ঢাকা ০৫:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর মহা দুর্নীতিবাজ, টিপু মুন্সির ভায়রা আবু নাসের চৌধুরীর ঢাকায় পোষ্টিং শিক্ষা প্রকৌশলী আলেক হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পিলার ও কয়েন চক্রের মূলহোতা ফরিদপুরের আওয়ামী নেতা আব্দুস সোবহান মিথ্যা বলাৎকারের মামলায় পাঁচ মাস ধরে কারাবন্দি শ্রমজীবী মোতালেব হোসেন দুর্নীতির অভিযোগ ঝুলে থাকতেই এলজিইডির শীর্ষ পদে বেলাল হোসেন শহীদুল্লাহ সিন্ডিকেটের ৩৮৭ কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্য আমিনবাজার ভূমি অফিসে ঘুষের আখড়া নাজির-ক্যাশিয়ার সাজেদুল ও সহযোগীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ ভবভদী আদর্শ যুব সংঘ’-এর উদ্যোগে অসহায়দের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ ভোলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

আমরা মানুষ হিসেবে নয়, পরিচয় হিসেবে বিচার করি

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় তার কারাগারের ভেতর থেকে, আর তার সবচেয়ে নির্মম রূপ প্রকাশ পায় তার দুর্বল নাগরিকদের জীবনে। বাগেরহাটের সেই ছোট্ট ঘর, যেখানে এক তরুণী মা ও তার নয় মাসের শিশুর জীবন নিভে গেছে, শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির সম্মিলিত ব্যর্থতার এক নিঃশব্দ অভিযোগপত্র।

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন জুয়েল হাসান সাদ্দাম। তার অপরাধ কী—সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। কিন্তু আদালতের রায় হওয়ার আগেই একজন মানুষকে অপরাধী ধরে নেওয়া, তার পরিবারকে সামাজিকভাবে দণ্ডিত করা, আর সেই দণ্ড এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যেখানে একজন নারী ও একটি শিশু চরম অসহায়ত্বে নিঃশেষ হয়ে যায়—এটা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।

সাদ্দাম কারাগারে বসে জানতেন, তার স্ত্রী একা। জানতেন, তার সংসার ভেঙে পড়ছে। জানতেন, নয় মাসের শিশুটির মুখ তিনি কোনোদিন দেখেননি। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি। কারাগারের ভেতর থেকেও তিনি বাবা ছিলেন। তিনি তার শিশুপুত্রকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে তিনি ছেলেকে বলেছিলেন—“মায়ের খেয়াল রাখবি।” এই একটি বাক্যই যথেষ্ট আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য। একজন বন্দি বাবা, যিনি নিজেই রাষ্ট্রের হেফাজতে, তার শিশুর কাছে পরিবারের দায়িত্ব রেখে যাচ্ছেন।

এটাই সেই জায়গা, যেখানে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা সবচেয়ে ভাঙা ভাবে প্রকাশ পায়। সেই চিঠি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কারাগারে থাকা মানুষটিও মানুষ। তারও আবেগ আছে, উদ্বেগ আছে, দায়িত্ব আছে। রাষ্ট্র হয়তো তাকে একটি ফাইল নম্বর হিসেবে দেখে, কিন্তু তার সন্তানের কাছে তিনি শুধু বাবা। সেই বাবার শেষ বার্তাটি ছিল না কোনো রাজনীতি, ছিল না কোনো প্রতিশোধ—ছিল শুধু পরিবারের বেঁচে থাকার আকুতি।

কিন্তু সেই আকুতি শোনার কেউ ছিল না।

সংবাদ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী চরম আর্থিক ও সামাজিক সংকটে ছিলেন। স্বামী কারাগারে, সংসারের কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস নেই, শিশুকে নিয়ে একা জীবন চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। সাহায্যের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন—এমন কথাও এসেছে। কিন্তু স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দেয়াল। কেউ ভয় পেয়েছে, কেউ মুখ ফিরিয়েছে, কেউ নীরব থেকেছে। এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

আমরা প্রায়ই বলি—মানুষ সামাজিক জীব। কিন্তু রাজনীতি যখন মানুষের সামাজিক সম্পর্ক নির্ধারণ করে দেয়, তখন সেই সমাজ আর মানবিক থাকে না। এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে—একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়ের দায় কি তার স্ত্রী ও শিশুকে বহন করতে হবে? একটি শিশু কি তার বাবার রাজনীতির শাস্তি পেতে পারে?

