ঢাকা ১২:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গণতন্ত্র উত্তরণে খালেদা জিয়া

  • মোঃ মামুন হোসেন
  • আপডেট সময় ০৮:০২:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৬৮৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এমন এক চরিত্র, যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে প্রতিরোধের ইতিহাস, নির্যাতনের বিরুদ্ধে অনমনীয় মনোবল এবং গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রবল চাপ, অমানবিক নিপীড়ন, ষড়যন্ত্র, কারাবরণ—সব কিছু সয়ে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন একা। একজন নারী, যিনি স্বামী হারানোর শোক বুকে চেপে রেখে একটি পুরো রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা তাঁকে ভেঙে দিতে পারেনি; বরং আরও দৃঢ় করেছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, তাঁর প্রত্যয়।

আজ সেই নেত্রী মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে শুয়ে থাকা একজন ৮০ বছর বয়সী অসুস্থ নারীকে দেখলে মনে হবে তিনি কেবল চিকিৎসাজনিত সংকটে আছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি একাকী নন—দেশের কোটি কোটি মানুষের আবেগ, প্রার্থনা ও রাজনৈতিক চেতনা তাঁকে ঘিরে রয়েছে। কারণ তিনি শুধু একটি দলের চেয়ারপার্সন নন, তিনি দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ইতিহাসে এক অনিবার্য শক্তি, জাতীয় নেতৃত্বের একটি কেন্দ্রবিন্দু। যে কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে আজ যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিছক মানবিক সহানুভূতির বিষয় নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, তিনি চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন, কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী বিদেশে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে—এমন সম্ভাবনার ওপর এখন নির্ভর করছে তাঁর জীবন। এ অবস্থায় তাঁকে ঘিরে জনমনে দুশ্চিন্তা বাড়ছে, আর দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে জোরালো আলোচনা তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে খালেদা জিয়ার সুস্থতা দেশের জন্য অপরিহার্য। কারণ তিনি এমন এক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, যে প্রজ্ঞা, যে দৃষ্টিভঙ্গি এবং যে চরিত্রের প্রতীক—যা আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরল। বিশেষ করে অভ্যুত্থানোত্তর সরকার পরিবর্তনের পর যে অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, সেখানে একটি পরিণত ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের উপস্থিতি না থাকলে জাতীয় সিদ্ধান্তগুলো একপেশে হয়ে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁর অবস্থান এখন দলীয় রাজনীতির সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি নেতৃত্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করে বলেছেন, “গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই মুহূর্তে খালেদা জিয়া জাতির জন্য এক বিরল অনুপ্রেরণা।” এই বক্তব্য শুধু শুভেচ্ছা নয়; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরের কেউ যখন একটি রাজনৈতিক নেত্রীর প্রতি এমন মন্তব্য করেন, তখন সেটি জাতীয় প্রেক্ষাপটে গভীর তাৎপর্য বহন করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, “বেগম খালেদা জিয়া সারাজীবন গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম করেছেন। যেই সংগ্রামের কারণেই তাঁকে ভয়াবহ নির্যাতিত হতে হয়েছে, আজ তাঁর জীবন সেই নির্মমতার ফলাফলে বিপন্ন। তবুও তিনি আপস করেননি, মাথা নত করেননি। এই দৃঢ়তা তাঁকে দেশের রাজনৈতিক অভিভাবকে পরিণত করেছে।” ড. মাহবুব উল্লাহ আরও বলেন, “তিনি জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর নীরব থাকলেও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় তিনি ছিলেন এক দিশারী। তাঁর উপস্থিতি নিজেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য আশার আলো।”

বেগম খালেদা জিয়ার চার দশকের রাজনৈতিক পথচলা নিজেই একটি ইতিহাস। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যার পর রাজনীতি তাঁর জন্য ছিল এক কঠিন ও অপরিচিত ক্ষেত্র। কিন্তু এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলনে তিনি দ্রুতই জনগণের কাছে হয়ে ওঠেন আপসহীন নেত্রী। মাত্র আট বছরের মাথায় দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়া ছিল তাঁর নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতি। পরবর্তী সময়ে সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকায় তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

