ঢাকা ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর মহা দুর্নীতিবাজ, টিপু মুন্সির ভায়রা আবু নাসের চৌধুরীর ঢাকায় পোষ্টিং শিক্ষা প্রকৌশলী আলেক হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পিলার ও কয়েন চক্রের মূলহোতা ফরিদপুরের আওয়ামী নেতা আব্দুস সোবহান মিথ্যা বলাৎকারের মামলায় পাঁচ মাস ধরে কারাবন্দি শ্রমজীবী মোতালেব হোসেন দুর্নীতির অভিযোগ ঝুলে থাকতেই এলজিইডির শীর্ষ পদে বেলাল হোসেন শহীদুল্লাহ সিন্ডিকেটের ৩৮৭ কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্য আমিনবাজার ভূমি অফিসে ঘুষের আখড়া নাজির-ক্যাশিয়ার সাজেদুল ও সহযোগীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ ভবভদী আদর্শ যুব সংঘ’-এর উদ্যোগে অসহায়দের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ ভোলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

স্বৈরাচারের দোসরদের পদোন্নতি দিয়েছে মাসুদ

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতির প্রক্রিয়া ঘিরে উত্তেজনা এবং বিতর্কের ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত। তবে, পদোন্নতি সংক্রান্ত সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো এখন গোপন তথ্য এবং অনিয়মের অভিযোগের কারণে সরাসরি নজরে এসেছে। বিশেষভাবে বিতর্কের কেন্দ্রে আছেন কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ও পদোন্নতি কমিটির সদস্য-সচিব সালাউদ্দিন মাসুদ।

সালাউদ্দিন মাসুদের পদোন্নতি কমিটিতে দায়িত্ব পালনের সময়, প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজনকে উপমহাব্যবস্থাপক পদে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পদোন্নতির মধ্যে মূল বিতর্কের বিষয় হলো, পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যার অভিযোগসহ বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, তাদের বয়সসীমা অতিক্রমের তথ্য এবং সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার বিষয়গুলোও পদোন্নতি কমিটির কাছে গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রথম ব্যক্তির মধ্যে একজন হলেন মো. ফারুক আহমদ। তিনি বর্তমানে উপমহাব্যবস্থাপক পদে কর্মরত। পদোন্নতি পাওয়ার আগে তিনি সহকারী ব্যবস্থাপক (সাধারণ) পদে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় তার নাম সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলা তালিকাভুক্ত। এই বিষয়গুলো পদোন্নতি কমিটির নিকট গোপন রাখা হয়। মো. ফারুক আহমদ এর আগে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা নিষিদ্ধ। সেইসাথে, তিনি চাকরিতে প্রবেশের সময় বয়সসীমা অতিক্রম করেছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদের সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন, যা পরে যাচাই করে ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সবকিছু সত্ত্বেও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন সৈয়দ মোরশেদ উল্লাহ। তিনি সহকারী প্রকৌশলী (কারিগরি) পদে ছিলেন এবং বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে উপমহাব্যবস্থাপক পদে উন্নীত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ তিনটি গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এসব মামলার জন্য তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। তাছাড়া, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় তার বয়সসীমা অতিক্রমের বিষয়টি গোপন করা হয়েছিল। তিনি পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। এই বিষয়গুলো পদোন্নতি কমিটির কাছে জানা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

তৃতীয় ব্যক্তি হলেন কাউছার নুর লিটন। গত ১ ডিসেম্বর তিনি সহকারী ব্যবস্থাপক (সাধারণ) থেকে উপমহাব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। অভিযোগ আছে, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। এ ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় নিষিদ্ধ, কিন্তু পদোন্নতি কমিটি এই বিষয়টি যাচাই বা প্রকাশ করেনি।

এই তিন কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রক্রিয়ার পেছনে সরাসরি ভূমিকা রাখেন সালাউদ্দিন মাসুদ। তিনি পদোন্নতি কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, সালাউদ্দিন মাসুদ পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সময় মামলার অবস্থা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, বয়সসীমা এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যাচাই না করেই পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ আছে, তিনি কিছু বিষয় সচেতনভাবে গোপন রেখেছেন।

সালাউদ্দিন মাসুদের এই পদক্ষেপ প্রতিষ্ঠানটির নিয়মানুযায়ী প্রশ্নবিদ্ধ। সার্ভিস রুলস এবং সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা, বয়সসীমা অতিক্রম এবং রাজনৈতিক পদে সক্রিয় থাকা ব্যক্তিরা পদোন্নতির জন্য অযোগ্য। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এই নিয়মগুলো উপেক্ষা করে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কেজিডিসিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদোন্নতি কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে সালাউদ্দিন মাসুদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তিনি দায়িত্বপালনের সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেননি। তথ্য যাচাই না করা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গোপন রাখার কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এমনকি কিছু কর্মকর্তার ক্ষেত্রে আদালতে চলমান মামলা থাকার বিষয়টি কমিটির নোটিশে থাকলেও পদোন্নতি দেওয়া হয়।