রাষ্ট্র এখানে কোথায় ছিল? সামাজিক নিরাপত্তা কোথায় ছিল? এমন কোনো ব্যবস্থা কি নেই, যেখানে কারাগারে থাকা বন্দির পরিবার অন্তত ন্যূনতম সহায়তা পাবে? এমন কোনো মনিটরিং কি নেই, যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়া হবে? নাকি আমরা কেবল মৃত্যুর পর হঠাৎ বিবেকবান হয়ে উঠি?

সবচেয়ে নিষ্ঠুর অধ্যায়টি শুরু হয় মৃত্যুর পর। একজন বাবা কারাগারে বসে জানতে পারেন—তার স্ত্রী ও সন্তান আর নেই। এই সংবাদ কোনো মানুষের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব? পরিবার প্যারোলের আবেদন করে। রাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়—শেষবারের মতো যেন তিনি তার সন্তানের মুখ দেখতে পারেন। কিন্তু এখানেও রাষ্ট্র মানবিক হতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত যে অনুমতি দেওয়া হয়, তা যেন আরও এক মানসিক শাস্তি। জেলগেটে সীমিত সময়ের জন্য লাশ দেখার অনুমতি।

আর সেই সময়, সাদ্দাম প্রথমবার কোলে নেন তার শিশুকে—মৃত্যুর পরে। ভাবা যায় কি এর চেয়ে বেশি হৃদয়বিদারক ও করুণ ঘটনা হতে পারে? একজন বাবা, যিনি জীবনের প্রথম নয় মাসে তার সন্তানকে কোলে নিতে পারেননি, শেষবারে কেবল লাশ হয়ে সেই অনুভূতি পান। এই এক মুহূর্তের কোলে নেওয়া আমাদের চোখ খুলে দেয়—রাষ্ট্র কতটা ভেঙে দিয়েছে এক পরিবারকে। এই ছোট্ট মানবিক মুহূর্তটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ববিমুখতার আঙুলে আঘাত প্রমাণ করে।

যে দেশে শোক পালনের জন্য অনুমতি লাগে, যে দেশে কান্নারও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়, সেই দেশ কি সত্যিই মানুষের রাষ্ট্র? কারাগারে থাকা মানে কি মানুষের সব মানবিক অধিকার কেড়ে নেওয়া? একজন বন্দি কি বাবা থাকতে পারেন না? স্বামী থাকতে পারেন না?

এই ঘটনার পর নানা প্রশ্ন উঠেছে। এটি আত্মহত্যা কি না, নাকি অন্য কিছু—তদন্ত হোক, সত্য বেরিয়ে আসুক। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—এই মৃত্যু কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্তের ফল নয়। এটি তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের চাপ, অবহেলা, অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভেতর দিয়ে। রাষ্ট্র যদি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের দায় চাপিয়ে নিজেকে মুক্ত করে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও এমন মৃত্যু ঘটবে।

বাংলাদেশে বিচার ছাড়াই বছরের পর বছর কারাগারে থাকা মানুষের সংখ্যা কম নয়। রাজনৈতিক মামলায় অনেক সময় মানুষ দীর্ঘদিন বন্দি থাকে। কেউ শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হয়, কিন্তু ততদিনে তার জীবন, পরিবার, ভবিষ্যৎ সব ভেঙে পড়ে। রাষ্ট্র কি কখনো সেই ক্ষতির দায় নেয়? কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়? কোনো ক্ষমা চায়? ইতিহাস বলে—না।

ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি বদলায় না। আগে যারা ক্ষমতায় ছিল, তারাও বিরোধীদের দমন করেছে। এখন যারা ক্ষমতায়, তারাও একই পথ অনুসরণ করছে। মাঝখানে সাধারণ মানুষই কেবল পিষ্ট হচ্ছে। আজ এক দলের কর্মী, কাল আরেক দলের কর্মী—কিন্তু কান্নার ভাষা এক, লাশের নীরবতা এক।

