শরীয়তপুরের সখিপুরে এক গৃহবধূর দায়ের করা ধর্ষণ মামলাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মামলায় স্বামী কবির গাজীসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে স্বামী কবির গাজী ও অপর আসামি লাবনী বেগম কারাগারে রয়েছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, অভিযুক্তের পরিবার ও শালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের দাবি, পরকীয়া সম্পর্কের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর প্রতিহিংসাবশত এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। ফলে মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সখিপুর থানাধীন চরসেনসাস ইউনিয়নের খালাশীকান্দি গ্রামের সাত্তার গাজীর ছেলে কবির গাজীর সঙ্গে ২০১৫ সালে পারিবারিকভাবে আকলিমা আক্তারের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে ৭ ও ৩ বছর বয়সী দুই পুত্র সন্তান রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে আকলিমা আক্তারের সঙ্গে একই এলাকার ব্যবসায়ী রুপচান কাজীর ছেলে শাকিল কাজীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে এলাকায় আলোচনা ছিল। বিষয়টি একপর্যায়ে জানাজানি হলে স্থানীয়ভাবে একটি শালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং উভয় পক্ষকে সতর্ক করে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়।
এরপরও আকলিমা আক্তার কয়েকবার কাউকে কিছু না জানিয়ে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ঘটনার কিছুদিন আগে তিনি প্রায় ১১ দিন নিখোঁজ ছিলেন। ওই সময় তিনি বাবার বাড়িতেও অবস্থান করেননি বলে দাবি করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজে বের করে পুনরায় স্বামীর বাড়িতে নিয়ে আসেন। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল বলেও জানা যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ মে রাত আনুমানিক ৮টার দিকে কবির গাজী হঠাৎ বাড়িতে ফিরে এসে তার স্ত্রী আকলিমা আক্তার ও শাকিল কাজীকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান বলে অভিযোগ করেন। এ সময় তিনি চিৎকার দিলে শাকিল কাজী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে দাবি করা হয়। স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি মোবাইল ফোন ও একটি ব্যবহৃত গামছা দেখতে পান, যা শাকিল কাজীর বলে দাবি করা হচ্ছে।
পরে স্থানীয়রা কবির গাজী ও আকলিমা আক্তারকে নিয়ে স্থানীয়ভাবে খালেক গাজীর বাড়িতে একটি শালিশি বৈঠকের আয়োজন করেন। সেখানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
শালিশে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তির দাবি, আকলিমা আক্তারকে ঘটনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি শাকিল কাজীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। শালিশে উপস্থিত কয়েকজনের ভাষ্যমতে, আকলিমা আক্তার বলেন, “শাকিল কাজীর সঙ্গে আমার প্রায় পাঁচ বছরের পরিচয় এবং দুই বছরের সম্পর্ক রয়েছে। আমি শাকিলের সঙ্গেই থাকতে চাই।”
স্থানীয়দের দাবি, ওই বৈঠকে আকলিমা আক্তারের পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়। তার বাবা শাহ আলম বয়াতী ও স্বজনরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরবর্তীতে একটি স্ট্যাম্পে লিখিত জবানবন্দির মাধ্যমে আকলিমা আক্তার স্বামী কবির গাজীর সঙ্গে সংসার না করার এবং শাকিল কাজীর সঙ্গে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেন বলে শালিশে উপস্থিত ব্যক্তিরা দাবি করেছেন। পরে তার পরিবারের জিম্মায় তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
তবে ঘটনার প্রায় ১৪ দিন পর আকলিমা আক্তার বাদী হয়ে সখিপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় স্বামী কবির গাজীসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত) এর ৯(১)/৩০ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩৪২, ৩২৩ ও ৫০৬ ধারায় রুজু করা হয়।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনার দিন রাতে তাকে জোরপূর্বক নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়।
তবে স্থানীয়দের একটি অংশ এ অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, রাত ৮টার দিকে ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পরপরই আকলিমা আক্তারকে স্থানীয় শালিশেতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রাত গভীর পর্যন্ত শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে বৈঠক চলে। সেই প্রেক্ষাপটে এজাহারে উল্লেখিত সময় ও ঘটনার বর্ণনা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পরকীয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে চলে আসায় ক্ষুব্ধ হয়ে পরবর্তীতে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের দাবি, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এদিকে মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অটোরিকশাচালক কবির গাজীর দুই শিশু সন্তান বর্তমানে মানবিক সংকটে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। তারা দাবি করেন, একদিকে মা সংসার ছেড়ে চলে গেছেন, অন্যদিকে বাবা কারাগারে থাকায় শিশুরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
শিশুরা তার বাবাকে চান।
এ বিষয়ে সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হুসাইন আমাদের মাতৃভূমি কে বলেন, “বাদীর দায়ের করা এজাহারের ভিত্তিতে মামলা রুজু করা হয়েছে। মামলার এক আসামি কবির গাজীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অপর আসামি লাবনী বেগম আদালতে জামিনের আবেদন করলে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।”
তবে শাকিল কাজী ও আকলিমা আক্তারের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে বিষয়টি বিচারাধীন। ফলে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের সত্যতা তদন্তকারী সংস্থা এবং আদালতের কার্যক্রমের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। এলাকাবাসী ও উভয় পক্ষের স্বজনরা মামলার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সংবাদ শিরোনাম ::
সখিপুরে ধর্ষণ মামলা ঘিরে বিতর্ক স্বামী কারাগারে, তদন্তে নানা প্রশ্ন
-
আতিকুর রহমান - আপডেট সময় ০৩:৪০:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
- ৫১৫ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ






















