রাষ্ট্র যখন বিচার দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সে ক্ষতিপূরণ দেয়। আর সেই ক্ষতিপূরণ যদি হয় চাকরি—তবে সেটি আর মানবিকতা থাকে না, হয়ে ওঠে বিচারহীনতার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি।
শহীদ ওসমান হাদির মৃত্যুর প্রকৃত বিচার আজও হয়নি। তদন্ত, দায় নির্ধারণ, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি—সবই অনুপস্থিত। অথচ এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার শহীদ ওসমান হাদির বড় ভাই ওমর হাদিকে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে অবস্থিত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে দ্বিতীয় সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে।
গত ১৫ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ নিয়োগের কথা জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনটি জারি হয়েছে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে, যেখানে স্বাক্ষর করেছেন যুগ্ম সচিব আবুল হায়াত মো. রফিক। প্রশ্ন হলো—বিচার ছাড়া এই রাষ্ট্রীয় পুরস্কার কিসের ইঙ্গিত বহন করে?
এই চিত্র নতুন নয়। ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি—যার নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে নৃশংসতার এক প্রতীক—তার হত্যাকাণ্ডের পরও একই পথ অনুসরণ করেছিল রাষ্ট্র। নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানকে এনআরবি ব্যাংকে ‘ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল (সোমবার) নুসরাতের পরিবার গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিচারের দাবিতে সাক্ষাৎ করতে গেলে, শেখ হাসিনা নিজ হাতে নোমানের হাতে ব্যাংকের নিয়োগপত্র তুলে দেন। সে সময় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। দৃশ্যটি ছিল আবেগঘন, কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ।
রাষ্ট্র কি বিচার দিতে না পেরে চাকরি দিয়ে দায় সারতে চেয়েছিল?
নুসরাতের হত্যাকাণ্ডে কিছু বিচারিক অগ্রগতি হলেও, পুরো ঘটনার পেছনের প্রভাবশালী মহল, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক দায় আজও আলোচনার বাইরে। আর ওসমান হাদির ক্ষেত্রে তো বিচার প্রক্রিয়াই প্রশ্নের মুখে।
এই দুটি ঘটনায় একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় দর্শন স্পষ্ট—বিচার নয়, পুনর্বাসন। দায় নির্ধারণ নয়, সুবিধা প্রদান।
রাষ্ট্র যদি মনে করে, চাকরি দিয়েই ন্যায়বিচারের দায় শেষ, তবে আদালত, তদন্ত সংস্থা ও আইনের শাসনের প্রয়োজন কোথায়?
আসলে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি বিচারহীনতার এক সুপরিকল্পিত সংস্কৃতি—যেখানে অপরাধের বিচার হয় না, কিন্তু ‘সমঝোতা’ হয়। যেখানে কাঠগড়ায় দাঁড়ায় না অপরাধী, বরং নীরবে সুবিধা পায় ভুক্তভোগীর পরিবার—যেন তারা আর প্রশ্ন না তোলে।
এই সংস্কৃতি কারা টিকিয়ে রাখতে চায়?
যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে, যারা অপরাধের সঙ্গে ক্ষমতার যোগসূত্র গোপন রাখতে চায়, যারা জানে—একটি চাকরি দেওয়া সহজ, কিন্তু একটি সুষ্ঠু বিচার প্রতিষ্ঠা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিচার হলে প্রশ্ন উঠবে—কে দায়ী? কোন প্রভাবশালী মহল জড়িত? কোন প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা আছে? তাই বিচার নয়, চাকরিই নিরাপদ সমাধান।
কিন্তু রাষ্ট্র কি কেবল চাকরি দেওয়ার যন্ত্র? নাকি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান?
আজ নুসরাত, কাল উসমান হাদি—আগামীকাল কে?
যে রাষ্ট্র বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়, সে রাষ্ট্রে নিরাপত্তা নয়, জন্ম নেয় ভয়। সেখানে অপরাধীরা সাহস পায়, আর সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের আশা হারায়।
এই কলাম কোনো ব্যক্তি বা পরিবারকে চাকরি দেওয়ার বিরোধিতা নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর—বিচারকে পাশ কাটিয়ে চাকরি দিয়ে কি রাষ্ট্র নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে চাইছে?
যতদিন এই প্রশ্নের সৎ উত্তর না আসবে, ততদিন বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি কেবল টিকেই থাকবে না—আরও শক্ত শেকড় গাড়বে।
লেখক- সাহিত্যিক ও নির্বাহী সম্পাদক ফেনী সংবাদ
মুস্তাফা মুহিত 

























