ঢাকা ০৬:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর মহা দুর্নীতিবাজ, টিপু মুন্সির ভায়রা আবু নাসের চৌধুরীর ঢাকায় পোষ্টিং শিক্ষা প্রকৌশলী আলেক হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পিলার ও কয়েন চক্রের মূলহোতা ফরিদপুরের আওয়ামী নেতা আব্দুস সোবহান মিথ্যা বলাৎকারের মামলায় পাঁচ মাস ধরে কারাবন্দি শ্রমজীবী মোতালেব হোসেন দুর্নীতির অভিযোগ ঝুলে থাকতেই এলজিইডির শীর্ষ পদে বেলাল হোসেন শহীদুল্লাহ সিন্ডিকেটের ৩৮৭ কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্য আমিনবাজার ভূমি অফিসে ঘুষের আখড়া নাজির-ক্যাশিয়ার সাজেদুল ও সহযোগীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ ভবভদী আদর্শ যুব সংঘ’-এর উদ্যোগে অসহায়দের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ ভোলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যা শুধু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের জন্যই নয়, বরং সমাজ, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিকগুলো একসাথে বিবেচনা না করলে বর্তমান পরিস্থিতির সঠিক চিত্র পাওয়া কঠিন। এই সময়টিকে শুধু অস্থিরতা বা সংকট হিসেবে দেখার পরিবর্তে, এটি দেশের জন্য একটি আত্মমূল্যায়ন এবং পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির সংকোচন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ আজ বাংলাদেশকে একটি জটিল বাস্তবতায় নিয়ে এসেছে।

রাজনৈতিক বাস্তবতা আজ এক ধরনের আস্থার সংকটে পরিণত হয়েছে। ভোট, নির্বাচন, সংসদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর মানুষের আস্থা অনেকাংশেই ক্ষয়প্রাপ্ত। এই আস্থা কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে। দীর্ঘ সময় ধরে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির অভাব, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সীমিত উপস্থিতি, প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ এবং মতের বহুত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ—এসব মিলে মানুষকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি সন্দেহী করে তুলেছে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা না থাকলে ভোটের ফলাফল কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যায়, যা গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক সংলাপের অভাব। মতভিন্নতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হলেও, বাংলাদেশে তা প্রায়শই শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে শত্রু হিসেবে দেখার কারণে, সমালোচনাকে গ্রহণযোগ্যতার জায়গায় নেওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা, মানুষের আস্থা এবং সামাজিক স্থিতি একসাথে ঝুঁকির মুখে পড়ে। রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলার একটি মাধ্যম। যখন রাজনীতিতে আস্থা কমে যায়, তখন সাধারণ মানুষ প্রশাসনের সঙ্গে নিজের সম্পর্কেও অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

প্রশাসনও এই সময়ে একাধিক চাপের মুখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নির্বাচন পরিচালনা, অর্থনৈতিক স্থিতি বজায় রাখা এবং সামাজিক শান্তি নিশ্চিত করা—এসব কাজ একসাথে করা সহজ নয়। যদি প্রশাসন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, তাহলে তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একটি কার্যকর রাষ্ট্র কেবল আইন বা বাহিনীর শক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশে প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশন বিদ্যমান হলেও, তাদের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এই আস্থা পুনর্গঠন এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও দ্বৈত বাস্তবতা বিদ্যমান। একদিকে রয়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ, দারিদ্র্য হ্রাসের পরিসংখ্যান এবং মোট জিডিপির বৃদ্ধির তথ্য। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, খাদ্য, জ্বালানি, বাসাভাড়া ও চিকিৎসা খরচে বৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব অনুভব করছে। পরিসংখ্যান ভিন্ন দেখালেও, বাস্তব জীবনে মানুষ প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়ছে।

তরুণ সমাজ এই অবস্থার সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত। শিক্ষিত তরুণরা কর্মসংস্থানের অযোগ্যতা, মানসম্মত চাকরির অভাব এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তা দেখে হতাশ হচ্ছে। তরুণরা দেশের উৎপাদনশীল শক্তি, নেতৃত্ব এবং নতুন উদ্ভাবনের ভরসা। তাদের হতাশা যদি রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ইতিবাচকভাবে ব্যবস্থাপনা করা না হয়, তাহলে তা অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে নয়, বাস্তব নীতি ও কর্মসূচির মাধ্যমে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আর্থিক সংস্কার এখানে আর নীতিগত আলোচনার বিষয় নয়, বরং দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা না থাকলে, এটি শুধু অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতারও উৎস হতে পারে।

