ঢাকা ০৬:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে টাঙ্গাইলে জলাবদ্ধতা, স্থবির জনজীবন টানা বৃষ্টিতে বগুড়ার সবজির বাজারে ক্রেতা সংকট, বিপাকে কৃষক-ব্যবসায়ীরা ছাত্রশিবির থেকে বিদায় নিলেন সাদিক কায়েম ৭ জেলায় বন্যা : ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখের বেশি মানুষ, মৃত্যু বেড়ে ৫৪ ৪৫০ কোটির ‘কিং’ নিয়ে আসছেন বাবা-মেয়ে আওয়ামী লীগ আমলের অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় বন্যায় প্রাণহানি : রিজভী যে কারণে আর্জেন্টিনার চেয়ে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে রাখছেন বিশ্লেষকরা ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়েছেন বুশরা খান নিদ্রা প্রতারণা মামলায় বিএসবি গ্লোবালের খায়রুল বাশারের আরও ৩৩ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক বন্যাকবলিত ১১ জেলায় চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

জমি অধিগ্রহণ লুটপাটের তদন্তে খোদ অভিযুক্ত কর্মকর্তা ঢাকার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আজমল হোসেন

‘আপনিই তো দুর্নীতিবাজ। আপনিই কেন জমি অধিগ্রহণ লুটপাটের তদন্তে? এটা হতে পারে না।’ ঢাকার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেনকে উদ্দেশ করে বিক্ষুব্ধ জনতা এমন মন্তব্য করে তদন্তকাজের সমালোচনা করেন। ঢাকা-সিলেট রোডের আধুনিকায়ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে ভয়াবহ দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে রোববার নরসিংদী ডিসি অফিসে এভাবেই তোপের মুখে পড়েন খোদ তদন্তদলের প্রধান। ভুক্তভোগী স্থানীয় লোকজন ও গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকে তাকে ঘিরে ধরে এরকম প্রশ্ন করতে থাকেন।

নরসিংদীর সাবেক ৪ জেলা প্রশাসক, কয়েকজন এডিসির পর জমি অধিগ্রহণে ভয়াবহ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার তালিকায় এবার উঠে এসেছে বিভাগীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নামও। সার্ভেয়ার ও কানুনগোর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আজমল হোসেন জমি অধিগ্রহণে বিধিবহির্ভূত ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেন। অথচ রহস্যজনক কারণে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটিতে তাকেই প্রধান করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে তদন্তদল এসেছে শুনে ভুক্তভোগী স্থানীয় লোকজন ও গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকে ছুটে আসেন ডিসি কার্যালয়ে। এ সময় তদন্ত কমিটির অন্যান্য সদস্যসহ জেলার সিনিয়র কর্মকর্তাদের সামনে ভূমি অধিগ্রহণ বিষয়ে খোদ অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আজমল হোসেনের দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পেরে জুনিয়র কর্মকর্তাদের সামনে তিনি বিব্রতবোধ করেন।

অভিযোগ উঠেছে, চাঞ্চল্যকর আলোচ্য অধিগ্রহণ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী ক্যাডার কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে তিনি মাঠে নেমেছেন বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। অথচ তিনি গুরুত্বপূর্ণ এ তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ইতোমধ্যে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগ আমলের অভিযুক্ত নরসিংদীর সাবেক ৪ জন জেলা প্রশাসকসহ কয়েকজন এডিসি (রাজস্ব) এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তাদের (এলএও) দায় ধামাচাপা দিতে তিনি বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি মূলত সব দায় সার্ভেয়ার আর কানুনগোদের ওপর চাপিয়ে তদন্তকাজ শেষ করতে চান।

প্রসঙ্গত, ‘জমি অধিগ্রহণে বিস্ময়কর কাণ্ড, স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ঘুস ভাগাভাগি’ শিরোনামে ২৮ এপ্রিল যুগান্তরে রিপোর্ট প্রকাশিত হলে গুরুতর এ অভিযোগ তদন্তে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে পৃথক ৩টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে এসব কমিটি গঠিত হয়।

