বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অরূপ চক্রবর্তীকে কেন্দ্র করে জেলায় একের পর এক নদী রক্ষা ও বেড়িবাঁধ প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনগণ, সামাজিক সংগঠন এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী অরূপ চক্রবর্তী। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোতে কাজের মানের সঙ্গে আপস করে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ সালে অরূপ চক্রবর্তী বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে একই পদে একই জেলায় দায়িত্ব পালন করলেও নিয়মিত বদলি প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, প্রশাসনিক পরিবর্তন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিভিন্ন দপ্তরে রদবদল হলেও অরূপ চক্রবর্তীর বহাল থাকা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী অরূপ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ঠিকাদারি বিল থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন বিভিন্ন নদী রক্ষা, বেড়িবাঁধ সংস্কার এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গৃহীত প্রকল্পে কাজ পেতে হলে ঠিকাদারদের এই কমিশন দিতে হয় বলে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কমিশন না দিলে কাজের বিল আটকে রাখা হয় অথবা ভবিষ্যতে কাজ না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
এমন অভিযোগের বাস্তব উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে পেকুয়া গোঁয়াখালী রাবার ড্যাম সংলগ্ন বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের ঘটনা। গত ২৬ এপ্রিল পানির তোড়ে ওই এলাকায় নির্মিত একটি নড়বড়ে বাঁধ মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে ভেসে যায়। স্থানীয়দের দাবি, কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি শুরু থেকেই নিম্নমানের কাজের উদাহরণ ছিল। তারা অভিযোগ করেন, প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ কাজের পেছনে ব্যয় না হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, পেকুয়া সদর ইউনিয়ন চারদিক থেকে মাতামুহুরী নদী ও এর শাখা খাল দিয়ে বেষ্টিত একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। বন্যা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকে লোকালয় রক্ষার জন্য এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব বেড়িবাঁধের যথাযথ সংস্কার না হওয়ায় অনেক স্থানে বাঁধ ভেঙে গেছে, কোথাও নিচু হয়ে গেছে এবং কোথাও আবার সরু আইলে পরিণত হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে পড়ে প্রতিবছরই পেকুয়া সদর ইউনিয়ন প্লাবিত হচ্ছে।
গত বছর বর্ষা মৌসুমে বেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে পড়া পানিতে পেকুয়া সদর ইউনিয়নে স্মরণাতীত কালের ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয় বলে স্থানীয়রা জানান। ওই বন্যায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের সময়েও লোকালয় প্লাবিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। বড় জোয়ারের সময় অনেক এলাকায় লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ায় কৃষিজমি ও পানীয় জলের উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি একটি টেকসই ও মানসম্মত বেড়িবাঁধ নির্মাণ।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, পেকুয়া উপজেলার পেকুয়া সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাঘগুজারা ব্রিজ থেকে নন্দীরপাড়ার ৩৬ নম্বর এলাকা পর্যন্ত প্রায় ১৪০০ মিটার দৈর্ঘ্যের বেড়িবাঁধ সংস্কার কাজ চলছে। এই ৬৪/২বি পোল্ডার বেড়িবাঁধটি বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আলম অ্যান্ড ব্রাদার্স এই প্রকল্পের টেন্ডার পায়। দাবি করা হচ্ছে, ইতোমধ্যে এক কিলোমিটারেরও বেশি কাজ শেষ হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সংস্কার কাজ চলাকালীন প্রকল্প এলাকায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতিনিধি বা প্রকৌশলীকে নিয়মিত দেখা যায়নি। এমনকি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তদারকি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিও ছিল না বলে তারা দাবি করেন। প্রকল্প এলাকায় দেখা গেছে কেবল একটি ভেকু মেশিন এবং কয়েকজন শ্রমিক কাজ করছে। স্থানীয়দের মতে, এই কাজ প্রকৃত অর্থে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি কমিশনের ভিত্তিতে পরিচালনা করছেন।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পেকুয়ার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বেড়িবাঁধ সংস্কার কাজটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছেন। তারা পুরনো বেড়িবাঁধের মাটি ভেকু মেশিন দিয়ে কেটে আবার সেই মাটিই সেঁটে দিয়ে সংস্কার কাজ চালাচ্ছেন। কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধের গোড়া থেকে মাটি কেটে উপরের দিকে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে বাইরে থেকে দেখলে বাঁধের স্লোপ বেশি মনে হয়। স্থানীয়দের দাবি, এই পদ্ধতিতে করা কাজ ভবিষ্যতে বাঁধকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে।
