কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের জানারঘোনা এলাকায় নির্মাণাধীন একটি পাঁচতলা ভবনে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎ লাইনের সংস্পর্শে গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন এক রাজমিস্ত্রী নির্মাণশ্রমিক। গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
আহত শ্রমিকের নাম মোহাম্মদ কাজল (২২)। তিনি রামু উপজেলার জোয়ারিয়নালা এলাকার বাসিন্দা এবং ফরিদ আলমের ছেলে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তার দুর্ঘটনায় পুরো পরিবার চরম অনিশ্চয়তায় হয়ে পড়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সহকর্মীদের সূত্রে জানা যায় যে, ভবনের দ্বিতীয় তলায় লিন্টারের কাজ শেষে কাজল ছাদে উঠে গ্রাইন্ডিং মেশিনের তার নামানোর সময় পাশ দিয়ে যাওয়া উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ লাইনের ক্যাবলের সংস্পর্শে আসেন। এতে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায় এবং তিনি ছিটকে ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন।
তাৎক্ষণিকভাবে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন।
ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা যায়, সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ভবনটির নির্মাণকাজ তদারকি করছিলেন। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভবনের মালিকের নাম প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করেন এবং দায় এড়িয়ে বলেন, আমি কাজটি কন্ট্রাক্টে দিয়েছি, শ্রমিকের বিষয়টি ঠিকাদার দেখবে।
অন্যদিকে নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা রাজমিস্ত্রীর কন্ডাক্টর মনজুর আলম অভিযোগ করেন, বারবার বলা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ লাইনে সুরক্ষা ব্যবস্থা (কভারিং) নেওয়া হয়নি। মালিকপক্ষ অবহেলা করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
আহত কাজল নিজেও জানান, ছাদে কাজ করার সময় হঠাৎ বিদ্যুতের তার তাকে আকর্ষণ করে টেনে নেয়, এরপর তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছাদ থেকে পড়ে যান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভবনটি বিদ্যুৎ লাইনের অত্যন্ত কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে নির্মাণ করা হচ্ছে। যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছিল, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এছাড়া কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কিনা, সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নির্মাণ খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ লাইনের নিকটবর্তী এলাকায় কাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মাণকাজে পর্যাপ্ত সেফটি ব্যবস্থা না থাকলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গন্য হইবে।
তারা বলেন, বিদ্যুৎ লাইনের পাশে কাজের সময় লাইন ইনসুলেশন, সেফটি নেট, সতর্কতা চিহ্ন এবং প্রশিক্ষিত তত্ত্বাবধান থাকা জরুরি ছিল। এসবের অভাবই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ বলে মনে করছেন তারা।
এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল ও এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আহত শ্রমিকের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, শুধু এই ঘটনা নয় এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণকাজের বিরুদ্ধেও জরুরি ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন, নচেৎ ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
একজন তরুণ শ্রমিকের জীবন এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। প্রশ্ন একটাই অবহেলার দায় নেবে কে ? এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কত দ্রুততম সময়ে কার্যকরভাবে পদক্ষেপ গ্রহন করেন।
সৈয়দ হোসাইন শাহীন কক্সবাজার প্রতিনিধি 






