এর মধ্যে অভিযোগ তদন্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর কর্যালয়ের পরিচালক-২ মো. আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি দাপ্তরিক পত্র পাঠানো হয় ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের কাছে। সেখানে বলা হয়, নরসিংদীর জেলা প্রশাসক, এডিসি (রাজস্ব) সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের প্রকৌশলী, সার্ভেয়ার, কানুনগোসহ ২০-২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে ১০ জুনের মধ্যে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এমন নির্দেশনার পর ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার নিজ কার্যালয়ের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেনকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। রোববার এই তদন্ত কমিটি নরসিংদীতে যায়। এমন খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগীসহ গণমাধ্যমকর্মীদের বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উপস্থিত হন। গণমাধ্যমকর্মীরা আজমল হোসেনকে জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির জন্য দায়ী করে তাদের বক্তব্য, যুক্তি এবং বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে প্রতিকার দাবি করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সজল ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নিজেই একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। তিনি বিধিবহির্ভূতভাবে অধিগ্রহণের সুপারিশ করেছেন। এমনকি যুগান্তরে প্রকাশিত রিপোর্টের অভিযোগ তদন্ত করতে এসে ঘুস নিয়েছেন ১ কোটি টাকা। বিষয়টি সবার মুখে মুখে। অথচ কী দুর্ভাগ্য-এরকম দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকেই তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, যেখানে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে এই যদি হয় তদন্ত কমিটির অবস্থা!

তিনি মনে করেন, এগুলো আসলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ছক। নেপথ্যের গডফাদারদের আসল উদ্দেশ্য হলো অভিযুক্ত ডিসি-এডিসিসহ সংশ্লিষ্ট ক্যাডার কর্মকর্তাদের রক্ষা করে দায়সারা তদন্ত শেষ করা।

তিনি জানান, এর আগে মাহবুব নামে একজন স্থানীয় বাসিন্দা আজমল হোসেনসহ ডিসি-এডিসিসহ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনতে ১৮ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজি জমি অধিগ্রহণে অনুসন্ধান করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে নির্দেশ দেন।

কানুনগো জলিলের গুরুতর অভিযোগ : অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আজমল হোসেনের বিধিবহির্ভূতভাবে অধিগ্রহণ তালিকায় সুপারিশের সাক্ষী নরসিংদীর ডিসি অফিসের সাবেক কানুনগো আব্দুল জলিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘অধিগ্রহণ তালিকায় বেশ কয়েকটি নামে সাবেক এডিসি অন্জন দাসের সঙ্গে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন আজমল হোসেন স্যার।’

অধিগ্রহণে সরাসরি দুর্নীতির তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, শিবপুরের চৈতন্যপুরের আব্দুল বাতেন ভূঁইয়ার দোতলা বিল্ডিংয়ের স্থানে ছোট একটি একতলা বিল্ডিং ছিল। ওই বিল্ডিংয়ের চারপাশে জোড়াতালি দিয়ে দোতলা বিল্ডিং তৈরির আলামত স্পষ্ট ছিল। যে কারণে যৌথ তদন্ত তালিকায় একতলা বিল্ডিং এবং দোতলা বিল্ডিং দুটিকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ নির্মিত উল্লেখ করে বাতিলযোগ্য বলা হয়। আর পূর্বের ছোট একতলা বিল্ডিংটি আলাদাভাবে ৩নং ক্রমিকে লেখা ছিল।

তিনি বলেন, বিল্ডিং দুটির অধিগ্রহণের টাকা পেতে জমির মালিক বাতেন ভূঁইয়া নির্মিত বিল্ডিং দুটির ‘উদ্দেশ্যমূলক’ লেখা বাতিল করতে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আবেদন করেন। এরকম অসংখ্য আবেদন করা হয় বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে ৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করা হয়। ওই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অন্জন দাস। তিনি আ. বাতেন ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগসাজশ করে দোতলা বিল্ডিংয়ের ‘দোতলা’ বাতিল করে একতলা অনুমোদন দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেন। একই সময় কমিটির অন্য সদস্যরাও অনুমোদন দিয়ে স্বাক্ষর করেন। মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে এই কর্মকর্তারা বিধিবহির্ভূতভাবে অধিগ্রহণে সুপারিশ করেন, যা তদন্ত করলে লুটপাটের প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