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা আমাদের দলকানা মানসিকতা। আমরা মানুষ হিসেবে নয়, পরিচয় হিসেবে বিচার করি। আজ যদি সাদ্দাম “আমাদের লোক” হতেন, প্রতিক্রিয়া হয়তো অন্যরকম হতো। এই দ্বিচারিতা আমাদের বিবেককে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি—আজ যার সঙ্গে হচ্ছে, কাল সেটি আমার সঙ্গেও হতে পারে।

এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেন ঢালাও মামলা হয়? কেন যাচাই ছাড়াই গ্রেপ্তার হয়? কেন রাজনৈতিক পরিচয় তদন্তের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে? পুলিশ ও প্রশাসন কি জনগণের সেবক, নাকি ক্ষমতার হাতিয়ার? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিলে, কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।

একটি রাষ্ট্র তখনই সভ্য হয়, যখন সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে পারে। একজন বন্দির স্ত্রী, একটি শিশু—এর চেয়ে দুর্বল অবস্থান আর কী হতে পারে? সেই জায়গায় রাষ্ট্র যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, অগ্রগতির সব গল্প অর্থহীন হয়ে যায়।

আজ সেই চিঠিটি পড়ে আমাদের থমকে যেতে হয়। “মায়ের খেয়াল রাখবি”—এই একটি বাক্যের ভেতর লুকিয়ে আছে একজন বাবার অসীম ভালোবাসা, অসহায়ত্ব আর বিশ্বাস। বিশ্বাস—হয়তো সমাজ বাঁচাবে, হয়তো রাষ্ট্র দেখবে। কিন্তু সেই বিশ্বাস ভেঙে গেছে।

আজ বাগেরহাটের সেই ঘর নিস্তব্ধ। আজ একজন বাবা জীবনের সবচেয়ে বড় শোক নিয়ে বেঁচে আছেন। এই শোক শুধু তার একার নয়—এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির ব্যর্থতার প্রতিফলন।

আমরা যদি এখনো প্রশ্ন না তুলি, যদি এখনো মানবিকতার পক্ষে না দাঁড়াই, তাহলে আগামীকাল আরও সাদ্দাম থাকবে, আরও সুবর্ণা থাকবে, আরও শিশু হারাবে।

আমাদের এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে বিচার মানে প্রতিশোধ নয়।
আমাদের এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে কারাগার মানে পরিবারের সামাজিক মৃত্যু নয়।
আমাদের এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে শোক অপরাধ নয়, কান্না দুর্বলতা নয়।

মানুষের কান্না শোনার রাষ্ট্র চাই।
মানুষের মর্যাদা ফেরত চাই।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ

আমরা মানুষ হিসেবে নয়, পরিচয় হিসেবে বিচার করি

আপডেট সময় ০১:২৪:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় তার কারাগারের ভেতর থেকে, আর তার সবচেয়ে নির্মম রূপ প্রকাশ পায় তার দুর্বল নাগরিকদের জীবনে। বাগেরহাটের সেই ছোট্ট ঘর, যেখানে এক তরুণী মা ও তার নয় মাসের শিশুর জীবন নিভে গেছে, শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির সম্মিলিত ব্যর্থতার এক নিঃশব্দ অভিযোগপত্র।

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন জুয়েল হাসান সাদ্দাম। তার অপরাধ কী—সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। কিন্তু আদালতের রায় হওয়ার আগেই একজন মানুষকে অপরাধী ধরে নেওয়া, তার পরিবারকে সামাজিকভাবে দণ্ডিত করা, আর সেই দণ্ড এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যেখানে একজন নারী ও একটি শিশু চরম অসহায়ত্বে নিঃশেষ হয়ে যায়—এটা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।

সাদ্দাম কারাগারে বসে জানতেন, তার স্ত্রী একা। জানতেন, তার সংসার ভেঙে পড়ছে। জানতেন, নয় মাসের শিশুটির মুখ তিনি কোনোদিন দেখেননি। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি। কারাগারের ভেতর থেকেও তিনি বাবা ছিলেন। তিনি তার শিশুপুত্রকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে তিনি ছেলেকে বলেছিলেন—“মায়ের খেয়াল রাখবি।” এই একটি বাক্যই যথেষ্ট আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য। একজন বন্দি বাবা, যিনি নিজেই রাষ্ট্রের হেফাজতে, তার শিশুর কাছে পরিবারের দায়িত্ব রেখে যাচ্ছেন।