এক এগারোর সময় কিংবা আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাঁর কারাবন্দী জীবন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক করুণ অধ্যায়। মিথ্যা মামলায় তাঁকে কারাবন্দী রাখা, চিকিৎসা বঞ্চনা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করা—সব মিলিয়ে তাঁর অসুস্থতার বর্তমান অবস্থা যে দীর্ঘদিনের নির্যাতনের ফল, তা বিভিন্ন বিশ্লেষক জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন।

ইতিহাসবিদ ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতিশব্দ যদি কারও নাম বলা হয়, তা হলো বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর আপসহীন সংগ্রামই তাঁকে আজ এক অনিবার্য নেত্রীতে পরিণত করেছে। তিনি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে অবিচল ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতি দেশের জন্য বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করবে।”

বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ধাক্কাধাক্কিতে তাঁকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র বহুবার হয়েছে। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা, তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং তাঁর প্রতি জনগণের আস্থা সবকিছুই প্রতিবার সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুরুতর অসুস্থতার কারণে আজ তাঁর অনুপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক স্থিতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের সামঞ্জস্য—সব কিছুর সঙ্গেই তাঁর উপস্থিতি গভীরভাবে যুক্ত।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেছেন, “আমাদের দলীয় চেয়ারপার্সন শুধু বিএনপির নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতীক। তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আছেন—এ খবর আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। গোটা দেশ দোয়া করছে তিনি আবার ফিরে আসবেন।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে বেগম জিয়া সব সময় আপসহীন ছিলেন। তাঁর সুস্থতা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য অপরিহার্য।” ড. আবদুল মঈন খানের বিশ্লেষণও একই ধারার। তিনি বলেন, “তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন, যে কারণে তিনি এখন দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে একজন রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর সুস্থতার অপেক্ষায় শুধু বিএনপি নয়, সমগ্র দেশ।”

প্রায় একইভাবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মন্তব্য করেন, “গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে করতে তিনি আজ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। কিন্তু তিনি যদি সুস্থ হয়ে ওঠেন, তবেই বাংলাদেশ নতুন করে দাঁড়াতে পারবে। গণতন্ত্র ফিরে আসবে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর প্রতি এক ধরনের ব্যাপক জনসমর্থন দেখা গেছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রচক্রের নির্যাতনের মাঝেও খালেদা জিয়ার মনোবল অটল ছিল—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়।” এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুও বলেন, “ক্ষমতার ট্রানজিশনাল পর্যায়ে তাঁর মতো অভিজ্ঞ নেত্রীর উপস্থিতি জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য।”

মূলত এই কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা জাতীয় পর্যায়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেন না—তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে গণতন্ত্রের প্রতীক, রাষ্ট্রীয় অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বকারী, এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি প্রধান স্তম্ভ।

রাষ্ট্রের সংকটময় সময়ে একজন নেতার প্রয়োজন হয়, যিনি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, প্রজ্ঞা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য দিয়ে জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন। আজকের বাংলাদেশ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানোত্তর পরিস্থিতি, অনিশ্চয়তা, ক্ষমতার পরিবর্তন—সব মিলিয়ে এমন একজন নেতার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এবং সেই নেতৃত্বের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন কেবল একজনই—বেগম খালেদা জিয়া।

দেশ আজ তাঁর সুস্থতার অপেক্ষায়। তাঁর ফিরে আসা যেন কেবল একটি রাজনৈতিক নেত্রীর হাসপাতালে থেকে বের হয়ে আসা নয়; বরং এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার নতুন আশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাখো মানুষের দোয়া, রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রত্যাশা, বিশ্লেষকদের সতর্ক বার্তা—সব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট: গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়ায় বেগম খালেদা জিয়া এখনো অনিবার্য। তাঁর অনুপস্থিতি একটি চরম শূন্যতা তৈরি করবে, আর তাঁর উপস্থিতি দেশের জন্য পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।

সুতরাং তাঁর সুস্থতা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। দেশ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে, তাঁর আরোগ্য কামনা করছে। কারণ তাঁর ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াতে পারবে—যেখানে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার আবারও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। বেগম খালেদা জিয়া শুধুই একজন নেত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আত্মার প্রতীক; এবং সেই কারণেই তাঁকে ছাড়া দেশের উত্তরণ সম্পূর্ণই অসম্পূর্ণ।

 

