কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই হৃদয়ের ভেতর স্বতঃস্ফূর্ত একধরনের শ্রদ্ধা জন্ম নেয়। যাঁদের সান্নিধ্যে এলে মানুষ নিজেকে পরিশীলিত করতে শেখে, নৈতিক হতে উদ্বুদ্ধ হয়, জীবনকে নতুন করে ভাবতে শেখে। জনাব আশরাফ উদ্দিন খান (বরফ) স্যার তেমনই একজন মানুষ। নাগরপুরে তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন; তিনি একটি আদর্শ, একটি নৈতিক অবস্থান এবং একটি প্রজন্ম গঠনের নীরব কারিগর। যাঁকে সারা জীবন শ্রদ্ধা করা যায়, যাঁর আদর্শ আজীবন অনুসরণ করা যায়, যাঁর দেখানো পথে জীবন পরিচালনা করা যায়—এমন মানুষ খুব বেশি পাওয়া যায় না। বরফ স্যার ছিলেন তেমনই একজন ক্ষণজন্মা মহামানব। তাঁর স্নেহের স্পর্শে আগামী দিনে ভালো কিছু করার প্রেরণা পেত অসংখ্য ছাত্রছাত্রী।
আমার জীবনে মাত্র দুই বছর তাঁর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল, কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি আমার শিক্ষাজীবনে এমন গভীর ছাপ রেখে গেছেন, যা আজীবন মুছে যাওয়ার নয়। আশির দশকে নাগরপুর সরকারি কলেজে পড়াকালে যেসব শিক্ষক আমার মানসগঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছেন, তাঁদের মধ্যে বরফ স্যার অন্যতম। তিনি ছিলেন বাংলা বিভাগের শিক্ষক। তবে কেবল পাঠ্যবইয়ের শিক্ষক হিসেবেই তাঁকে চেনা যাবে না। তিনি ছিলেন কখনো কঠোর অভিভাবক, কখনো জন্মদাতা পিতার মতো আশ্রয়দাতা, আবার কখনো নিখাদ বন্ধুর মতো সহমর্মী। একসময় স্যারের সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত ও আত্মিক সখ্য গড়ে উঠেছিল, যা ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানবিক বন্ধনে রূপ নিয়েছিল।
বাংলা ভাষার শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন সত্যিই অতুলনীয়। ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছাত্রদের মুগ্ধ করত। তিনি এত সহজ-সরলভাবে পাঠ উপস্থাপন করতেন যে, কঠিন বিষয়ও সহজ হয়ে যেত। তাঁর ক্লাস মানেই ছিল প্রাণবন্ত আলোচনা, যুক্তি, রস ও মননশীলতার সম্মিলন। ক্লাসে ঢুকলেই ছাত্রছাত্রীদের চোখে-মুখে একধরনের প্রত্যাশা দেখা যেত—আজ স্যার কী নতুন করে ভাবতে শেখাবেন!
বরফ স্যার ছিলেন সহজ-সরল জীবনে বিশ্বাসী একজন মানুষ। তাঁর জীবনযাপন, কথাবার্তা, আচরণ—সবকিছুতেই ছিল সততা ও নৈতিকতার দীপ্ত উদাহরণ। তাঁকে দেখে ছাত্রছাত্রীরা নীতিবান হতে উৎসাহী হতো। তিনি কোনো দিন বড় গলায় কথা বলেননি, অথচ তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ দৃঢ় ও প্রভাবশালী। তাঁর নীরব উপস্থিতিই ছিল অনেক সময় একটি জীবন্ত পাঠ। তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল, মননশীল ও রুচিশীল—বহুমুখী মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন চিন্তাশীল লেখক ও সংস্কৃতিবান নাগরিক। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, একজন ভালো শিক্ষক কেবল পাঠ্যসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, তিনি সমাজ ও সময়কেও পাঠ করেন। আশরাফ উদ্দিন খান ১৯৪১ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার ধামরাই উপজেলার রাজাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ফহিম উদ্দিন খান এবং মাতা আয়েশা খানম। শৈশবের ছয়-সাত বছর তিনি কাটিয়েছেন বাবার কর্মস্থল কলকাতায়। সংস্কৃতিবান বাবার হাত ধরে খেলার মাঠে যাওয়া, সিনেমা দেখা, নাটক দেখা—এইসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তাঁর মনে সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন। পড়াশোনায় তিনি ছিলেন মেধাবী ও মনোযোগী। ১৯৫৬ সালে উয়ার্শী পাইকপাড়া স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী সা’দত কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন—যা তাঁর শিক্ষকতা ও লেখালেখির ভিতকে আরও দৃঢ় করে।
১৯৬৬ সালে নাগরপুর কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই তিনি এই কলেজে বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি কিছুদিন সিরাজগঞ্জের আই.আই. কলেজে শিক্ষকতা করেন। দীর্ঘ ৩২ বছর তিনি নাগরপুর কলেজে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতা জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ ও শেরপুর সরকারি কলেজেও কর্মরত ছিলেন। অবশেষে ১৯৯৮ সালে নাগরপুর সরকারি কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তবে অবসর তাঁর কর্মজীবনের সমাপ্তি ছিল না; বরং এটি ছিল তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের আরেক অধ্যায়।
ছাত্রজীবন থেকেই শখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে লেখাই হয়ে ওঠে তাঁর নেশা। ১৯৭৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় তাঁর প্রথম লেখা ‘ফুটবল জগতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ প্রকাশিত হয়। এই লেখাই যেন তাঁর ক্রীড়ালেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশের সূচনা। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ভারত বিচিত্রা, ইত্তেফাক, বাংলার বাণী, আজাদ, পূর্ব দেশ, দৈনিক বাংলা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, রোববার, ডিটেকটিভ, কাশবন, দীপকসহ অসংখ্য পত্রিকায় তাঁর ছয় শতাধিক প্রবন্ধ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখার বড় একটি অংশই ছিল খেলাধুলাবিষয়ক। মূলত তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়ালেখক। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন ও ক্রীড়া সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান স্বীকৃত হয়েছে। ২০০৮ সালে ক্রীড়াবিষয়ক লেখালেখিতে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে। এই সম্মাননা ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের সাধনা ও নিষ্ঠার এক নীরব স্বীকৃতি।
শিক্ষকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি তিনি সামাজিক কাজের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। নাগরপুর তথা আশপাশের উপজেলার মানুষের কাছে আশরাফ উদ্দিন খান নামটি আজও অত্যন্ত সুবিদিত ও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তিনি কখনো প্রচারের আলো চাননি, কিন্তু তাঁর কাজই তাঁকে আলোকিত করেছে। আজ এমন একজন মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোই আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করেছেন, যিনি নিজের জীবন দিয়ে শিখিয়েছেন কীভাবে সৎ, সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হওয়া যায়—তিনি আমাদের শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত থাকবেন। এই মহান শিক্ষক, প্রাজ্ঞ মানুষ ও ক্রীড়ালেখকের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা, গভীর কৃতজ্ঞতা এবং দীর্ঘায়ুর আন্তরিক কামনা। আমাদের জীবনে বরফ স্যারের মতো মানুষ যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন সমাজে আশার আলো জ্বলতে থাকবে।
সাইদ আল মামুন, স্টাফ রিপোর্টার 




