দুর্নীতির ফিরিস্তি : অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেন কীভাবে জমি অধিগ্রহণে বিধিবহির্ভূত সুপারিশ করেন, যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে তার নথিপত্র পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা গেছে, এলএ কেস নং ১১/২০২১-২০২২-নথিপত্রে অধিগ্রহণের বিধিবহির্ভূত সুপারিশে মো. আজমল হোসেনের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। একই সুপারিশে আছে সাবেক এডিসি অন্জন দাস, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ফুলকাম বাদশা, সড়ক ও জনপথের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রেজা-ই-রাব্বি ও গণপূর্তের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী একেএম দিলদার হোসেন। এই ৫ কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত সুপারিশপত্রে দেখা যায়, ঢাকা-সিলেট রোডের যোশর মৌজার ১৫ ও ১৬নং দাগে ২৭ শতক ৭ পয়েন্ট জমি অধিগ্রহণের আওতায় নেওয়া হয়। ওই দুটি দাগে আ. বাতেন ভুইয়ার একটি ১তলা এবং একটি দোতলা বিল্ডিং দেখানো হয়েছে। বিল্ডিং দুটি পরিকল্পিত। অধিগ্রহণের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ হিসাবে কোটি কোটি টাকা তুলে নিতে বিল্ডিং দুটি আওতাভুক্ত করা হয়। অধিগ্রহণের এই তালিকা প্রস্তুতের সময় বিল্ডিং বাবদ ক্ষতিপূরণ দিতে কানুনগো আব্দুল জলিল আপত্তি দেন। সংশ্লিষ্ট সুপারিশকারী সিনিয়র কর্মকর্তারা তার আপত্তি সত্ত্বেও জটিল চিত্র অঙ্কন করে দালান দুটিকে অধিগ্রহণের আওতায় নেন। এরপর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. রাশেদ হোসেন চৌধুরী তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনটিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে যৌথ তদন্ত তালিকা সংশোধনের আদেশ দেন। এরপরই জেলার তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা এএইচএম আজিমুল হক যৌথ তদন্ত তালিকা সংশোধন করেন। এর ফলে বৈধ ছোট একটি বিল্ডিংয়ের সঙ্গে অবৈধ আরও একটি অতিরিক্ত বিল্ডিং যুক্ত করে দুটি বিল্ডিং ক্ষতিপূরণের আওতাভুক্ত করা হয়। এভাবে ১টি বিল্ডিংয়ের স্থানে ২টি বিল্ডিংয়ের ক্ষতিপূরণ হিসাবে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ৫২ লাখ ১১ হাজার ১৭২ টাকা। দিগুণ হিসাবে দাম আসে ৩ কোটি ৪ লাখ ২২ হাজার ২৪৪ টাকা। এভাবে সরকারি টাকা লুটপাটের উৎসব চলে নরসিংদীতে।

নথিপত্রে দেখা যায়, যোশর মৌজায় ১০৭৩ দাগে এলএ কেস নং ১১/২০২১-২০২২ এ-জেবুন্নেছা রত্নার নামে একটি একচালা সেমিপাকা ঘর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ জেবুন্নেছা রত্নারই কোনো হদিসই পাওয়া যায়নি। যৌথ তদন্ত তালিকায় কানুনগো আব্দুল জলিল উল্লেখ করেন, ‘একচালা সেমিপাকা ঘরেরও কোনো অস্তিত্ব নেই।’ এমন আপত্তি সত্ত্বেও অজ্ঞাতপরিচয় এই মহিলার নামে একটি একচালা সেমিপাকা ঘরের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ১ হাজার ৪৮২ টাকা। দিগুণ হিসাবে অস্তিত্বহীন এই বাড়ির দাম নির্ধারণ করা হয় ৮ লাখ ২ হাজার ৯৬৪ টাকা।

অবিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আজমল হোসেন বলেন, ১১নং এলএ কেসে যেসব আপত্তি উঠেছে, তদন্ত করে সেগুলো বাতিল করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ‘তার বিরুদ্ধে উঠা এসব অভিযোগ সঠিক নয়।

 

 

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে টাঙ্গাইলে জলাবদ্ধতা, স্থবির জনজীবন

জমি অধিগ্রহণ লুটপাটের তদন্তে খোদ অভিযুক্ত কর্মকর্তা ঢাকার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আজমল হোসেন

আপডেট সময় ০২:৫৮:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

‘আপনিই তো দুর্নীতিবাজ। আপনিই কেন জমি অধিগ্রহণ লুটপাটের তদন্তে? এটা হতে পারে না।’ ঢাকার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেনকে উদ্দেশ করে বিক্ষুব্ধ জনতা এমন মন্তব্য করে তদন্তকাজের সমালোচনা করেন। ঢাকা-সিলেট রোডের আধুনিকায়ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে ভয়াবহ দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে রোববার নরসিংদী ডিসি অফিসে এভাবেই তোপের মুখে পড়েন খোদ তদন্তদলের প্রধান। ভুক্তভোগী স্থানীয় লোকজন ও গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকে তাকে ঘিরে ধরে এরকম প্রশ্ন করতে থাকেন।

নরসিংদীর সাবেক ৪ জেলা প্রশাসক, কয়েকজন এডিসির পর জমি অধিগ্রহণে ভয়াবহ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার তালিকায় এবার উঠে এসেছে বিভাগীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নামও। সার্ভেয়ার ও কানুনগোর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আজমল হোসেন জমি অধিগ্রহণে বিধিবহির্ভূত ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেন। অথচ রহস্যজনক কারণে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটিতে তাকেই প্রধান করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে তদন্তদল এসেছে শুনে ভুক্তভোগী স্থানীয় লোকজন ও গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকে ছুটে আসেন ডিসি কার্যালয়ে। এ সময় তদন্ত কমিটির অন্যান্য সদস্যসহ জেলার সিনিয়র কর্মকর্তাদের সামনে ভূমি অধিগ্রহণ বিষয়ে খোদ অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আজমল হোসেনের দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পেরে জুনিয়র কর্মকর্তাদের সামনে তিনি বিব্রতবোধ করেন।

অভিযোগ উঠেছে, চাঞ্চল্যকর আলোচ্য অধিগ্রহণ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী ক্যাডার কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে তিনি মাঠে নেমেছেন বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। অথচ তিনি গুরুত্বপূর্ণ এ তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ইতোমধ্যে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগ আমলের অভিযুক্ত নরসিংদীর সাবেক ৪ জন জেলা প্রশাসকসহ কয়েকজন এডিসি (রাজস্ব) এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তাদের (এলএও) দায় ধামাচাপা দিতে তিনি বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি মূলত সব দায় সার্ভেয়ার আর কানুনগোদের ওপর চাপিয়ে তদন্তকাজ শেষ করতে চান।

প্রসঙ্গত, ‘জমি অধিগ্রহণে বিস্ময়কর কাণ্ড, স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ঘুস ভাগাভাগি’ শিরোনামে ২৮ এপ্রিল যুগান্তরে রিপোর্ট প্রকাশিত হলে গুরুতর এ অভিযোগ তদন্তে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে পৃথক ৩টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে এসব কমিটি গঠিত হয়।