লেখক: বার্তা সম্পাদক দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

গণতন্ত্র উত্তরণে খালেদা জিয়া

আপডেট সময় ০৮:০২:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এমন এক চরিত্র, যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে প্রতিরোধের ইতিহাস, নির্যাতনের বিরুদ্ধে অনমনীয় মনোবল এবং গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রবল চাপ, অমানবিক নিপীড়ন, ষড়যন্ত্র, কারাবরণ—সব কিছু সয়ে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন একা। একজন নারী, যিনি স্বামী হারানোর শোক বুকে চেপে রেখে একটি পুরো রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা তাঁকে ভেঙে দিতে পারেনি; বরং আরও দৃঢ় করেছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, তাঁর প্রত্যয়।

আজ সেই নেত্রী মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে শুয়ে থাকা একজন ৮০ বছর বয়সী অসুস্থ নারীকে দেখলে মনে হবে তিনি কেবল চিকিৎসাজনিত সংকটে আছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি একাকী নন—দেশের কোটি কোটি মানুষের আবেগ, প্রার্থনা ও রাজনৈতিক চেতনা তাঁকে ঘিরে রয়েছে। কারণ তিনি শুধু একটি দলের চেয়ারপার্সন নন, তিনি দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ইতিহাসে এক অনিবার্য শক্তি, জাতীয় নেতৃত্বের একটি কেন্দ্রবিন্দু। যে কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে আজ যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিছক মানবিক সহানুভূতির বিষয় নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, তিনি চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন, কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী বিদেশে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে—এমন সম্ভাবনার ওপর এখন নির্ভর করছে তাঁর জীবন। এ অবস্থায় তাঁকে ঘিরে জনমনে দুশ্চিন্তা বাড়ছে, আর দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে জোরালো আলোচনা তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে খালেদা জিয়ার সুস্থতা দেশের জন্য অপরিহার্য। কারণ তিনি এমন এক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, যে প্রজ্ঞা, যে দৃষ্টিভঙ্গি এবং যে চরিত্রের প্রতীক—যা আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরল। বিশেষ করে অভ্যুত্থানোত্তর সরকার পরিবর্তনের পর যে অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, সেখানে একটি পরিণত ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের উপস্থিতি না থাকলে জাতীয় সিদ্ধান্তগুলো একপেশে হয়ে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁর অবস্থান এখন দলীয় রাজনীতির সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি নেতৃত্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করে বলেছেন, “গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই মুহূর্তে খালেদা জিয়া জাতির জন্য এক বিরল অনুপ্রেরণা।” এই বক্তব্য শুধু শুভেচ্ছা নয়; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরের কেউ যখন একটি রাজনৈতিক নেত্রীর প্রতি এমন মন্তব্য করেন, তখন সেটি জাতীয় প্রেক্ষাপটে গভীর তাৎপর্য বহন করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, “বেগম খালেদা জিয়া সারাজীবন গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম করেছেন। যেই সংগ্রামের কারণেই তাঁকে ভয়াবহ নির্যাতিত হতে হয়েছে, আজ তাঁর জীবন সেই নির্মমতার ফলাফলে বিপন্ন। তবুও তিনি আপস করেননি, মাথা নত করেননি। এই দৃঢ়তা তাঁকে দেশের রাজনৈতিক অভিভাবকে পরিণত করেছে।” ড. মাহবুব উল্লাহ আরও বলেন, “তিনি জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর নীরব থাকলেও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় তিনি ছিলেন এক দিশারী। তাঁর উপস্থিতি নিজেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য আশার আলো।”

বেগম খালেদা জিয়ার চার দশকের রাজনৈতিক পথচলা নিজেই একটি ইতিহাস। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যার পর রাজনীতি তাঁর জন্য ছিল এক কঠিন ও অপরিচিত ক্ষেত্র। কিন্তু এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলনে তিনি দ্রুতই জনগণের কাছে হয়ে ওঠেন আপসহীন নেত্রী। মাত্র আট বছরের মাথায় দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়া ছিল তাঁর নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতি। পরবর্তী সময়ে সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকায় তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

