয়োজন মনে করলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করবে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট তদন্তের অগ্রগতি, সময়সীমা বা সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করা হয়নি। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—যদি তদন্ত চলমান বা আসন্ন হয়, তাহলে তদন্তাধীন কর্মকর্তাকে শীর্ষ পদে রেখে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক নাগরিক সমাজ প্রতিনিধি মনে করছেন, এটি একটি নীতিগত দ্বন্দ্বের বিষয়। একদিকে আইনের মূল নীতি অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সততা ও পেশাগত সুনাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, গুরুতর অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এমন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে রাখা হলে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এলজিইডির ভেতরের কর্মকর্তাদের মধ্যেও এই নিয়োগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শীর্ষ পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ থাকলে মাঠপর্যায়ে এক ধরনের অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সময় কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ভোগেন, কারণ ভবিষ্যতে কোনো সিদ্ধান্ত তদন্তের আওতায় এলে তা ব্যক্তিগত ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এতে স্বাভাবিক প্রশাসনিক গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

একজন মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে শীর্ষ নেতৃত্বের নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীর্ষে যদি বিতর্ক থাকে, তাহলে নিচের স্তরে দুর্নীতিবিরোধী নির্দেশনা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। তার মতে, এতে কর্মীদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে একটি নিয়মিত ব্যবস্থা, তবুও সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ মনে করছে যে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারত। তাদের মতে, কেবল জ্যেষ্ঠতা নয়, সততা ও সুনামকেও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় আনা উচিত ছিল।

একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনআস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর অভিযোগ থাকা অবস্থায় কাউকে শীর্ষ দায়িত্ব দিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে যে দুর্নীতির অভিযোগের কোনো বাস্তব প্রভাব নেই। এতে দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এলজিইডি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে পরিচিত। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, বাজার উন্নয়নসহ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব এই সংস্থার ওপর ন্যস্ত। এসব প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন জড়িত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংস্থায় দুর্নীতি হলে তার প্রভাব শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নিম্নমানের অবকাঠামোর কারণে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে এলজিইডির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই জনস্বার্থে বড় গুরুত্ব বহন করে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, তদন্ত প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি, যাতে সত্য উদঘাটিত হয় এবং দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

এদিকে এসব অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যেও মো. বেলাল হোসেনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ বা রিসিভ হয়নি বলে জানা গেছে। সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার অবস্থান বা ব্যাখ্যা অজানাই রয়ে গেছে, যা বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতা অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহ ও প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে দেয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারত এবং জনগণও একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা পেত।

সব মিলিয়ে, এলজিইডির নতুন প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণ প্রশাসনের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একদিকে নিয়ম ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ ও জনআস্থার প্রশ্ন—এই দুইয়ের সমন্বয় করা সহজ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, তদন্ত প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও স্বাধীনভাবে এগিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনে সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ অপরাধী নন—এটি আইনের মৌলিক নীতি। তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে সততা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এলজিইডির শীর্ষ পদে মো. বেলাল হোসেনের রুটিন দায়িত্ব গ্রহণ সেই দায়িত্ব পালনের পরীক্ষাই এখন সামনে এনে দিয়েছে। তদন্তের ফলাফল ও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এই বিতর্ক কোন পথে গড়ায় এবং এলজিইডি তার বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা ধরে রাখতে পারে।