ঢাকা ০৪:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

সংঘাত নয়, সংযমী হোন

  • মুস্তাফা মুহিত
  • আপডেট সময় ০২:৩১:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫৩৩ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা সংকট জটিলতা তৈরী হতে পারে। দেশবিরোধী নানা শংকা সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করতে তৎপর অপশক্তিগুলো। কারো পাতানো পাঁদে পা ফেলা যাবেনা রাজননৈতিক দলগুলোকে। দলীয় কর্মীদের আরো বেশি সতর্ক হতে হবে দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশে যাতে, কেউ তাদের ব্যবহার করতে না পারে সংঘাতে।
সংঘাত এড়িয়ে চলুন। এই কথাটি আজ আর কোনো নৈতিক উপদেশ নয়—এটি জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতার নির্মম সতর্কবার্তা। কারণ সংঘাতে আপনি খুন হলে রাষ্ট্র হয়তো আপনাকে “শহীদ” বলবে, রাজনৈতিক দল হয়তো দু’দিন শোক প্রকাশ করবে, কিন্তু আপনার শূন্যতা চিরদিন ভোগ করবে আপনার পরিবার। দেশ হারাবে একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধা।
সংযম মানে ভীরুতা নয়, সংযম মানে দূরদর্শিতা। উত্তেজনায় পা বাড়ানো সহজ, কিন্তু এক পা পেছনে সরিয়ে জীবন রক্ষা করা সাহসেরই আরেক নাম। যে সংযমী থাকে, সে শুধু নিজেকে নয়—নিজের পরিবার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, বৃদ্ধ বাবাুমায়ের আশ্রয়টুকু বাঁচিয়ে রাখে। রাজপথে রক্ত ঝরানো নয়, বিবেক দিয়ে কথা বলাই টেকসই পরিবর্তনের পথ। জীবিত একজন সচেতন নাগরিকই সমাজ বদলাতে পারে—একজন মৃত “শহীদ” নয়। তাই সংঘাত নয়, সংযমের পথ অবলম্বন করুন।
খুন হওয়া আর শহীদ হওয়া—এই দুই শব্দের মধ্যে আবেগগত পার্থক্য থাকলেও বাস্তবতার কোনো পার্থক্য নেই। দু’ক্ষেত্রেই একটি পরিবার ধ্বংসের পথে হাঁটে।
‘দায়িত্ব নেবে বড় নেতা’—একটি পরীক্ষিত মিথ
রাজনৈতিক সংঘাতে নিহতদের পরিবার নিয়ে দেশে বহু বছর ধরেই এক ধরনের রোমান্টিক গল্প চালু আছে— “দল পরিবারের দায়িত্ব নেবে”, “নেতারা পাশে থাকবে”, “শহীদের সন্তানরা বড় মানুষ হবে।” কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
অতীতের দিকে তাকালেই দেখা যায়, ২০১৩ু১৪ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা, ২০১৮ সালের নির্বাচন-পূর্ব সংঘর্ষ কিংবা সাম্প্রতিক বছরগুলোর আন্দোলন—প্রতিটি পর্বেই শতাধিক মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ঘটনায় নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন দরিদ্র বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য।
নিহতদের পরিবার আজ কোথায়?
খোঁজ নিলে দেখবেন, অনেক স্ত্রী এখন ভিক্ষাবৃত্তি বা গৃহকর্মে বাধ্য। অনেক শিশু স্কুল ছেড়ে ইটভাটা, ওয়ার্কশপ বা হোটেলে কাজ করছে। অনেক পরিবার ঋণের বোঝায় নিঃস্ব।
যেসব ‘বড় নেতা’ দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাদের খোঁজ আজ আর পাওয়া যায় না।
শহীদের মর্যাদা, কিন্তু জীবিত সন্তানের অনাহার
রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ ঘোষণার পরও অধিকাংশ পরিবার কোনো নিয়মিত সহায়তা পায় না। এককালীন কিছু অনুদান—তা দিয়েই কি সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান নিশ্চিত হয়?
একজন বাবা মারা গেলে শুধু একজন মানুষ নয়, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ মারা যায়।
একজন মায়ের স্বামী হারানো মানে শুধু শোক নয়—আজীবন নিরাপত্তাহীনতা।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই বাস্তবতা জানে। তবু কেন সাধারণ কর্মীকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়? কারণ সংঘাতের লাশ প্রয়োজন হয়, কিন্তু লাশের পরিবার বোঝা হয়ে যায়।
প্রলোভনের ফাঁদে পা দেবেন না
“আপনি মরলে ইতিহাস আপনাকে মনে রাখবে”—এই কথা বলে যারা আপনাকে রাস্তায় নামাতে চায়, তারা কি আপনার সন্তানের স্কুল ফি দেবে? তারা কি আপনার স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ বহন করবে? তারা কি আপনার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেবে?
অতীতে যাদের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, তাদের খোঁজ নিন। জীবিত থাকতেই খোঁজ নিন—মৃত্যুর পরে নয়।
মনে রাখবেন, রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের পথ কখনোই নিজের জীবন ধ্বংস করা হতে পারে না। প্রতিবাদ হবে, আন্দোলন হবে—কিন্তু তা যেন সংঘাত ও মৃত্যুর দিকে না যায়।
কারণ শহীদের তালিকায় নাম উঠলেও, আপনার সন্তানের বাবার নাম মুছে যাবে।
আপনার স্ত্রীর স্বামীর পরিচয় হারাবে।
দেশের রাজনীতি বদলাতে পারে, ক্ষমতা বদলাতে পারে—কিন্তু আপনার মৃত্যু আর ফিরবে না।
তাই সংঘাত নয়, জীবন বাঁচান। নিজের জন্য নয়—আপনার পরিবারের জন্য। বাঁচুন দেশ মাতৃকার জন্য।

