ঢাকা ১০:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
চেয়ারম্যান-ভাগ্নি জামাই সিন্ডিকেটে দুর্নীতি ও আস্থাহীনতার সংকটে সাউথইস্ট ব্যাংক অবৈধ বালু উত্তোলনের খবর প্রকাশে গঙ্গাচড়ায় সাংবাদিকের বাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা ও মিথ্যা মামলা  সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিককে প্রকাশ্যে মারধর শিশুটি তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরতে চায় দেশে কোচিং সেন্টার শতভাগ বন্ধ করা হবে: শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন মোল্লারহাট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নকল নবিশ পরেশ সমাদ্দারকে ঘিরে নানা অভিযোগ একদিনেই ৬টি যুদ্ধবিমান-ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিতের দাবি আইআরজিসির শিশুর দুই চোখে সুপার গ্লু ঢেলে দিয়েছেন দুলাভাই জ্বালানি সংকটে দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে : অর্থমন্ত্রী ঘাস কাটতে গিয়ে ভারতে বন্দী, ১১ মাস পরে ফিরলো লাশ হয়ে

চেয়ারম্যান-ভাগ্নি জামাই সিন্ডিকেটে দুর্নীতি ও আস্থাহীনতার সংকটে সাউথইস্ট ব্যাংক

দেশের ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতার এই সময়ে বেসরকারি খাতের অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান সাউথইস্ট ব্যাংককে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থা, পরিচালনা কাঠামো এবং শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে সংশ্লিষ্ট মহলে। বিশেষ করে চেয়ারম্যান এম এ কাসেম এবং তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি কথিত সিন্ডিকেটের অভিযোগ ব্যাংকটির ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেট শুধু ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তেই প্রভাব বিস্তার করছে না, বরং নিয়োগ বাণিজ্য ও বদলি বাণিজ্যের মতো অনিয়মেও জড়িয়ে পড়েছে। ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এবং অপছন্দের কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
সাধারণ আমানতকারীরা সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম এ কাসেম তার দীর্ঘ বয়স এবং দায়িত্বের ভারে কার্যত অক্ষম হয়ে পড়েছেন। তারা বলছেন, তার বয়সের কারণে তিনি নিয়মিত ও কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারছেন না, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অদক্ষতা প্রকাশ পাচ্ছে এবং পেশাদারিত্বের অভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যাংকের স্বাভাবিক পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ আমানতকারীরা তাদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তারা মনে করেন, ব্যাংকের সুস্থ পরিচালনা ও গ্রাহক আস্থা পুনঃস্থাপনের জন্য চেয়ারম্যানকে পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি এবং একটি নতুন, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজারের অস্থিরতার মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংককে ইতোমধ্যেই একটি দুর্বল ব্যাংক হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় অনেক আমানতকারী তাদের জমাকৃত অর্থ তুলে নেওয়ার জন্য আবেদন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য স্পষ্ট নয়, তবুও মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
ব্যাংকটির এই ভঙ্গুর অবস্থার জন্য প্রধানত দায়ী করা হচ্ছে এর শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে। চেয়ারম্যান এম এ কাসেমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বয়সজনিত কারণে তিনি আগের মতো সক্রিয় নন এবং পেশাদারিত্বের ঘাটতি তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোতে তার সরাসরি অংশগ্রহণ কমে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চেয়ারম্যান তার ব্যক্তিগত আত্মীয়, বিশেষ করে ভাগ্নি জামাই মুশফিকুর রহমানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং লজিস্টিক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মুশফিকুর রহমানকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট ব্যাংকের বিভিন্ন খাত নিয়ন্ত্রণ করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ব্যাংকের ভেতরের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, নিয়োগ, ক্রয়-বিক্রয়, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেটের প্রভাব স্পষ্ট। অভিযোগ রয়েছে, এসব খাতে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। বিশেষ করে লজিস্টিক বিভাগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয়, অবকাঠামোগত কাজ এবং সরবরাহ চুক্তিতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।
মুশফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি চেয়ারম্যানের নিকট আত্মীয় হওয়ার সুযোগ নিয়ে ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে চাকরি হারানোর ভয় রয়েছে।
চেয়ারম্যান এম এ কাসেমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে। এই অনুসন্ধান ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, কারণ তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে জমি ক্রয়, তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম এবং অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানের জন্য তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে, যারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি কেনার নামে প্রায় ৩০৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। কম মূল্যের জমি বেশি দামে দেখিয়ে এই অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় প্রায় ২৫০ বিঘা জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রায় ৪২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সালে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৮০ কোটি টাকার জমি ৫০০ কোটি টাকা দেখিয়ে কেনা হয়, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। জমি ভরাটের কাজেও অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে আরও ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কেনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আটটি রেঞ্জ রোভার এবং একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি কেনা হয়, যার মোট ব্যয় ২৫ কোটিরও বেশি। এসব গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি এবং চালকের বেতনও বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে বহন করা হয়েছে।
এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অমান্য করে অতিরিক্ত কমিটি গঠন করে সিটিং অ্যালাউন্স নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, নির্ধারিত সংখ্যার বাইরে গিয়ে ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাউথইস্ট ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৪০৮ কোটি টাকার বেশি অর্থ এই ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছিল, যা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এ ধরনের লেনদেন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে।
এসব অভিযোগের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাউথইস্ট ব্যাংকের ওপর। ব্যাংকের গ্রাহকরা এখন তাদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেকেই মনে করছেন, শীর্ষ পর্যায়ে সুশাসনের অভাব থাকলে একটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে তা দ্রুত গ্রাহকদের আস্থাহীনতায় রূপ নেয়। সাউথইস্ট ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সব মিলিয়ে, সাউথইস্ট ব্যাংককে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; বরং পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। চেয়ারম্যান ও তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কথিত সিন্ডিকেট, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এবং তার প্রভাব ব্যাংকের ওপর—সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হয় কি না এবং সংশ্লিষ্টরা কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চেয়ারম্যান-ভাগ্নি জামাই সিন্ডিকেটে দুর্নীতি ও আস্থাহীনতার সংকটে সাউথইস্ট ব্যাংক