এর মধ্যে অভিযোগ তদন্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর কর্যালয়ের পরিচালক-২ মো. আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি দাপ্তরিক পত্র পাঠানো হয় ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের কাছে। সেখানে বলা হয়, নরসিংদীর জেলা প্রশাসক, এডিসি (রাজস্ব) সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের প্রকৌশলী, সার্ভেয়ার, কানুনগোসহ ২০-২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে ১০ জুনের মধ্যে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এমন নির্দেশনার পর ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার নিজ কার্যালয়ের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেনকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। রোববার এই তদন্ত কমিটি নরসিংদীতে যায়। এমন খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগীসহ গণমাধ্যমকর্মীদের বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উপস্থিত হন। গণমাধ্যমকর্মীরা আজমল হোসেনকে জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির জন্য দায়ী করে তাদের বক্তব্য, যুক্তি এবং বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে প্রতিকার দাবি করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সজল ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নিজেই একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। তিনি বিধিবহির্ভূতভাবে অধিগ্রহণের সুপারিশ করেছেন। এমনকি যুগান্তরে প্রকাশিত রিপোর্টের অভিযোগ তদন্ত করতে এসে ঘুস নিয়েছেন ১ কোটি টাকা। বিষয়টি সবার মুখে মুখে। অথচ কী দুর্ভাগ্য-এরকম দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকেই তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, যেখানে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে এই যদি হয় তদন্ত কমিটির অবস্থা!

তিনি মনে করেন, এগুলো আসলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ছক। নেপথ্যের গডফাদারদের আসল উদ্দেশ্য হলো অভিযুক্ত ডিসি-এডিসিসহ সংশ্লিষ্ট ক্যাডার কর্মকর্তাদের রক্ষা করে দায়সারা তদন্ত শেষ করা।

তিনি জানান, এর আগে মাহবুব নামে একজন স্থানীয় বাসিন্দা আজমল হোসেনসহ ডিসি-এডিসিসহ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনতে ১৮ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজি জমি অধিগ্রহণে অনুসন্ধান করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে নির্দেশ দেন।

কানুনগো জলিলের গুরুতর অভিযোগ : অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আজমল হোসেনের বিধিবহির্ভূতভাবে অধিগ্রহণ তালিকায় সুপারিশের সাক্ষী নরসিংদীর ডিসি অফিসের সাবেক কানুনগো আব্দুল জলিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘অধিগ্রহণ তালিকায় বেশ কয়েকটি নামে সাবেক এডিসি অন্জন দাসের সঙ্গে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন আজমল হোসেন স্যার।’

অধিগ্রহণে সরাসরি দুর্নীতির তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, শিবপুরের চৈতন্যপুরের আব্দুল বাতেন ভূঁইয়ার দোতলা বিল্ডিংয়ের স্থানে ছোট একটি একতলা বিল্ডিং ছিল। ওই বিল্ডিংয়ের চারপাশে জোড়াতালি দিয়ে দোতলা বিল্ডিং তৈরির আলামত স্পষ্ট ছিল। যে কারণে যৌথ তদন্ত তালিকায় একতলা বিল্ডিং এবং দোতলা বিল্ডিং দুটিকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ নির্মিত উল্লেখ করে বাতিলযোগ্য বলা হয়। আর পূর্বের ছোট একতলা বিল্ডিংটি আলাদাভাবে ৩নং ক্রমিকে লেখা ছিল।

তিনি বলেন, বিল্ডিং দুটির অধিগ্রহণের টাকা পেতে জমির মালিক বাতেন ভূঁইয়া নির্মিত বিল্ডিং দুটির ‘উদ্দেশ্যমূলক’ লেখা বাতিল করতে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আবেদন করেন। এরকম অসংখ্য আবেদন করা হয় বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে ৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করা হয়। ওই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অন্জন দাস। তিনি আ. বাতেন ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগসাজশ করে দোতলা বিল্ডিংয়ের ‘দোতলা’ বাতিল করে একতলা অনুমোদন দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেন। একই সময় কমিটির অন্য সদস্যরাও অনুমোদন দিয়ে স্বাক্ষর করেন। মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে এই কর্মকর্তারা বিধিবহির্ভূতভাবে অধিগ্রহণে সুপারিশ করেন, যা তদন্ত করলে লুটপাটের প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