লেখক- সাহিত্যিক ও নির্বাহী সম্পাদক ফেনী সংবাদ

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ভেঙে দেওয়া হলো অন্তর্বর্তী সরকার

সংঘাত নয়, সংযমী হোন

আপডেট সময় ০২:৩১:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা সংকট জটিলতা তৈরী হতে পারে। দেশবিরোধী নানা শংকা সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করতে তৎপর অপশক্তিগুলো। কারো পাতানো পাঁদে পা ফেলা যাবেনা রাজননৈতিক দলগুলোকে। দলীয় কর্মীদের আরো বেশি সতর্ক হতে হবে দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশে যাতে, কেউ তাদের ব্যবহার করতে না পারে সংঘাতে।
সংঘাত এড়িয়ে চলুন। এই কথাটি আজ আর কোনো নৈতিক উপদেশ নয়—এটি জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতার নির্মম সতর্কবার্তা। কারণ সংঘাতে আপনি খুন হলে রাষ্ট্র হয়তো আপনাকে “শহীদ” বলবে, রাজনৈতিক দল হয়তো দু’দিন শোক প্রকাশ করবে, কিন্তু আপনার শূন্যতা চিরদিন ভোগ করবে আপনার পরিবার। দেশ হারাবে একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধা।
সংযম মানে ভীরুতা নয়, সংযম মানে দূরদর্শিতা। উত্তেজনায় পা বাড়ানো সহজ, কিন্তু এক পা পেছনে সরিয়ে জীবন রক্ষা করা সাহসেরই আরেক নাম। যে সংযমী থাকে, সে শুধু নিজেকে নয়—নিজের পরিবার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, বৃদ্ধ বাবাুমায়ের আশ্রয়টুকু বাঁচিয়ে রাখে। রাজপথে রক্ত ঝরানো নয়, বিবেক দিয়ে কথা বলাই টেকসই পরিবর্তনের পথ। জীবিত একজন সচেতন নাগরিকই সমাজ বদলাতে পারে—একজন মৃত “শহীদ” নয়। তাই সংঘাত নয়, সংযমের পথ অবলম্বন করুন।
খুন হওয়া আর শহীদ হওয়া—এই দুই শব্দের মধ্যে আবেগগত পার্থক্য থাকলেও বাস্তবতার কোনো পার্থক্য নেই। দু’ক্ষেত্রেই একটি পরিবার ধ্বংসের পথে হাঁটে।
‘দায়িত্ব নেবে বড় নেতা’—একটি পরীক্ষিত মিথ
রাজনৈতিক সংঘাতে নিহতদের পরিবার নিয়ে দেশে বহু বছর ধরেই এক ধরনের রোমান্টিক গল্প চালু আছে— “দল পরিবারের দায়িত্ব নেবে”, “নেতারা পাশে থাকবে”, “শহীদের সন্তানরা বড় মানুষ হবে।” কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
অতীতের দিকে তাকালেই দেখা যায়, ২০১৩ু১৪ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা, ২০১৮ সালের নির্বাচন-পূর্ব সংঘর্ষ কিংবা সাম্প্রতিক বছরগুলোর আন্দোলন—প্রতিটি পর্বেই শতাধিক মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ঘটনায় নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন দরিদ্র বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য।
