ঢাকা ১১:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সাজু-মিজান-রানার সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি ও ভূমিদস্যুতার চক্র পেট্রোবাংলার পরিচালক রফিকুল ইসলামের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এই মহেশখালীকে একটি স্মার্ট ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তোলা হবে: ডা. শফিকুর রহমান জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে স্বাগত জানাতে কুলাউড়ায় বিশাল প্রচার মিছিল ওয়াসার রাজস্ব পরিদর্শক হারুন রানার দুদক কর্তৃক দায়মুক্তির রহস্য উন্মোচনের দাবি ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য হালাল রুজি অত্যাবশ্যক: ছারছীনার পীর ছাহেব জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজারে ৪টি আসনের প্রার্থীর ভোটের তীব্র লড়াই ঝালকাঠি আদালতে ভুয়া আইনজীবী মনজুরুল আটক যে দল কর্মজীবী নারীদের ‘বেশ্যা’ বলে, তাদের মন থেকে মুছে ফেলতে হবে”: নাসের রহমান মনোহরগঞ্জে এনসিপি নেতার উপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল 

প্রাণিসম্পদ প্রকল্পে ডিপিডি হারুনের অর্থ আত্মসাৎ

প্রাণিসম্পদ খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পে (এলডিডিপি) ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘনীভূত হচ্ছে। এই প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে মেচিংগ্রান্টের নামে অস্তিত্বহীন ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধান ও মাঠপর্যায়ের তদন্তে উঠে আসা তথ্যে দেখা যায়, প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ, বিল অনুমোদন ও ছাড়ে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়মনসিংহের ত্রিশালে কেসি এগ্রো নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে মেচিংগ্রান্ট হিসেবে সরকারি ভর্তুকি মূল্যে প্রায় ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ বাস্তবে কেসি এগ্রো প্রকল্পের আওতায় কোনো দৃশ্যমান কাজই করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঘুষ ও কমিশন হিসেবে উপ-প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ গ্রহণ করেছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের শর্ত অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের এই প্রক্রিয়ায় জাল বিল-ভাউচার, ভুয়া অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক যোগসাজশ ব্যবহৃত হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পটি দেশের ৬১টি জেলায় (পার্বত্য জেলা ব্যতীত) বাস্তবায়নের জন্য ৪২৮০ দশমিক ৩৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ পরবর্তীতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও প্রকল্পের বিভিন্ন উপাদানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট খাতে প্রশ্ন ও সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন জেলায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রংপুর সদর উপজেলায় ডেইরি ফার্মের নামে একটি মিষ্টির দোকানে অনুদান দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে, যা প্রকল্প নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। একই এলাকায় ফিড মিলের নামে যে প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়া হয়েছিল, অনুসন্ধানে তার কোনো বাস্তব অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রায় ৫ কোটি টাকার অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে বলে জানা গেলেও আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার এই সংস্কৃতি দুর্নীতিকে আরও উৎসাহিত করছে। প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎকারী কর্মকর্তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে। একাধিক সূত্র দাবি করেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেতরে দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।

প্রকল্পের মেচিংগ্রান্ট নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তত ৬০ শতাংশ অর্থ নিজস্ব উৎস থেকে বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু রংপুর সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ সুবিধাভোগী এই শর্ত পূরণ না করেই ভুয়া কাগজপত্র ও জাল বিল-ভাউচার তৈরি করে অনুদানের টাকা উত্তোলন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে মোশারফ হোসেন যোগদানের পর অনুদানের আবেদন ‘ব্যাকডেট’ করে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ করেন। পরে পূর্বে তদন্তে বাতিল হওয়া আবেদনগুলো প্রধান কার্যালয়ের উপ-প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের সহযোগিতায় পুনরুজ্জীবিত করা হয় এবং উৎকোচের বিনিময়ে অনুদান ছাড়ের সুপারিশ করা হয়।

সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেসি এগ্রোর নামে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার বিপরীতে মাঠপর্যায়ে কোনো কার্যক্রমের আলামত পাওয়া যায়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অর্থ ছাড় হলেও বাস্তবে অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি বা উৎপাদন কার্যক্রমের কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবুও নিয়মিতভাবে বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ ২০২২ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু গ্যালারি উদ্বোধন করেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে সামনে রেখে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করেছেন তিনি।

শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের পেশাজীবী সংগঠন বাংলাদেশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান মোল্লার সহধর্মিণী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা জুয়েনার তত্ত্বাবধানে তিনি এই ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক সখ্যতা গড়ে তুলে তিনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, ৫ আগস্টের পর প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পে উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের ক্ষমতা ও প্রভাব বহুগুণে বেড়ে যায়। চাকরি জীবনের শুরুতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও সময়ের পরিবর্তনে তিনি ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে নিজেকে মানিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই রাজনৈতিক রূপান্তরের পেছনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিএনপি-পন্থী দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তার সমর্থন কাজ করেছে বলে খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, মেচিংগ্রান্টের নামে ভুয়া অর্থ উত্তোলন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কাগুজে অগ্রগতি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের মূল কর্ণধার হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন জেলায় অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকলেও বিল ছাড়ের ঘটনা এর প্রমাণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সব অভিযোগের বিষয়ে ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলোকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য, “যার মনে যা চাই, তাই লিখছে। চুক্তি অনুযায়ী কেসি এগ্রো যতটুকু কাজ করেছে, ততটুকু বিলই প্রদান করা হয়েছে।” তিনি দাবি করেন, প্রকল্পের সব কার্যক্রম নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে এবং কোনো অনিয়ম হলে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হওয়া উচিত।

প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মোস্তফা কামাল এ বিষয়ে বলেন, “অনিয়ম হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে বাস্তবতা হলো, এর আগেও তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে এই আশ্বাসের কার্যকারিতা নিয়ে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও খাতবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রাণিসম্পদ খাতে সাম্প্রতিক সময়ে যে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য উঠে আসছে, তা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং নীতিমালার সঠিক প্রয়োগের অভাবকেই স্পষ্ট করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ না করেই কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা সামনে আসছে, যা খাতটির উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের মতো বৃহৎ প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর আস্থা নষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত কৃষক ও উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হবেন, যার প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর।

সব মিলিয়ে ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদকে কেন্দ্র করে ওঠা এই অভিযোগগুলো এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই উন্মোচন করছে। অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সাজু-মিজান-রানার সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি ও ভূমিদস্যুতার চক্র

প্রাণিসম্পদ প্রকল্পে ডিপিডি হারুনের অর্থ আত্মসাৎ

আপডেট সময় ১২:২৪:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

প্রাণিসম্পদ খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পে (এলডিডিপি) ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘনীভূত হচ্ছে। এই প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে মেচিংগ্রান্টের নামে অস্তিত্বহীন ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধান ও মাঠপর্যায়ের তদন্তে উঠে আসা তথ্যে দেখা যায়, প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ, বিল অনুমোদন ও ছাড়ে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়মনসিংহের ত্রিশালে কেসি এগ্রো নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে মেচিংগ্রান্ট হিসেবে সরকারি ভর্তুকি মূল্যে প্রায় ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ বাস্তবে কেসি এগ্রো প্রকল্পের আওতায় কোনো দৃশ্যমান কাজই করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঘুষ ও কমিশন হিসেবে উপ-প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ গ্রহণ করেছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের শর্ত অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের এই প্রক্রিয়ায় জাল বিল-ভাউচার, ভুয়া অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক যোগসাজশ ব্যবহৃত হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পটি দেশের ৬১টি জেলায় (পার্বত্য জেলা ব্যতীত) বাস্তবায়নের জন্য ৪২৮০ দশমিক ৩৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ পরবর্তীতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও প্রকল্পের বিভিন্ন উপাদানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট খাতে প্রশ্ন ও সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন জেলায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রংপুর সদর উপজেলায় ডেইরি ফার্মের নামে একটি মিষ্টির দোকানে অনুদান দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে, যা প্রকল্প নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। একই এলাকায় ফিড মিলের নামে যে প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়া হয়েছিল, অনুসন্ধানে তার কোনো বাস্তব অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রায় ৫ কোটি টাকার অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে বলে জানা গেলেও আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার এই সংস্কৃতি দুর্নীতিকে আরও উৎসাহিত করছে। প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎকারী কর্মকর্তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে। একাধিক সূত্র দাবি করেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেতরে দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।