কর্মকর্তাদের মতে, সালাউদ্দিন মাসুদের এই পদক্ষেপ কেবল নীতিভঙ্গ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। তিনি দায়িত্ব পালনকালে পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে বিষয়গুলোকে গোপন রাখেন। এতে প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতি বিষয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা এবং সার্ভিস রুলস মানা না হলে এটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। বিশেষ করে কর্ণফুলী গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দায়িত্বপালনে নৈতিকতা ও নিয়ম অমান্য করেন, তা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা ও জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়।

উল্লেখযোগ্য যে, পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সময়ে সালাউদ্দিন মাসুদ কতটা সক্রিয়ভাবে এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছেন তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ মনে করেন তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিষয়গুলো যাচাই করেননি, কেউ আবার মনে করেন তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু তথ্য গোপন রেখেছেন। তবে বিষয়টি নিয়োগ ও প্রশাসন উভয় দিকেই বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সালাউদ্দিন মাসুদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।

পদোন্নতি বিতর্কের এই ঘটনা শুধুমাত্র কর্ণফুলী গ্যাসকে নয়, বরং দেশের সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার দিকেও নতুন আলো ফেলে। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা, বয়সসীমা, রাজনৈতিক নিষিদ্ধতা এবং ফৌজদারি মামলার বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা না হলে তা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পক্ষপাত নয়, বরং প্রতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ও ডেকে আনতে পারে।

কর্মকর্তাদের মতে, সালাউদ্দিন মাসুদের পদোন্নতি কমিটিতে দায়িত্ব পালনকালে এই ধরনের নিয়মানুগ অনিয়ম প্রকাশ পেলে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে কর্মীদের মধ্যে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থা হ্রাস পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সকল তথ্যের যথাযথ যাচাই ও প্রকাশ অপরিহার্য। সালাউদ্দিন মাসুদের মতো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এমন সতর্কতা অবলম্বন না করলে পদোন্নতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

পদোন্নতি বিতর্কের পেছনে সালাউদ্দিন মাসুদের ভূমিকা কেবল নীতি লঙ্ঘন নয়, বরং সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করার মতো গুরুতর বিষয়। প্রতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক নৈতিকতা বজায় রাখতে হলে এমন প্রক্রিয়া পুনঃমূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এ ঘটনা চট্টগ্রামের স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সালাউদ্দিন মাসুদের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা না থাকার কারণে এটি কেবল কর্ণফুলী গ্যাস নয়, দেশের অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়ারও নজির তৈরি করতে পারে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ

স্বৈরাচারের দোসরদের পদোন্নতি দিয়েছে মাসুদ

আপডেট সময় ১২:৩২:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতির প্রক্রিয়া ঘিরে উত্তেজনা এবং বিতর্কের ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত। তবে, পদোন্নতি সংক্রান্ত সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো এখন গোপন তথ্য এবং অনিয়মের অভিযোগের কারণে সরাসরি নজরে এসেছে। বিশেষভাবে বিতর্কের কেন্দ্রে আছেন কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ও পদোন্নতি কমিটির সদস্য-সচিব সালাউদ্দিন মাসুদ।

সালাউদ্দিন মাসুদের পদোন্নতি কমিটিতে দায়িত্ব পালনের সময়, প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজনকে উপমহাব্যবস্থাপক পদে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পদোন্নতির মধ্যে মূল বিতর্কের বিষয় হলো, পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যার অভিযোগসহ বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, তাদের বয়সসীমা অতিক্রমের তথ্য এবং সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার বিষয়গুলোও পদোন্নতি কমিটির কাছে গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রথম ব্যক্তির মধ্যে একজন হলেন মো. ফারুক আহমদ। তিনি বর্তমানে উপমহাব্যবস্থাপক পদে কর্মরত। পদোন্নতি পাওয়ার আগে তিনি সহকারী ব্যবস্থাপক (সাধারণ) পদে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় তার নাম সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলা তালিকাভুক্ত। এই বিষয়গুলো পদোন্নতি কমিটির নিকট গোপন রাখা হয়। মো. ফারুক আহমদ এর আগে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা নিষিদ্ধ। সেইসাথে, তিনি চাকরিতে প্রবেশের সময় বয়সসীমা অতিক্রম করেছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদের সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন, যা পরে যাচাই করে ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সবকিছু সত্ত্বেও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন সৈয়দ মোরশেদ উল্লাহ। তিনি সহকারী প্রকৌশলী (কারিগরি) পদে ছিলেন এবং বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে উপমহাব্যবস্থাপক পদে উন্নীত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ তিনটি গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এসব মামলার জন্য তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। তাছাড়া, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় তার বয়সসীমা অতিক্রমের বিষয়টি গোপন করা হয়েছিল। তিনি পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। এই বিষয়গুলো পদোন্নতি কমিটির কাছে জানা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

তৃতীয় ব্যক্তি হলেন কাউছার নুর লিটন। গত ১ ডিসেম্বর তিনি সহকারী ব্যবস্থাপক (সাধারণ) থেকে উপমহাব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। অভিযোগ আছে, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। এ ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় নিষিদ্ধ, কিন্তু পদোন্নতি কমিটি এই বিষয়টি যাচাই বা প্রকাশ করেনি।

এই তিন কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রক্রিয়ার পেছনে সরাসরি ভূমিকা রাখেন সালাউদ্দিন মাসুদ। তিনি পদোন্নতি কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, সালাউদ্দিন মাসুদ পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সময় মামলার অবস্থা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, বয়সসীমা এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যাচাই না করেই পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ আছে, তিনি কিছু বিষয় সচেতনভাবে গোপন রেখেছেন।

সালাউদ্দিন মাসুদের এই পদক্ষেপ প্রতিষ্ঠানটির নিয়মানুযায়ী প্রশ্নবিদ্ধ। সার্ভিস রুলস এবং সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা, বয়সসীমা অতিক্রম এবং রাজনৈতিক পদে সক্রিয় থাকা ব্যক্তিরা পদোন্নতির জন্য অযোগ্য। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এই নিয়মগুলো উপেক্ষা করে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কেজিডিসিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদোন্নতি কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে সালাউদ্দিন মাসুদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তিনি দায়িত্বপালনের সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেননি। তথ্য যাচাই না করা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গোপন রাখার কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এমনকি কিছু কর্মকর্তার ক্ষেত্রে আদালতে চলমান মামলা থাকার বিষয়টি কমিটির নোটিশে থাকলেও পদোন্নতি দেওয়া হয়।

কর্মকর্তাদের মতে, সালাউদ্দিন মাসুদের এই পদক্ষেপ কেবল নীতিভঙ্গ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। তিনি দায়িত্ব পালনকালে পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে বিষয়গুলোকে গোপন রাখেন। এতে প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতি বিষয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা এবং সার্ভিস রুলস মানা না হলে এটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। বিশেষ করে কর্ণফুলী গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দায়িত্বপালনে নৈতিকতা ও নিয়ম অমান্য করেন, তা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা ও জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়।

উল্লেখযোগ্য যে, পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সময়ে সালাউদ্দিন মাসুদ কতটা সক্রিয়ভাবে এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছেন তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ মনে করেন তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিষয়গুলো যাচাই করেননি, কেউ আবার মনে করেন তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু তথ্য গোপন রেখেছেন। তবে বিষয়টি নিয়োগ ও প্রশাসন উভয় দিকেই বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সালাউদ্দিন মাসুদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।

পদোন্নতি বিতর্কের এই ঘটনা শুধুমাত্র কর্ণফুলী গ্যাসকে নয়, বরং দেশের সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার দিকেও নতুন আলো ফেলে। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা, বয়সসীমা, রাজনৈতিক নিষিদ্ধতা এবং ফৌজদারি মামলার বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা না হলে তা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পক্ষপাত নয়, বরং প্রতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ও ডেকে আনতে পারে।

কর্মকর্তাদের মতে, সালাউদ্দিন মাসুদের পদোন্নতি কমিটিতে দায়িত্ব পালনকালে এই ধরনের নিয়মানুগ অনিয়ম প্রকাশ পেলে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে কর্মীদের মধ্যে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থা হ্রাস পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সকল তথ্যের যথাযথ যাচাই ও প্রকাশ অপরিহার্য। সালাউদ্দিন মাসুদের মতো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এমন সতর্কতা অবলম্বন না করলে পদোন্নতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

পদোন্নতি বিতর্কের পেছনে সালাউদ্দিন মাসুদের ভূমিকা কেবল নীতি লঙ্ঘন নয়, বরং সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করার মতো গুরুতর বিষয়। প্রতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক নৈতিকতা বজায় রাখতে হলে এমন প্রক্রিয়া পুনঃমূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এ ঘটনা চট্টগ্রামের স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সালাউদ্দিন মাসুদের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা না থাকার কারণে এটি কেবল কর্ণফুলী গ্যাস নয়, দেশের অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়ারও নজির তৈরি করতে পারে।