নিহতদের পরিবার আজ কোথায়?
খোঁজ নিলে দেখবেন, অনেক স্ত্রী এখন ভিক্ষাবৃত্তি বা গৃহকর্মে বাধ্য। অনেক শিশু স্কুল ছেড়ে ইটভাটা, ওয়ার্কশপ বা হোটেলে কাজ করছে। অনেক পরিবার ঋণের বোঝায় নিঃস্ব।
যেসব ‘বড় নেতা’ দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাদের খোঁজ আজ আর পাওয়া যায় না।
শহীদের মর্যাদা, কিন্তু জীবিত সন্তানের অনাহার
রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ ঘোষণার পরও অধিকাংশ পরিবার কোনো নিয়মিত সহায়তা পায় না। এককালীন কিছু অনুদান—তা দিয়েই কি সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান নিশ্চিত হয়?
একজন বাবা মারা গেলে শুধু একজন মানুষ নয়, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ মারা যায়।
একজন মায়ের স্বামী হারানো মানে শুধু শোক নয়—আজীবন নিরাপত্তাহীনতা।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই বাস্তবতা জানে। তবু কেন সাধারণ কর্মীকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়? কারণ সংঘাতের লাশ প্রয়োজন হয়, কিন্তু লাশের পরিবার বোঝা হয়ে যায়।
প্রলোভনের ফাঁদে পা দেবেন না
“আপনি মরলে ইতিহাস আপনাকে মনে রাখবে”—এই কথা বলে যারা আপনাকে রাস্তায় নামাতে চায়, তারা কি আপনার সন্তানের স্কুল ফি দেবে? তারা কি আপনার স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ বহন করবে? তারা কি আপনার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেবে?
অতীতে যাদের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, তাদের খোঁজ নিন। জীবিত থাকতেই খোঁজ নিন—মৃত্যুর পরে নয়।
মনে রাখবেন, রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের পথ কখনোই নিজের জীবন ধ্বংস করা হতে পারে না। প্রতিবাদ হবে, আন্দোলন হবে—কিন্তু তা যেন সংঘাত ও মৃত্যুর দিকে না যায়।
কারণ শহীদের তালিকায় নাম উঠলেও, আপনার সন্তানের বাবার নাম মুছে যাবে।
আপনার স্ত্রীর স্বামীর পরিচয় হারাবে।
দেশের রাজনীতি বদলাতে পারে, ক্ষমতা বদলাতে পারে—কিন্তু আপনার মৃত্যু আর ফিরবে না।
তাই সংঘাত নয়, জীবন বাঁচান। নিজের জন্য নয়—আপনার পরিবারের জন্য। বাঁচুন দেশ মাতৃকার জন্য।

লেখক- সাহিত্যিক ও নির্বাহী সম্পাদক ফেনী সংবাদ