এক এগারোর সময় কিংবা আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাঁর কারাবন্দী জীবন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক করুণ অধ্যায়। মিথ্যা মামলায় তাঁকে কারাবন্দী রাখা, চিকিৎসা বঞ্চনা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করা—সব মিলিয়ে তাঁর অসুস্থতার বর্তমান অবস্থা যে দীর্ঘদিনের নির্যাতনের ফল, তা বিভিন্ন বিশ্লেষক জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন।

ইতিহাসবিদ ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতিশব্দ যদি কারও নাম বলা হয়, তা হলো বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর আপসহীন সংগ্রামই তাঁকে আজ এক অনিবার্য নেত্রীতে পরিণত করেছে। তিনি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে অবিচল ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতি দেশের জন্য বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করবে।”

বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ধাক্কাধাক্কিতে তাঁকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র বহুবার হয়েছে। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা, তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং তাঁর প্রতি জনগণের আস্থা সবকিছুই প্রতিবার সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুরুতর অসুস্থতার কারণে আজ তাঁর অনুপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক স্থিতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের সামঞ্জস্য—সব কিছুর সঙ্গেই তাঁর উপস্থিতি গভীরভাবে যুক্ত।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেছেন, “আমাদের দলীয় চেয়ারপার্সন শুধু বিএনপির নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতীক। তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আছেন—এ খবর আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। গোটা দেশ দোয়া করছে তিনি আবার ফিরে আসবেন।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে বেগম জিয়া সব সময় আপসহীন ছিলেন। তাঁর সুস্থতা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য অপরিহার্য।” ড. আবদুল মঈন খানের বিশ্লেষণও একই ধারার। তিনি বলেন, “তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন, যে কারণে তিনি এখন দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে একজন রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর সুস্থতার অপেক্ষায় শুধু বিএনপি নয়, সমগ্র দেশ।”

প্রায় একইভাবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মন্তব্য করেন, “গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে করতে তিনি আজ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। কিন্তু তিনি যদি সুস্থ হয়ে ওঠেন, তবেই বাংলাদেশ নতুন করে দাঁড়াতে পারবে। গণতন্ত্র ফিরে আসবে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর প্রতি এক ধরনের ব্যাপক জনসমর্থন দেখা গেছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রচক্রের নির্যাতনের মাঝেও খালেদা জিয়ার মনোবল অটল ছিল—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়।” এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুও বলেন, “ক্ষমতার ট্রানজিশনাল পর্যায়ে তাঁর মতো অভিজ্ঞ নেত্রীর উপস্থিতি জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য।”

মূলত এই কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা জাতীয় পর্যায়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেন না—তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে গণতন্ত্রের প্রতীক, রাষ্ট্রীয় অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বকারী, এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি প্রধান স্তম্ভ।

রাষ্ট্রের সংকটময় সময়ে একজন নেতার প্রয়োজন হয়, যিনি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, প্রজ্ঞা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য দিয়ে জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন। আজকের বাংলাদেশ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানোত্তর পরিস্থিতি, অনিশ্চয়তা, ক্ষমতার পরিবর্তন—সব মিলিয়ে এমন একজন নেতার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এবং সেই নেতৃত্বের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন কেবল একজনই—বেগম খালেদা জিয়া।

দেশ আজ তাঁর সুস্থতার অপেক্ষায়। তাঁর ফিরে আসা যেন কেবল একটি রাজনৈতিক নেত্রীর হাসপাতালে থেকে বের হয়ে আসা নয়; বরং এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার নতুন আশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাখো মানুষের দোয়া, রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রত্যাশা, বিশ্লেষকদের সতর্ক বার্তা—সব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট: গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়ায় বেগম খালেদা জিয়া এখনো অনিবার্য। তাঁর অনুপস্থিতি একটি চরম শূন্যতা তৈরি করবে, আর তাঁর উপস্থিতি দেশের জন্য পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।

সুতরাং তাঁর সুস্থতা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। দেশ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে, তাঁর আরোগ্য কামনা করছে। কারণ তাঁর ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াতে পারবে—যেখানে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার আবারও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। বেগম খালেদা জিয়া শুধুই একজন নেত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আত্মার প্রতীক; এবং সেই কারণেই তাঁকে ছাড়া দেশের উত্তরণ সম্পূর্ণই অসম্পূর্ণ।

 

লেখক: বার্তা সম্পাদক দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি