দেশে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রসঙ্গ উঠলেই যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার আলোচনায় আসে, তার অন্যতম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ, দালালচক্র ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিআরটিএতে দুর্নীতি আর ব্যতিক্রম ছিল না; বরং তা একটি নিয়মিত ও কাঠামোগত ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। ঘুষ ছাড়া এখানে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সনদ, সিএনজি রূপান্তর কিংবা রুট পারমিট—কোনো কাজই সম্পন্ন হতো না বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
সাম্প্রতিক সময়ে বিআরটিএর ভেতরের একাধিক নথি, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন দপ্তরে জমা পড়া লিখিত অভিযোগ বিশ্লেষণ করে উঠে এসেছে ভয়াবহ এক দুর্নীতির চিত্র। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী মো. শহীদুল্লাহ। তার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্য, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ গঠন এবং রাজনৈতিক তহবিলে অর্থ যোগানের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।
বিআরটিএ সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ভাষ্যমতে, শহীদুল্লাহর উত্থান এবং ক্ষমতা বিস্তার ছিল দ্রুত ও অস্বাভাবিক। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি এমন একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে সংস্থার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হতো। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরাসরি ঘুষ নিতেন না; বরং তার অধীনে থাকা দালাল, গাড়ির শোরুম ম্যানেজার এবং কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হতো। প্রতিটি ফাইল, প্রতিটি অনুমোদনের নির্দিষ্ট ‘রেট’ ছিল, যা সবাই জানত কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ বলার সাহস পেত না।
শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তার বিপুল সম্পদের হিসাব। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও তিনি যে পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছেন অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাবর রোডে শেলটেক চন্দ্রমল্লিকা ভবনের বি-ব্লকের ১৩/এ/১ নম্বর ফ্ল্যাটে তার একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। অভিজাত ওই এলাকায় এমন ডুপ্লেক্সের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট রিয়েল এস্টেট সূত্র জানিয়েছে।
এছাড়া শ্যামলীর ২ নম্বর রোডে ১২-ঠ-৭ নম্বর হোল্ডিংয়ে মার্বেল পাথরে মোড়ানো একটি বহুতল বিলাসবহুল ভবনের মালিকানার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ভবনটির নকশা, নির্মাণসামগ্রী ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা স্থানীয়দের নজর কাড়লেও এর প্রকৃত মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। গাজীপুরের জয়দেবপুর ও চন্দনায় রয়েছে আরও দুটি নজরকাড়া বাড়ি। গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরার কাচারিকান্দিতে নামে-বেনামে জমি ও স্থাপনা থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শহীদুল্লাহ ও তার পরিবারের বিলাসবহুল ভ্রমণ ছিল নিয়মিত ঘটনা। সরকারি চাকরির বেতন দিয়ে এ ধরনের জীবনযাপন সম্ভব নয় বলেই তাদের বক্তব্য। এসব ভ্রমণ ও সম্পদের উৎস নিয়ে কখনোই কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ও আলোচিত অভিযোগ এসেছে বিআরটিএর ‘সিএনজি রিপ্লেস’ প্রকল্পকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রকল্পটি তার জন্য ছিল এক ধরনের ‘স্বর্ণখনি’। চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের ঘুষ আদায় করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রামে প্রায় ১৩ হাজার সিএনজি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রতিটি গাড়ি থেকে গড়ে ২ লাখ টাকা করে আদায় করা হয়। এর বাইরে রেজিস্ট্রেশনের জন্য গাড়ি প্রতি আরও ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হতো।
এই হিসাবে শুধু সিএনজি প্রতিস্থাপন ও রেজিস্ট্রেশন খাত থেকেই প্রায় ২৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। ভারতীয় ৪ আসনের প্রায় ২ হাজার ম্যাগজিমা অটোকে বেআইনিভাবে ৭ আসনের টেম্পু হিসেবে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে গাড়ি প্রতি ২ লাখ টাকা করে মোট প্রায় ৪০ কোটি টাকা ঘুষ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ‘গ্রামবাংলা’ নামে পরিচিত প্রায় ২০ হাজার সিএনজি থেকে গাড়ি প্রতি ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়, যার মোট পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে শুধু চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালেই শহীদুল্লাহ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রায় ৩৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ জমা পড়েছে।
বিআরটিএর অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, এসব ঘুষ ও অবৈধ আদায়ের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক তহবিলে সরবরাহ করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত নির্বাচনী ফান্ড গঠনে শহীদুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। বিআরটিএ থেকে সংগৃহীত অর্থ নিয়মিতভাবে ওই তহবিলে পৌঁছাত বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের মধ্যে উপ-পরিচালক ছানাউল হক, মোরছালিন ও রফিকুল ইসলামের নামও উঠে এসেছে।
সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগপত্রে ঘুষ-বাণিজ্যের বিস্তারিত হিসাব, সম্পদের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিআরটিএ অঙ্গনে শহীদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে ‘জমিদার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তার নিয়ন্ত্রণে ছিল শতাধিক গাড়ির শোরুম ম্যানেজার, দালালচক্র এবং নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। কে কোথায় বদলি হবে, কে কোন পদে যাবে—এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, পরিচালক প্রশাসনের তথাকথিত ‘অদৃশ্য লম্বা হাত’-এর রক্ষাকবচে তিনি দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও সেগুলো তদন্তের আগেই থেমে যেত। কেউ মুখ খুললে তাকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি কিংবা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো, জুলাই মাসের আলোচিত ছাত্র আন্দোলন দমন ও ভিন্নখাতে নেওয়ার ষড়যন্ত্রেও শহীদুল্লাহ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম চন্দ্র পাল এবং সাবেক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ পিএসদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। আন্দোলনের সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরবর্তীতে শহীদুল্লাহ দাবি করেন, ওই সময় তিনি দেশে ছিলেন না। তবে এই দাবি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক হাস্যরস তৈরি হয়। অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলেন, “ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না।” অভিযোগকারীদের মতে, এই দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
সমালোচনা ও অভিযোগের মাত্রা বাড়লে ২০২২ সালে শহীদুল্লাহকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বদলি করে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ২৩ জুন এক অফিস আদেশে তাকে বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং উইংয়ের পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, বদলি হলেও তার দুর্নীতির ধারাবাহিকতা থামেনি। বরং ঢাকায় বসেই তিনি আগের সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী করেন এবং পুরোনো নেটওয়ার্ক অক্ষুণ্ণ রাখেন।
স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পরও শহীদুল্লাহসহ অভিযুক্ত কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন—যা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় হতাশা বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
এই সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী মো. শহীদুল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব মেলেনি। বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেও বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—৩৮৭ কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদের পাহাড় এবং রাজনৈতিক যোগসাজশের এত গুরুতর অভিযোগের পরও কি শহীদুল্লাহ সিন্ডিকেট ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে? নাকি এবার সত্যিই ভাঙবে বিআরটিএর অদৃশ্য দুর্নীতির দুর্গ?
দেশবাসী এখন সেই প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