চেয়ারম্যান-ভাগ্নি জামাই সিন্ডিকেটে দুর্নীতি ও আস্থাহীনতার সংকটে সাউথইস্ট ব্যাংক

আপডেট সময় ১০:৩৪:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬

দেশের ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতার এই সময়ে বেসরকারি খাতের অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান সাউথইস্ট ব্যাংককে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থা, পরিচালনা কাঠামো এবং শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে সংশ্লিষ্ট মহলে। বিশেষ করে চেয়ারম্যান এম এ কাসেম এবং তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি কথিত সিন্ডিকেটের অভিযোগ ব্যাংকটির ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেট শুধু ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তেই প্রভাব বিস্তার করছে না, বরং নিয়োগ বাণিজ্য ও বদলি বাণিজ্যের মতো অনিয়মেও জড়িয়ে পড়েছে। ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এবং অপছন্দের কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
সাধারণ আমানতকারীরা সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম এ কাসেম তার দীর্ঘ বয়স এবং দায়িত্বের ভারে কার্যত অক্ষম হয়ে পড়েছেন। তারা বলছেন, তার বয়সের কারণে তিনি নিয়মিত ও কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারছেন না, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অদক্ষতা প্রকাশ পাচ্ছে এবং পেশাদারিত্বের অভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যাংকের স্বাভাবিক পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ আমানতকারীরা তাদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তারা মনে করেন, ব্যাংকের সুস্থ পরিচালনা ও গ্রাহক আস্থা পুনঃস্থাপনের জন্য চেয়ারম্যানকে পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি এবং একটি নতুন, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজারের অস্থিরতার মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংককে ইতোমধ্যেই একটি দুর্বল ব্যাংক হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় অনেক আমানতকারী তাদের জমাকৃত অর্থ তুলে নেওয়ার জন্য আবেদন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য স্পষ্ট নয়, তবুও মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
ব্যাংকটির এই ভঙ্গুর অবস্থার জন্য প্রধানত দায়ী করা হচ্ছে এর শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে। চেয়ারম্যান এম এ কাসেমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বয়সজনিত কারণে তিনি আগের মতো সক্রিয় নন এবং পেশাদারিত্বের ঘাটতি তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোতে তার সরাসরি অংশগ্রহণ কমে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চেয়ারম্যান তার ব্যক্তিগত আত্মীয়, বিশেষ করে ভাগ্নি জামাই মুশফিকুর রহমানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং লজিস্টিক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মুশফিকুর রহমানকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট ব্যাংকের বিভিন্ন খাত নিয়ন্ত্রণ করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ব্যাংকের ভেতরের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, নিয়োগ, ক্রয়-বিক্রয়, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেটের প্রভাব স্পষ্ট। অভিযোগ রয়েছে, এসব খাতে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। বিশেষ করে লজিস্টিক বিভাগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয়, অবকাঠামোগত কাজ এবং সরবরাহ চুক্তিতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।
মুশফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি চেয়ারম্যানের নিকট আত্মীয় হওয়ার সুযোগ নিয়ে ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে চাকরি হারানোর ভয় রয়েছে।
চেয়ারম্যান এম এ কাসেমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে। এই অনুসন্ধান ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, কারণ তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে জমি ক্রয়, তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম এবং অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানের জন্য তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে, যারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি কেনার নামে প্রায় ৩০৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। কম মূল্যের জমি বেশি দামে দেখিয়ে এই অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় প্রায় ২৫০ বিঘা জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রায় ৪২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সালে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৮০ কোটি টাকার জমি ৫০০ কোটি টাকা দেখিয়ে কেনা হয়, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। জমি ভরাটের কাজেও অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে আরও ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কেনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আটটি রেঞ্জ রোভার এবং একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি কেনা হয়, যার মোট ব্যয় ২৫ কোটিরও বেশি। এসব গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি এবং চালকের বেতনও বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে বহন করা হয়েছে।
এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অমান্য করে অতিরিক্ত কমিটি গঠন করে সিটিং অ্যালাউন্স নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, নির্ধারিত সংখ্যার বাইরে গিয়ে ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাউথইস্ট ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৪০৮ কোটি টাকার বেশি অর্থ এই ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছিল, যা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এ ধরনের লেনদেন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে।
এসব অভিযোগের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাউথইস্ট ব্যাংকের ওপর। ব্যাংকের গ্রাহকরা এখন তাদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেকেই মনে করছেন, শীর্ষ পর্যায়ে সুশাসনের অভাব থাকলে একটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে তা দ্রুত গ্রাহকদের আস্থাহীনতায় রূপ নেয়। সাউথইস্ট ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সব মিলিয়ে, সাউথইস্ট ব্যাংককে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; বরং পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। চেয়ারম্যান ও তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কথিত সিন্ডিকেট, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এবং তার প্রভাব ব্যাংকের ওপর—সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হয় কি না এবং সংশ্লিষ্টরা কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।