মেধা, পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে যে সকল কর্মকর্তারা ধাপে ধাপে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) কে উন্নতির শিখরে পৌছে দিচ্ছে। অথচ সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগে উদ্দেশ্য প্রনোদিত বিতর্কিত এক মানদন্ড তৈরি করে তাদেরকেই এখন অধিকার বঞ্চিত করা হচ্ছে।
জানা যায়, গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ বিভাগ এক ‘অতি জরুরি’ অফিস আদেশ জারি করে। এতে বলা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর এমডি পদে আবেদনের জন্য প্রার্থীর কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যার মধ্যে প্রধান প্রকৌশলী বা সমমানের এবং তদুর্ধ পদে থাকতে হবে কমপক্ষে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা। আগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই এমডি পদে আবেদন করা যেত।
এই আদেশে ক্ষুব্ধ হন প্রকৌশলীরা। তাঁদের অভিযোগ, নানা জটিলতা পেরিয়ে একজন প্রকৌশলী চাকরি জীবনের শেষার্ধ্বে এসেই প্রধান প্রকৌশলী হতে পারেন। এ অবস্থায় তিন বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব নয়। বিদ্যমান গাইডলাইনে একজন যোগ্য ও মেধাবী প্রকৌশলীর এমডি হওয়ার পথ এভাবেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাই মানদণ্ড সংশোধন অতীব জরুরি।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম এ ব্যাপারে বলেন, একটি সংস্থায় যদি দীর্ঘদিন কোনো কর্মকর্তা কর্মরত থাকেন তাহলে ঐ সংস্থাটির বিষয়ে তার বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন হয়। আর সেইসব কর্মকর্তাকেই যদি সংস্থাটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে তিনি সংস্থা আর গ্রাহক সেবার মান উভয় উন্নয়ণেই ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আমি মনে করি।
এমডি নিয়োগের মানদণ্ড সংক্রান্ত এই জটিলতা তুলে ধরে এর প্রতিকার চেয়ে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ বিতরণী কোম্পানির প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ও কোম্পানিগুলোর বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। গত বছরের ৩০ জুলাই করা ঐ আবেদনে স্বাক্ষর করেছিলেন দুইজন প্রধান প্রকৌশলী ও ১৮ জন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী।
গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ডিপিডিসির এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে যে নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তাকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘মেধাবীদের পথ রুদ্ধ করার কৌশল’ হিসেবে দেখছেন সাধারণ প্রকৌশলীরা।
২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির পর জারি করা প্রজ্ঞাপনে এমডি পদের যোগ্যতার শর্ত এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যে, ডিপিডিসির নিজস্ব অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের একটি বড় অংশই আবেদনের যোগ্যতা হারিয়েছেন। অথচ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) আগের অভিজ্ঞতার শর্তই বহাল আছে। প্রকৌশলীদের দাবি, আগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই এমডি পদে আবেদন করা যেত, যা এখন অত্যন্ত জটিল করা হয়েছে।
এই সংকট সমাধানে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ না নিয়ে গত বছরের ২৩ জুলাই পুরোনো গাইডলাইনেই এমডি নিয়োগের সার্কুলার জারি করে ডিপিডিসি। এর প্রেক্ষিতে ডিপিডিসির প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর একই বছরের ৩০ জুলাই চিঠি দেন। চিঠিতে তাঁরা বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন কোম্পানিসমূহের চলমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত ও গাইডলাইন সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছেন।
পাশাপাশি, কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণসহ, অসম প্রতিযোগিতা, বৈষম্য ও জটিলতা নিরসনের স্বার্থে তিনটি সুপারিশ প্রস্তাব করেন প্রকৌশলীরা। প্রস্তাবগুলো হলো- ১. অভিজ্ঞতার সমন্বয়: ডিপিডিসি সার্ভিস রুল অনুযায়ী বিতরণ, সঞ্চালন বা উৎপাদন ইউটিলিটিতে কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতার বিধান বহাল রাখা।
৩. চাকরি কাল নির্ধারণ: ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের জন্য কারিগরি ও প্রশাসনিক যোগ্যতার গুরুত্ব বিবেচনায় উভয় ক্ষেত্রেই মোট অভিজ্ঞতার সময়কাল ২৫ বছর নির্ধারণ করা।
এমডি নিয়োগের মানদন্ডের ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন না দাবি করে ডিপিডিসি’র পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মো. হামিদুর রহমান খান বলেন, মন্ত্রনালয় থেকে ঘোষিত নিয়োগ বিধি অনুসারেই নিয়োগ হবে। এছাড়া ডিপিডিসি’র শূন্য পদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব সংস্থাটির এমডি’র। তাই এ ব্যাপারে তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
এ বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ সচিব ফারহানা মমতাজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সবুর হোসেন বলেন, মানদণ্ড সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রী কিংবা সচিব মহোদয়ের দপ্তর থেকে কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি। নির্দেশনা পেলেই আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