সামাজিক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের নীরব উদ্বেগ। মানুষ প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আলাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ক্ষোভ প্রকাশ করছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে গুজব ও ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মানুষকে নিরাপদভাবে কথা বলার সুযোগ দেওয়া, যাতে অসন্তোষ সহিংসতায় রূপ না নেয়। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ এবং ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ আজ আর কেবল আভ্যন্তরীণ রাজনীতির খেলোয়াড় নয়; এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাণিজ্য, অভিবাসন, শান্তিরক্ষা এবং ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করছে। এই মনোযোগের সঙ্গে এসেছে প্রত্যাশা। নির্বাচন, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত সতর্ক রাখছে। এই চাপকে শত্রুতা হিসেবে না দেখেই, রাষ্ট্রকে এটিকে আত্মসংস্কারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। sensationalism বা একপেশে প্রচার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো তথ্যভিত্তিক, যাচাইকৃত এবং দায়িত্বশীল আলোচনা তৈরি করা। একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবী সমাজ, শিক্ষক, গবেষক ও পেশাজীবীদেরও নীরবতা ভাঙা জরুরি। সংকটকালীন সময় নীরবতা অনেক সময় নিরাপদ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, এই জাতি সংকট মোকাবিলার ক্ষমতা রাখে। মুক্তিযুদ্ধের পর পুনর্গঠন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা—সবক্ষেত্রেই দেশ পুনরায় নিজেকে শক্তিশালী করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে পার্থক্য হলো, এবার সংকট শুধু বাহ্যিক নয়; এটি আস্থার, কাঠামোর এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট। এই সংকট কাটাতে হলে রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সমাজকে একসঙ্গে আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

এবারের নির্বাচনী প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সংলাপ—এসবের সমন্বয় না হলে স্থিতিশীল গণতন্ত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া আইন, নীতি এবং কাঠামো কার্যকর হয় না। নির্বাচন শুধু একটি দিন নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া, যা গণতন্ত্রের মৌলিক উদ্দেশ্য—নাগরিকদের মতামতের প্রতিফলন—সম্পূর্ণ করতে হবে।

বাংলাদেশ আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেখানে সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথ নির্ধারণ করবে। যদি বিভাজন ও স্বল্পমেয়াদি লাভের রাজনীতি প্রাধান্য পায়, তাহলে ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হবে। আর যদি সংলাপ, সহনশীলতা এবং সংস্কারের পথ বেছে নেওয়া যায়, তাহলে অস্থিরতার মধ্য থেকেই একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের জন্ম হতে পারে। এই সম্ভাবনাই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা নয়, বরং সমাধানের পথ তৈরি করা। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো ক্ষমতার জন্য লড়াই নয়, জনগণের জীবনকে সহজ ও নিরাপদ করা। সমাজের দায়িত্ব হলো সচেতন নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণ করা এবং নীরবতা ভাঙা। অর্থনীতি ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই চারটি স্তর একসাথে কাজ করলে বাংলাদেশ অস্থিরতার মধ্যেও স্থিতিশীল ও উন্নয়নমুখী হতে পারবে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, সব চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকির মধ্যেও, একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় মুহূর্ত। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, সংকট কখনো শুধু ধ্বংস নয়, বরং পুনর্গঠন এবং সম্ভাবনার জন্ম দিতে পারে। দেশের মানুষ, রাজনীতি, প্রশাসন এবং সমাজ যদি একত্রিতভাবে এই শিক্ষাকে কাজে লাগায়, তাহলে এই সন্ধিক্ষণ কেবল একটি সংকট নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

লেখকঃ উপ-সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ মহসীন

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ

বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি

আপডেট সময় ০৪:২০:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যা শুধু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের জন্যই নয়, বরং সমাজ, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিকগুলো একসাথে বিবেচনা না করলে বর্তমান পরিস্থিতির সঠিক চিত্র পাওয়া কঠিন। এই সময়টিকে শুধু অস্থিরতা বা সংকট হিসেবে দেখার পরিবর্তে, এটি দেশের জন্য একটি আত্মমূল্যায়ন এবং পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির সংকোচন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ আজ বাংলাদেশকে একটি জটিল বাস্তবতায় নিয়ে এসেছে।

রাজনৈতিক বাস্তবতা আজ এক ধরনের আস্থার সংকটে পরিণত হয়েছে। ভোট, নির্বাচন, সংসদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর মানুষের আস্থা অনেকাংশেই ক্ষয়প্রাপ্ত। এই আস্থা কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে। দীর্ঘ সময় ধরে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির অভাব, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সীমিত উপস্থিতি, প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ এবং মতের বহুত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ—এসব মিলে মানুষকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি সন্দেহী করে তুলেছে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা না থাকলে ভোটের ফলাফল কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যায়, যা গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক সংলাপের অভাব। মতভিন্নতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হলেও, বাংলাদেশে তা প্রায়শই শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে শত্রু হিসেবে দেখার কারণে, সমালোচনাকে গ্রহণযোগ্যতার জায়গায় নেওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা, মানুষের আস্থা এবং সামাজিক স্থিতি একসাথে ঝুঁকির মুখে পড়ে। রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলার একটি মাধ্যম। যখন রাজনীতিতে আস্থা কমে যায়, তখন সাধারণ মানুষ প্রশাসনের সঙ্গে নিজের সম্পর্কেও অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

