সরকারি উন্নয়ন কাজের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল কি সুপরিকল্পিত অর্থ লুটের এক নীরব মহোৎসব—এমনই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশাসনিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আলোচনায়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের মহাখালী বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ.এইচ.এম. ফয়জুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগ যেন সেই অন্ধকার বাস্তবতার পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভুয়া বিল তৈরি, অসমাপ্ত কাজের বিপরীতে পূর্ণাঙ্গ বিল উত্তোলন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য এবং বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ। অভিযোগের বিবরণে উঠে এসেছে এমন এক চিত্র, যেখানে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প কেবল অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নয়, বরং একটি সংগঠিত আর্থিক সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সরকারি ভবনের সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ আংশিক বা অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও পূর্ণাঙ্গ বিল উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে নিয়মিতভাবে। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি এবং কাগজপত্রে প্রদর্শিত অগ্রগতির মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক। মাঠপর্যায়ে কাজ শেষ না হলেও কাগজে-কলমে তা সম্পন্ন দেখিয়ে বিল ছাড়ের ব্যবস্থা করা হতো বলে অভিযোগকারীদের দাবি। ভুয়া ভাউচার, জাল কাগজপত্র এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতির মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি করে কোটি কোটি টাকার বিল ছাড় করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে সমন্বয় করে ‘কাজ সম্পন্ন’ দেখানোর একটি অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগের আরও গুরুতর অংশ হলো দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের বিষয়টি। বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক দরপত্র আহ্বানের আগেই কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হতো। পরে ওভার দ্য কাউন্টার মেথড (ওটিএম) ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত কৌশল—প্রথমে কাজ শুরু করে পরে প্রশাসনিক বৈধতা দেওয়া, যাতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের সুযোগ দেওয়া যায়। এতে সরকারের আর্থিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্বচ্ছতার নীতিও লঙ্ঘিত হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন।
অর্থবছরের শেষ প্রান্তে তড়িঘড়ি কাজ দেখিয়ে বিল ছাড়ের প্রবণতাও অভিযোগে উঠে এসেছে। বছরের শেষ সময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়েছে এমন দেখিয়ে বড় অঙ্কের বিল অনুমোদন নেওয়া হতো বলে দাবি করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করার সুযোগ থাকত না এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে অগ্রিম বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রেও কমিশনের বিনিময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বকেয়া বিল ছাড় করতে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হতো। বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়া বা কাটছাঁটের ভয় দেখিয়ে নির্দিষ্ট হারে কমিশন আদায়ের একটি অঘোষিত নিয়ম চালু ছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এতে দপ্তরের অভ্যন্তরে এক ধরনের ‘সিন্ডিকেট সংস্কৃতি’ গড়ে ওঠে, যেখানে কমিশন ছাড়া কোনো কাজ অগ্রসর হতো না। অর্থাৎ ফাইলের গতিও নির্ভর করত অনানুষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেনের ওপর।
জুলাই মাসে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি সরকারি স্থাপনার সংস্কার কাজ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্র আহ্বানের আগেই এসব কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে নির্দিষ্ট ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়ার কথাও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বাস্থ্যখাতের কিছু প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সাধারণত এসব কাজ এলটিএম পদ্ধতিতে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ওটিএম পদ্ধতি প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে কাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও অগ্রিম বিল পরিশোধ এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের বিষয়টিও অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সম্পদ অর্জনের বিষয়টি। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার ও তার স্ত্রীর নামে একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি ও প্লট রয়েছে। উল্লেখিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে গুলশান, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা। এছাড়া স্ত্রীর নামে উচ্চমূল্যের এফডিআর এবং বিদেশে অর্থ পাচারের গুঞ্জনের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
এ বিষয়ে ফয়জুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে জানা গেছে। ফলে তার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতির এ ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নীতিগত দিক নিয়ে কথা বলেছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তিনি বলেছেন, দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না। তার মতে, ব্যতিক্রম হিসেবে ছোটখাটো অনিয়মের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের কিছু নজির থাকলেও প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ খুব কম।
তিনি আরও বলেন, আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। শুধুমাত্র বিভাগীয় পদক্ষেপ দুর্নীতি দমনে যথেষ্ট নয় বলে তিনি মত দেন। কার্যকর তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে দুর্নীতির সংস্কৃতি ভাঙতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের ঘটনা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ উন্নয়ন ব্যয়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ, এবং সেই দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়মের প্রভাব পড়ে সরাসরি জনস্বার্থে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট মহল।
মোঃ মামুন হোসেন 