দুর্নীতির ফিরিস্তি : অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেন কীভাবে জমি অধিগ্রহণে বিধিবহির্ভূত সুপারিশ করেন, যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে তার নথিপত্র পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা গেছে, এলএ কেস নং ১১/২০২১-২০২২-নথিপত্রে অধিগ্রহণের বিধিবহির্ভূত সুপারিশে মো. আজমল হোসেনের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। একই সুপারিশে আছে সাবেক এডিসি অন্জন দাস, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ফুলকাম বাদশা, সড়ক ও জনপথের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রেজা-ই-রাব্বি ও গণপূর্তের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী একেএম দিলদার হোসেন। এই ৫ কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত সুপারিশপত্রে দেখা যায়, ঢাকা-সিলেট রোডের যোশর মৌজার ১৫ ও ১৬নং দাগে ২৭ শতক ৭ পয়েন্ট জমি অধিগ্রহণের আওতায় নেওয়া হয়। ওই দুটি দাগে আ. বাতেন ভুইয়ার একটি ১তলা এবং একটি দোতলা বিল্ডিং দেখানো হয়েছে। বিল্ডিং দুটি পরিকল্পিত। অধিগ্রহণের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ হিসাবে কোটি কোটি টাকা তুলে নিতে বিল্ডিং দুটি আওতাভুক্ত করা হয়। অধিগ্রহণের এই তালিকা প্রস্তুতের সময় বিল্ডিং বাবদ ক্ষতিপূরণ দিতে কানুনগো আব্দুল জলিল আপত্তি দেন। সংশ্লিষ্ট সুপারিশকারী সিনিয়র কর্মকর্তারা তার আপত্তি সত্ত্বেও জটিল চিত্র অঙ্কন করে দালান দুটিকে অধিগ্রহণের আওতায় নেন। এরপর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. রাশেদ হোসেন চৌধুরী তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনটিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে যৌথ তদন্ত তালিকা সংশোধনের আদেশ দেন। এরপরই জেলার তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা এএইচএম আজিমুল হক যৌথ তদন্ত তালিকা সংশোধন করেন। এর ফলে বৈধ ছোট একটি বিল্ডিংয়ের সঙ্গে অবৈধ আরও একটি অতিরিক্ত বিল্ডিং যুক্ত করে দুটি বিল্ডিং ক্ষতিপূরণের আওতাভুক্ত করা হয়। এভাবে ১টি বিল্ডিংয়ের স্থানে ২টি বিল্ডিংয়ের ক্ষতিপূরণ হিসাবে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ৫২ লাখ ১১ হাজার ১৭২ টাকা। দিগুণ হিসাবে দাম আসে ৩ কোটি ৪ লাখ ২২ হাজার ২৪৪ টাকা। এভাবে সরকারি টাকা লুটপাটের উৎসব চলে নরসিংদীতে।

নথিপত্রে দেখা যায়, যোশর মৌজায় ১০৭৩ দাগে এলএ কেস নং ১১/২০২১-২০২২ এ-জেবুন্নেছা রত্নার নামে একটি একচালা সেমিপাকা ঘর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ জেবুন্নেছা রত্নারই কোনো হদিসই পাওয়া যায়নি। যৌথ তদন্ত তালিকায় কানুনগো আব্দুল জলিল উল্লেখ করেন, ‘একচালা সেমিপাকা ঘরেরও কোনো অস্তিত্ব নেই।’ এমন আপত্তি সত্ত্বেও অজ্ঞাতপরিচয় এই মহিলার নামে একটি একচালা সেমিপাকা ঘরের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ১ হাজার ৪৮২ টাকা। দিগুণ হিসাবে অস্তিত্বহীন এই বাড়ির দাম নির্ধারণ করা হয় ৮ লাখ ২ হাজার ৯৬৪ টাকা।

অবিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আজমল হোসেন বলেন, ১১নং এলএ কেসে যেসব আপত্তি উঠেছে, তদন্ত করে সেগুলো বাতিল করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ‘তার বিরুদ্ধে উঠা এসব অভিযোগ সঠিক নয়।