প্রশাসনও এই সময়ে একাধিক চাপের মুখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নির্বাচন পরিচালনা, অর্থনৈতিক স্থিতি বজায় রাখা এবং সামাজিক শান্তি নিশ্চিত করা—এসব কাজ একসাথে করা সহজ নয়। যদি প্রশাসন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, তাহলে তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একটি কার্যকর রাষ্ট্র কেবল আইন বা বাহিনীর শক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশে প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশন বিদ্যমান হলেও, তাদের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এই আস্থা পুনর্গঠন এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও দ্বৈত বাস্তবতা বিদ্যমান। একদিকে রয়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ, দারিদ্র্য হ্রাসের পরিসংখ্যান এবং মোট জিডিপির বৃদ্ধির তথ্য। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, খাদ্য, জ্বালানি, বাসাভাড়া ও চিকিৎসা খরচে বৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব অনুভব করছে। পরিসংখ্যান ভিন্ন দেখালেও, বাস্তব জীবনে মানুষ প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়ছে।

তরুণ সমাজ এই অবস্থার সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত। শিক্ষিত তরুণরা কর্মসংস্থানের অযোগ্যতা, মানসম্মত চাকরির অভাব এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তা দেখে হতাশ হচ্ছে। তরুণরা দেশের উৎপাদনশীল শক্তি, নেতৃত্ব এবং নতুন উদ্ভাবনের ভরসা। তাদের হতাশা যদি রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ইতিবাচকভাবে ব্যবস্থাপনা করা না হয়, তাহলে তা অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে নয়, বাস্তব নীতি ও কর্মসূচির মাধ্যমে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আর্থিক সংস্কার এখানে আর নীতিগত আলোচনার বিষয় নয়, বরং দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা না থাকলে, এটি শুধু অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতারও উৎস হতে পারে।

সামাজিক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের নীরব উদ্বেগ। মানুষ প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আলাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ক্ষোভ প্রকাশ করছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে গুজব ও ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মানুষকে নিরাপদভাবে কথা বলার সুযোগ দেওয়া, যাতে অসন্তোষ সহিংসতায় রূপ না নেয়। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ এবং ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ আজ আর কেবল আভ্যন্তরীণ রাজনীতির খেলোয়াড় নয়; এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাণিজ্য, অভিবাসন, শান্তিরক্ষা এবং ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করছে। এই মনোযোগের সঙ্গে এসেছে প্রত্যাশা। নির্বাচন, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত সতর্ক রাখছে। এই চাপকে শত্রুতা হিসেবে না দেখেই, রাষ্ট্রকে এটিকে আত্মসংস্কারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। sensationalism বা একপেশে প্রচার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো তথ্যভিত্তিক, যাচাইকৃত এবং দায়িত্বশীল আলোচনা তৈরি করা। একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবী সমাজ, শিক্ষক, গবেষক ও পেশাজীবীদেরও নীরবতা ভাঙা জরুরি। সংকটকালীন সময় নীরবতা অনেক সময় নিরাপদ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, এই জাতি সংকট মোকাবিলার ক্ষমতা রাখে। মুক্তিযুদ্ধের পর পুনর্গঠন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা—সবক্ষেত্রেই দেশ পুনরায় নিজেকে শক্তিশালী করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে পার্থক্য হলো, এবার সংকট শুধু বাহ্যিক নয়; এটি আস্থার, কাঠামোর এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট। এই সংকট কাটাতে হলে রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সমাজকে একসঙ্গে আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

এবারের নির্বাচনী প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সংলাপ—এসবের সমন্বয় না হলে স্থিতিশীল গণতন্ত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া আইন, নীতি এবং কাঠামো কার্যকর হয় না। নির্বাচন শুধু একটি দিন নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া, যা গণতন্ত্রের মৌলিক উদ্দেশ্য—নাগরিকদের মতামতের প্রতিফলন—সম্পূর্ণ করতে হবে।

বাংলাদেশ আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেখানে সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথ নির্ধারণ করবে। যদি বিভাজন ও স্বল্পমেয়াদি লাভের রাজনীতি প্রাধান্য পায়, তাহলে ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হবে। আর যদি সংলাপ, সহনশীলতা এবং সংস্কারের পথ বেছে নেওয়া যায়, তাহলে অস্থিরতার মধ্য থেকেই একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের জন্ম হতে পারে। এই সম্ভাবনাই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা নয়, বরং সমাধানের পথ তৈরি করা। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো ক্ষমতার জন্য লড়াই নয়, জনগণের জীবনকে সহজ ও নিরাপদ করা। সমাজের দায়িত্ব হলো সচেতন নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণ করা এবং নীরবতা ভাঙা। অর্থনীতি ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই চারটি স্তর একসাথে কাজ করলে বাংলাদেশ অস্থিরতার মধ্যেও স্থিতিশীল ও উন্নয়নমুখী হতে পারবে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, সব চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকির মধ্যেও, একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় মুহূর্ত। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, সংকট কখনো শুধু ধ্বংস নয়, বরং পুনর্গঠন এবং সম্ভাবনার জন্ম দিতে পারে। দেশের মানুষ, রাজনীতি, প্রশাসন এবং সমাজ যদি একত্রিতভাবে এই শিক্ষাকে কাজে লাগায়, তাহলে এই সন্ধিক্ষণ কেবল একটি সংকট নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

লেখকঃ উপ-সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ মহসীন