প্রকল্পের মেচিংগ্রান্ট নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তত ৬০ শতাংশ অর্থ নিজস্ব উৎস থেকে বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু রংপুর সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ সুবিধাভোগী এই শর্ত পূরণ না করেই ভুয়া কাগজপত্র ও জাল বিল-ভাউচার তৈরি করে অনুদানের টাকা উত্তোলন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে মোশারফ হোসেন যোগদানের পর অনুদানের আবেদন ‘ব্যাকডেট’ করে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ করেন। পরে পূর্বে তদন্তে বাতিল হওয়া আবেদনগুলো প্রধান কার্যালয়ের উপ-প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের সহযোগিতায় পুনরুজ্জীবিত করা হয় এবং উৎকোচের বিনিময়ে অনুদান ছাড়ের সুপারিশ করা হয়।

সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেসি এগ্রোর নামে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার বিপরীতে মাঠপর্যায়ে কোনো কার্যক্রমের আলামত পাওয়া যায়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অর্থ ছাড় হলেও বাস্তবে অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি বা উৎপাদন কার্যক্রমের কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবুও নিয়মিতভাবে বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ ২০২২ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু গ্যালারি উদ্বোধন করেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে সামনে রেখে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করেছেন তিনি।

শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের পেশাজীবী সংগঠন বাংলাদেশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান মোল্লার সহধর্মিণী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা জুয়েনার তত্ত্বাবধানে তিনি এই ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক সখ্যতা গড়ে তুলে তিনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, ৫ আগস্টের পর প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পে উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের ক্ষমতা ও প্রভাব বহুগুণে বেড়ে যায়। চাকরি জীবনের শুরুতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও সময়ের পরিবর্তনে তিনি ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে নিজেকে মানিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই রাজনৈতিক রূপান্তরের পেছনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিএনপি-পন্থী দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তার সমর্থন কাজ করেছে বলে খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, মেচিংগ্রান্টের নামে ভুয়া অর্থ উত্তোলন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কাগুজে অগ্রগতি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের মূল কর্ণধার হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন জেলায় অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকলেও বিল ছাড়ের ঘটনা এর প্রমাণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সব অভিযোগের বিষয়ে ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলোকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য, “যার মনে যা চাই, তাই লিখছে। চুক্তি অনুযায়ী কেসি এগ্রো যতটুকু কাজ করেছে, ততটুকু বিলই প্রদান করা হয়েছে।” তিনি দাবি করেন, প্রকল্পের সব কার্যক্রম নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে এবং কোনো অনিয়ম হলে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হওয়া উচিত।

প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মোস্তফা কামাল এ বিষয়ে বলেন, “অনিয়ম হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে বাস্তবতা হলো, এর আগেও তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে এই আশ্বাসের কার্যকারিতা নিয়ে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও খাতবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রাণিসম্পদ খাতে সাম্প্রতিক সময়ে যে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য উঠে আসছে, তা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং নীতিমালার সঠিক প্রয়োগের অভাবকেই স্পষ্ট করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ না করেই কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা সামনে আসছে, যা খাতটির উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের মতো বৃহৎ প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর আস্থা নষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত কৃষক ও উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হবেন, যার প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর।

সব মিলিয়ে ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদকে কেন্দ্র করে ওঠা এই অভিযোগগুলো এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই উন্মোচন করছে। অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।