দেখতে দেখতে আব্বার মৃত্যুবার্ষিকী চলে এলো। আজ ২২ জানুয়ারি। এই দিনে তাঁকে হারিয়েছিলাম। চোখের পলকে সাত বছর চলে গেল। তাঁকে আপনারা দেখেছেন একজন অসাধারণ গীতিকার আর সুরকার হিসেবে। আমি তাঁকে পেয়েছি একজন ভালো বাবা হিসেবে। এই গুণী মানুষটিকে নিজের হাতে যেদিন কবর দিয়ে আসি, সেদিন হয়তোবা নিজেও টের পাইনি আমার কাঁধে কত বড় দায়িত্ব তিনি দিয়ে গেলেন। তাঁর আদর্শ নিয়ে পথচলার চেষ্টা করছি।
ছোটবেলা থেকে আমি দেখতাম, তিনি কীভাবে আমাদের পরিবার, পেশাদারি জীবন আর তাঁর গানের সাধনাকে একসঙ্গে সমন্বয় করতেন। তিনি শত ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারের খোঁজখবর নিতে ভুলতেন না। দেশের বাইরে গেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। পরিবার ছিল তাঁর আশ্রয়, আর গান ছিল তাঁর আত্মার আরাধনা।
ছোটকাল থেকে দেখে এলাম, বাবা এক দিনের মধ্যেই কীভাবে গান লেখেন, সুর করেন, তারপর রেকর্ডিং স্টুডিওতে গিয়ে নিজের মিউজিক ডিরেকশন দিয়ে কত কালজয়ী গান তৈরি করেন।
ফিল্মের গান, অ্যালবামের গান, দেশাত্মবোধক গান–যেখানেই হাত দিলেন, সোনা ফলতো। বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে তা দেখতাম। একজন মানুষের জন্য নিঃশ্বাস নেওয়া যতটা সহজ, তাঁর জন্য অসাধারণ গান তৈরি করা ঠিক ততটাই সহজ ছিল। সৃষ্টিকর্তা তাঁকে সেই ক্ষমতা দিয়ে এই দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। তিনি গুণী শিল্পীদের নিয়ে যেমন কাজ করতেন, তেমনি তরুণ শিল্পীরাও তাঁর কাছ থেকে পেতেন সাহস ও ভরসা।
নতুন কণ্ঠ খুঁজে বের করা, তরুণ শিল্পীদের সাহস জুগিয়ে বেশ আনন্দ পেতেন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি ছিলেন এই জাতির একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন। রাষ্ট্রও তাঁকে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি দিয়েছে। এসবের বাইরেও মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অসাধারণ মানবিক, বিনয়ী ও স্নেহশীল।
প্রিয় বাবার ছায়ায় আদরে-শাসনে বড় হয়েছি। বড় ভাগ্যবান আমি এমন একজন বাবাকে এত কাছে থেকে পেয়েছি। তাঁর জীবনটাই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা। তিনি ছিলেন আমার কাছে পাঠশালা। তাঁর কাছ থেকে শিখেছি কীভাবে গিটারের তারের মাঝে সুরের খেলা তৈরি করা যায়, শিখেছি কীভাবে সাহসী মানুষ হতে হয়। শিখেছি স্রষ্টার দুনিয়ার গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা, শিখেছি দেশকে কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে হয়। দেশকে ভালোবাসতে হলে অনেক স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে হয়–এ শিক্ষাটাও পেয়েছি তাঁর জীবন থেকেই।
এত মহান একজন মানুষের একমাত্র সন্তান হয়ে আমি বুঝি, আমার দায়িত্ব কত গভীর। দায়িত্ব আছে গানের প্রতি, দায়িত্ব আছে এই দেশের প্রতি, দায়িত্ব আছে আমার বাবার ইতিহাস ও আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার প্রতি। সংগীতাঙ্গনের প্রতি তাঁর প্রচণ্ড দরদ ছিল। এই অঙ্গনের মানুষেরাও তাঁকে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছেন। সবার ভালোবাসাই ছিল তাঁর চলার পথের পাথেয়।
আজও যখন কোনো গান শুনি, মনে হয় আব্বা যেন পাশে বসে আছেন–নীরবে শুনছেন, মৃদু হাসছেন। তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর সুরের স্পর্শ, তাঁর আদর্শ–সবকিছু এখনও আমাকে পথ দেখায়। শূন্যতার ভেতরেও তাঁর উপস্থিতি আমি অনুভব করি প্রতিটি সুরে, প্রতিটি স্মৃতিতে।
আপনারা যারা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে ভালোবাসেন, তাঁর গানকে ভালোবাসেন। আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ রাখছি, আপনারা সবাই দোয়া করবেন তাঁর জন্য। কৃতীমানের কি কখনও মৃত্যু হয়? হয় না। আর হয় না বলেই তিনি আজও বেঁচে আছেন আমাদের সবার হৃদয়ে। ভালোবাসার মানুষের মণিকোঠায় তিনি চিরকাল অমর। আজীবন তিনি বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে, তাঁর সৃষ্টি, তাঁর আদর্শ আর তাঁর ভালোবাসার আলো হয়ে।
লেখক: সংগীতশিল্পী ও প্রয়াত সুরকার ইমতিয়াজ বুলবুলের একমাত্র সন্তান।
অনলাইন ডেস্ক 

