এটাই সেই জায়গা, যেখানে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা সবচেয়ে ভাঙা ভাবে প্রকাশ পায়। সেই চিঠি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কারাগারে থাকা মানুষটিও মানুষ। তারও আবেগ আছে, উদ্বেগ আছে, দায়িত্ব আছে। রাষ্ট্র হয়তো তাকে একটি ফাইল নম্বর হিসেবে দেখে, কিন্তু তার সন্তানের কাছে তিনি শুধু বাবা। সেই বাবার শেষ বার্তাটি ছিল না কোনো রাজনীতি, ছিল না কোনো প্রতিশোধ—ছিল শুধু পরিবারের বেঁচে থাকার আকুতি।

কিন্তু সেই আকুতি শোনার কেউ ছিল না।

সংবাদ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী চরম আর্থিক ও সামাজিক সংকটে ছিলেন। স্বামী কারাগারে, সংসারের কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস নেই, শিশুকে নিয়ে একা জীবন চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। সাহায্যের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন—এমন কথাও এসেছে। কিন্তু স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দেয়াল। কেউ ভয় পেয়েছে, কেউ মুখ ফিরিয়েছে, কেউ নীরব থেকেছে। এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

আমরা প্রায়ই বলি—মানুষ সামাজিক জীব। কিন্তু রাজনীতি যখন মানুষের সামাজিক সম্পর্ক নির্ধারণ করে দেয়, তখন সেই সমাজ আর মানবিক থাকে না। এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে—একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়ের দায় কি তার স্ত্রী ও শিশুকে বহন করতে হবে? একটি শিশু কি তার বাবার রাজনীতির শাস্তি পেতে পারে?

রাষ্ট্র এখানে কোথায় ছিল? সামাজিক নিরাপত্তা কোথায় ছিল? এমন কোনো ব্যবস্থা কি নেই, যেখানে কারাগারে থাকা বন্দির পরিবার অন্তত ন্যূনতম সহায়তা পাবে? এমন কোনো মনিটরিং কি নেই, যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়া হবে? নাকি আমরা কেবল মৃত্যুর পর হঠাৎ বিবেকবান হয়ে উঠি?

সবচেয়ে নিষ্ঠুর অধ্যায়টি শুরু হয় মৃত্যুর পর। একজন বাবা কারাগারে বসে জানতে পারেন—তার স্ত্রী ও সন্তান আর নেই। এই সংবাদ কোনো মানুষের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব? পরিবার প্যারোলের আবেদন করে। রাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়—শেষবারের মতো যেন তিনি তার সন্তানের মুখ দেখতে পারেন। কিন্তু এখানেও রাষ্ট্র মানবিক হতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত যে অনুমতি দেওয়া হয়, তা যেন আরও এক মানসিক শাস্তি। জেলগেটে সীমিত সময়ের জন্য লাশ দেখার অনুমতি।

আর সেই সময়, সাদ্দাম প্রথমবার কোলে নেন তার শিশুকে—মৃত্যুর পরে। ভাবা যায় কি এর চেয়ে বেশি হৃদয়বিদারক ও করুণ ঘটনা হতে পারে? একজন বাবা, যিনি জীবনের প্রথম নয় মাসে তার সন্তানকে কোলে নিতে পারেননি, শেষবারে কেবল লাশ হয়ে সেই অনুভূতি পান। এই এক মুহূর্তের কোলে নেওয়া আমাদের চোখ খুলে দেয়—রাষ্ট্র কতটা ভেঙে দিয়েছে এক পরিবারকে। এই ছোট্ট মানবিক মুহূর্তটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ববিমুখতার আঙুলে আঘাত প্রমাণ করে।

যে দেশে শোক পালনের জন্য অনুমতি লাগে, যে দেশে কান্নারও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়, সেই দেশ কি সত্যিই মানুষের রাষ্ট্র? কারাগারে থাকা মানে কি মানুষের সব মানবিক অধিকার কেড়ে নেওয়া? একজন বন্দি কি বাবা থাকতে পারেন না? স্বামী থাকতে পারেন না?

