দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের হবিগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী আলেক হোসেন (জুয়েল) দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের ছত্রছায়ায় থেকে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলেক হোসেন গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত আলেক হোসেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আলেক হোসেনের পারিবারিক শেকড় ভারতীয় বংশোদ্ভূত বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। শৈশব ও শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ তিনি কুমিল্লা সদরে কাটান। ফেনী পলিটেকনিক্যাল কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সে সময় থেকেই তার রাজনৈতিক যোগাযোগ বিস্তৃত হতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাই পরবর্তীতে তার সরকারি চাকরি ও দ্রুত পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে কুমিল্লা-১৪ (চৌদ্দগ্রাম) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুল হক মুজিব এবং কুমিল্লা সদর আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য এটিএম শামসুল হকের তদবিরে তিনি শিক্ষা সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি, তবে অভিযোগটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
বর্তমানে আলেক হোসেন সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলা শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর তিনি এ পদে যোগদান করেন। এর আগেও তিনি কুমিল্লা ও বান্দরবানসহ বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি কর্মস্থলেই তিনি সরকারি প্রকল্প, টেন্ডার ও উন্নয়ন কাজকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনামলে কুমিল্লা শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে আলেক হোসেন ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিনি নিজ এলাকায় প্রায় ১৮৬ শতক জমি ক্রয় করেন। এসব জমির বাজারমূল্য আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকার বেশি বলে স্থানীয়দের ধারণা।
শুধু জমি ক্রয়েই থেমে থাকেননি তিনি। কুমিল্লার নিজ গ্রামে তিনি নির্মাণ করেন একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। পাশাপাশি তিনি কোটি টাকার বিনিয়োগে গড়ে তুলেছেন গরুর খামার ও মাছের ফিশারি। স্থানীয়রা বলছেন, একজন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর সরকারি বেতন কাঠামোর সঙ্গে এ ধরনের বিনিয়োগ ও সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
এছাড়াও তার ও তার স্ত্রীর নামে কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর পৌর পার্ক সংলগ্ন এলাকা, দারোগাবাড়ি মাজার এলাকা সহ একাধিক স্থানে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। রাজধানী ঢাকার গাবতলী–মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় তার একটি বহুতল বিলাসবহুল ভবনের সন্ধানও মিলেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব সম্পত্তির বড় অংশই বেনামে অথবা আত্মীয়-স্বজনের নামে রাখা হয়েছে।
বান্দরবান জেলায় দায়িত্ব পালনকালে সেখানেও তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বান্দরবানে একটি রিসোর্ট, যৌথ মালিকানায় বিপুল পরিমাণ জমি এবং পৌর এলাকার বালাঘাটা মৌজার শৈলশোভা হাউজিংয়ে একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব সম্পদ অর্জনে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ লেনদেনের ভূমিকা ছিল।
অভিযোগের তালিকায় আরও রয়েছে তার স্ত্রী হাসনা আক্তার মৈশানের নামে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় বিঘা বিঘা জমি ক্রয়ের বিষয়টি। স্থানীয় সূত্রের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে আসার আশঙ্কায় পরে এসব জমির একটি অংশ বিক্রি করে দেওয়া হয়। যদিও এ বিষয়ে কোনো লিখিত নথি প্রকাশ্যে আসেনি, তবে স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, এসব সম্পদ গড়ে তুলতে আলেক হোসেন রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনকে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তারা অভিযোগ করেন, শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ, ঠিকাদারি কাজ ও বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে ঘুষ এবং কমিশন ছিল নিয়মিত ঘটনা।
আলেক হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নিজের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান ও গণমাধ্যমে লেখালেখির জেরে পারিবারিক বিরোধ থেকে তিনি তার ভাতিজা রাসেলকে রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসান। অভিযোগ রয়েছে, জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের এক বছর পর ছাত্র-জনতার ওপর হামলার একটি মামলায় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে রাসেলকে গ্রেপ্তার করানো হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এই ঘটনায় স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
এছাড়া জানা গেছে, রাজধানীর গাবতলীর বহুতল ভবন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন আলেক হোসেনকে তলব করেছিল। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় রাজনৈতিক তদবির ও অর্থব্যয়ের মাধ্যমে তিনি তদন্ত থেকে রেহাই পান। যদিও দুদকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি আলোচিত।
এতসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আলেক হোসেন এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করায় সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে। স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ থাকলে অন্তত তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে রাখার নজির রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না। তারা দাবি করেন, আলেক হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়, তবে প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আলেক হোসেন জুয়েলের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তার পক্ষ থেকে কোনো লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সচেতন মহল মনে করছেন, শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো সংবেদনশীল খাতে দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা এ ধরনের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। তারা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। প্রাপ্ত নতুন তথ্য ও নথিপত্র যাচাই শেষে এ বিষয়ে পরবর্তী সংখ্যায় আরও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
আমাদের মার্তৃভূমি ডেস্ক : 


