এলাকাবাসী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল নামলে বেড়িবাঁধের গোড়া থেকে কাটা মাটি আবার নেমে যাবে এবং পুরো বাঁধটি ধসে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তারা অভিযোগ করেন, বাঁধের বাইরের স্লোপ ও ভেতরের স্লোপ উভয় ক্ষেত্রেই শুভংকরের ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের অর্থ যেমন অপচয় হচ্ছে, তেমনি এলাকার মানুষের জীবন ও সম্পদও চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
পেকুয়া ছাড়াও বান্দরবান সদরের গোয়ালিয়া খোলা নদী রক্ষা প্রকল্প নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, সেখানে নদী তীর সংরক্ষণের নামে যেনতেনভাবে কাজ করা হচ্ছে। একইভাবে বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার শীলেরতোয়া মারমা পাড়ায় মাতামুহুরী নদীর বাম তীরে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের জরুরি নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজ নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। এলাকাবাসীর দাবি, কাজের জন্য যে উপকরণ ব্যবহারের কথা ছিল, তার মান বাস্তবে পাওয়া যায়নি।
মাতামুহুরী নদীর তীর রক্ষা, সাঙ্গু নদীর তীর রক্ষা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা এবং লামা বাজার এলাকায় মাতামুহুরী নদীর বাম তীরে পরিচালিত প্রতিরক্ষা কাজেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রকল্পে ব্যবহৃত সিমেন্ট, রড ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর মান অত্যন্ত নিম্নমানের। এতে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এদিকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন লামা লাইন জিরি নদী রক্ষা বাঁধ প্রকল্প নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এই প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হতে পারে। তারা অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে আঁতাতের কারণে প্রকল্পের কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা হচ্ছে না এবং বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মানুষের মধ্যে চলে যাচ্ছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বাস্তবায়িত অনেক প্রকল্পে নিয়োগ ও উপ-ঠিকাদারি প্রক্রিয়াতেও অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পুরনো চুক্তি ও নির্দিষ্ট অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একই ঠিকাদার গোষ্ঠী বারবার কাজ পাচ্ছে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কিছু কর্মকর্তা লাভবান হচ্ছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামাজিক সংগঠন এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের মতে, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পে দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ক্ষতি করছে না, বরং দুর্যোগপ্রবণ এলাকার সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নদী রক্ষা ও বেড়িবাঁধ প্রকল্পের উদ্দেশ্য যেখানে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেখানে এসব প্রকল্পই এখন মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠছে বলে তারা মন্তব্য করেন।
স্থানীয় জনগণের দাবি, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি। তারা দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী অরূপ চক্রবর্তীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অরূপ চক্রবর্তীর বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলে তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, অভিযোগগুলো সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ অবগত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করছেন, অবিলম্বে এসব প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে এবং ভবিষ্যতে নদী রক্ষা ও বেড়িবাঁধ নির্মাণে টেকসই ও মানসম্মত কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে। তারা মনে করেন, দুর্নীতির অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হলে বান্দরবান জেলার নদী ও বাঁধ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো বারবার ব্যর্থতার মুখে পড়বে এবং এর খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
সংবাদ শিরোনাম ::
বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের অরূপ চক্রবর্তীর দুর্নীতির সিন্ডিকেট
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১২:৫৮:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
- ৫১১ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