এই ঘটনার পর নানা প্রশ্ন উঠেছে। এটি আত্মহত্যা কি না, নাকি অন্য কিছু—তদন্ত হোক, সত্য বেরিয়ে আসুক। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—এই মৃত্যু কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্তের ফল নয়। এটি তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের চাপ, অবহেলা, অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভেতর দিয়ে। রাষ্ট্র যদি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের দায় চাপিয়ে নিজেকে মুক্ত করে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও এমন মৃত্যু ঘটবে।

বাংলাদেশে বিচার ছাড়াই বছরের পর বছর কারাগারে থাকা মানুষের সংখ্যা কম নয়। রাজনৈতিক মামলায় অনেক সময় মানুষ দীর্ঘদিন বন্দি থাকে। কেউ শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হয়, কিন্তু ততদিনে তার জীবন, পরিবার, ভবিষ্যৎ সব ভেঙে পড়ে। রাষ্ট্র কি কখনো সেই ক্ষতির দায় নেয়? কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়? কোনো ক্ষমা চায়? ইতিহাস বলে—না।

ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি বদলায় না। আগে যারা ক্ষমতায় ছিল, তারাও বিরোধীদের দমন করেছে। এখন যারা ক্ষমতায়, তারাও একই পথ অনুসরণ করছে। মাঝখানে সাধারণ মানুষই কেবল পিষ্ট হচ্ছে। আজ এক দলের কর্মী, কাল আরেক দলের কর্মী—কিন্তু কান্নার ভাষা এক, লাশের নীরবতা এক।

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা আমাদের দলকানা মানসিকতা। আমরা মানুষ হিসেবে নয়, পরিচয় হিসেবে বিচার করি। আজ যদি সাদ্দাম “আমাদের লোক” হতেন, প্রতিক্রিয়া হয়তো অন্যরকম হতো। এই দ্বিচারিতা আমাদের বিবেককে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি—আজ যার সঙ্গে হচ্ছে, কাল সেটি আমার সঙ্গেও হতে পারে।

এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেন ঢালাও মামলা হয়? কেন যাচাই ছাড়াই গ্রেপ্তার হয়? কেন রাজনৈতিক পরিচয় তদন্তের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে? পুলিশ ও প্রশাসন কি জনগণের সেবক, নাকি ক্ষমতার হাতিয়ার? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিলে, কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।

একটি রাষ্ট্র তখনই সভ্য হয়, যখন সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে পারে। একজন বন্দির স্ত্রী, একটি শিশু—এর চেয়ে দুর্বল অবস্থান আর কী হতে পারে? সেই জায়গায় রাষ্ট্র যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, অগ্রগতির সব গল্প অর্থহীন হয়ে যায়।

আজ সেই চিঠিটি পড়ে আমাদের থমকে যেতে হয়। “মায়ের খেয়াল রাখবি”—এই একটি বাক্যের ভেতর লুকিয়ে আছে একজন বাবার অসীম ভালোবাসা, অসহায়ত্ব আর বিশ্বাস। বিশ্বাস—হয়তো সমাজ বাঁচাবে, হয়তো রাষ্ট্র দেখবে। কিন্তু সেই বিশ্বাস ভেঙে গেছে।

আজ বাগেরহাটের সেই ঘর নিস্তব্ধ। আজ একজন বাবা জীবনের সবচেয়ে বড় শোক নিয়ে বেঁচে আছেন। এই শোক শুধু তার একার নয়—এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির ব্যর্থতার প্রতিফলন।

আমরা যদি এখনো প্রশ্ন না তুলি, যদি এখনো মানবিকতার পক্ষে না দাঁড়াই, তাহলে আগামীকাল আরও সাদ্দাম থাকবে, আরও সুবর্ণা থাকবে, আরও শিশু হারাবে।

আমাদের এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে বিচার মানে প্রতিশোধ নয়।
আমাদের এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে কারাগার মানে পরিবারের সামাজিক মৃত্যু নয়।
আমাদের এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে শোক অপরাধ নয়, কান্না দুর্বলতা নয়।

মানুষের কান্না শোনার রাষ্ট্র চাই।
মানুষের মর্যাদা ফেরত চাই।