আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ অনিয়ম নিয়ে যখন সারাদেশে আলোচনার ঝড়, তখন ব্যাংকের ভেতরে প্রকাশ্যে থাকা আরেকটি গুরুতর অনিয়ম যেন অদৃশ্য দেয়ালে আটকে আছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগে জুনিয়র পর্যায়ের ৫৫০ জন কর্মকর্তা চাকুরীচ্যুত হয়ে রাস্তায় আন্দোলন করলেও, নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ ও নজিরবিহীন পদোন্নতির অভিযোগে অভিযুক্ত এক নির্বাহী কর্মকর্তা বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক, আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি এবং ব্যাংকের নিজস্ব নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগ তিনটি নিরীক্ষাতেই যার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে, সেই কর্মকর্তা হলেন কাজী শাহেদ জামিল (আইডি নং ০০৭৫৫০)। বর্তমানে তিনি ব্যাংকের উত্তরা মডেল টাউন শাখায় সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) পদে কর্মরত। নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, চট্টগ্রামের একটি প্রভাবশালী শিল্পগ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২০২১ সালে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তার মালিকানাধীন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তাকে সরাসরি ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১২ আগস্ট ২০২১ তারিখে কোনো ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা ছাড়াই কাজী শাহেদ জামিলকে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার (এসইও) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ব্যাংকের এমপ্লয়েজ সার্ভিস রুলস ১৯৯৫ (এমেন্ডেড ২০২০)-এর সরাসরি লঙ্ঘন। বিধি অনুযায়ী, এসইও পদে নিয়োগের জন্য কমপক্ষে তিন বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এবং বয়সসীমা ৩৩ বছরের মধ্যে থাকতে হয়। অথচ নিয়োগের সময় তার বয়স ছিল প্রায় ৩৯ বছর। নিয়োগের দিনই তাকে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে সচিবালয়ে পদায়ন করা হয়। মানব সম্পদ বিভাগের নথি অনুযায়ী, চাকরিতে যোগদানের সময় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত ও অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেটের মূল বা সত্যায়িত কপি জমা না দেওয়ার বিষয়টিও নিরীক্ষায় ধরা পড়ে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে ২০২৩ সালের ঘটনায়। ব্যাংকিং ইতিহাসে বিরল এক কৌশলে কাজী শাহেদ জামিলকে একসঙ্গে পাঁচটি গ্রেডে পদোন্নতি ও সাতটি ইনক্রিমেন্ট দিয়ে সরাসরি এসএভিপি পদে উন্নীত করা হয়। এই উদ্দেশ্যে একই দিনে তাকে প্রথমে পদত্যাগ করানো হয়, এরপর অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং অব্যাহতির দিনেই নতুন ইআইডি দিয়ে পুনঃনিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ সার্ভিস রুলস অনুযায়ী পদত্যাগের ক্ষেত্রে তিন মাসের নোটিশ বা সমপরিমাণ বেতন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা আদায় করা হয়নি।
অন্যদিকে ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগ থেকে তিন মাসের নোটিশ বা তিন মাসের মূল বেতন/সমপরিমাণ টাকা ১.০০ লক্ষ টাকা (৩৩,৬০০দ্ধ৩) আদায় ব্যতীত তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে এবং একইসঙ্গে চাকরি হতে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি সার্ভিস বেনিফিট প্রদানকালে উক্ত ১.০০ লাখ টাকা আদায় না করেই সম্পূর্ণ অর্থ প্রদান করা হয়েছে, যা ব্যাংকের সার্ভিস রুলসের ধারা নং ৭.২.১-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, এসএভিপি পদে নিয়োগের জন্য যেখানে ন্যূনতম ১২ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, সেখানে কাজী শাহেদ জামিল ব্যাংকে চাকরি করেছেন মাত্র এক বছর আট মাস ২৮ দিন। তবুও বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই তাকে পুনঃনিয়োগ ও ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা হয়। অর্থাৎ ব্যাংকিং অভিজ্ঞতার বিষয় বিবেচনা না করেই তাকে এসএভিপি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা সার্ভিস রুলসের পরিপন্থী। তদুপরি সার্ভিস রুলসের ১৩.৩ ধারা অনুযায়ী, কাজী শাহেদ জামিলকে সাতটি ইনক্রিমেন্টসহ সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) পদে পুনঃনিয়োগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বোর্ডের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে প্রথমে তাকে চেয়ারম্যান সেক্রেটারিয়েট থেকে রিটেইল ডিভিশনে, পরে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনে বদলি করা হয়। ব্যাংকের অভ্যন্তরে সমালোচনা তীব্র হলে গত ১৫ ডিসেম্বর তাকে উত্তরা মডেল টাউন শাখায় বদলি করা হয়। তবে বদলি ছাড়া এখনো পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ব্যাংকের নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অজ্ঞাত কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান জালাল আহমেদ বলেন, “বিষয়টি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে তদন্তাধীন রয়েছে।”
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “অভিযোগটি আমাদের নজরে এসেছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রশ্ন থেকেই যায় যেখানে শত শত কর্মকর্তা নিয়োগ অনিয়মের অভিযোগে চাকরি হারিয়ে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন, সেখানে কীভাবে অডিটে প্রমাণিত গুরুতর অনিয়মের পরও একজন প্রভাবশালী নির্বাহী বহাল থাকেন এই প্রশ্ন এখন আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরেই নয়, গোটা ব্যাংকিং খাতে আলোচনার কেন্দ্রে।
সংবাদ শিরোনাম ::
নিয়োগ জালিয়াতির শীর্ষে আল-আরাফাহ্ ব্যাংক
-
মোঃ মামুন হোসেন - আপডেট সময় ১২:০৪:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
- ৫১০ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ















