ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর সিদ্ধিগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুর রহমানকে কেন্দ্র করে ঘুষ, অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশ্নবিদ্ধ পদায়নের অভিযোগে সংস্থাটির ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সিদ্ধিগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারে বসতে তিনি ১৫ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শুধু তাই নয়, বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেতে প্রায় দুই কোটি টাকা লেনদেনের চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে, যা ডিপিডিসির প্রশাসনিক পরিবেশে তীব্র অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।
ডিপিডিসির একাধিক কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর ভাষ্য অনুযায়ী, মো. মাসুদুর রহমানের চাকরি জীবন শুরু থেকেই বিতর্কে ঘেরা। ডিপিডিসিতে যোগদানের পর থেকে তার প্রায় প্রতিটি বদলি ও পদায়ন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতাকে পাশ কাটিয়ে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব পেয়েছেন রাজনৈতিক পরিচয় এবং প্রভাব খাটিয়ে। বিশেষ করে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নজরুল হামিদ বিপুর আশীর্বাদে তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ১৩২/৩৩ কেভি সাব-স্টেশন অ্যান্ড লাইন উন্নয়ন-১ প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, একটি প্রকল্পে এত দীর্ঘ সময় একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালন করার নজির বিরল হলেও মো. মাসুদুর রহমান ব্যতিক্রম ছিলেন।
ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে বলা হয়, ওই প্রকল্পে দীর্ঘদিন বহাল থাকার পেছনে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক এমডি বিকাশ দেওয়ান ও সাবেক এমডি আব্দুল্লাহ নোমানের সময়েও তিনি একই পদে বহাল ছিলেন। এই দীর্ঘ সময় ধরে একই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করায় প্রকল্পের স্বচ্ছতা, ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ডিপিডিসির অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, এই দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানই তাকে সংস্থার ভেতরে প্রভাবশালী করে তোলে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বদলি ও পদায়নে সুবিধা আদায়ে সহায়ক হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মো. মাসুদুর রহমানকে নিয়ে বিতর্ক নতুন করে মাথাচাড়া দেয়। মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে তাকে দুইবার বদলি করা হয়। প্রথমে ৮ জানুয়ারি তাকে উন্নয়ন-১ দপ্তর থেকে ডিপিডিসির স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপন প্রকল্পে বদলি করা হয়। এই বদলিকে অনেকেই স্বাভাবিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলেও এর মাত্র ছয় দিন পর, ১৪ জানুয়ারি, আরেকটি অফিস আদেশে তাকে সিদ্ধিগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই দ্বিতীয় বদলির পেছনে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে এবং সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক বি এম মিজানুল হাসানকে ‘ম্যানেজ’ করেই তিনি নিজের পছন্দের কর্মস্থল সিদ্ধিগঞ্জ ডিভিশনে দায়িত্ব নেন।
ডিপিডিসির ভেতরের একাধিক প্রকৌশলী অভিযোগ করে বলেন, সিদ্ধিগঞ্জ ডিভিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে দায়িত্ব পেলে বিভিন্ন প্রকল্প, সংযোগ, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকে—এমন ধারণা সংস্থার ভেতরে প্রচলিত। এ কারণে সিদ্ধিগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারটি দীর্ঘদিন ধরেই ‘আকর্ষণীয়’ হিসেবে পরিচিত। অভিযোগকারীদের মতে, এই চেয়ার দখলে নিতে মো. মাসুদুর রহমান অর্থ লেনদেনের পথ বেছে নিয়েছেন।
ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বর্তমানে এসব অভিযোগে উত্তপ্ত। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে যদি পদায়ন ও পদোন্নতি হয়, তাহলে তা পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকেই দুর্বল করে দেয়। এতে মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন এবং সংস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অনেকেই মনে করছেন, মো. মাসুদুর রহমানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো যদি সঠিকভাবে তদন্ত না করা হয়, তাহলে ডিপিডিসিতে দীর্ঘমেয়াদে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। অভিযোগকারীরা দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, সিদ্ধিগঞ্জ ডিভিশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর মো. মাসুদুর রহমান এখন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির জন্য তৎপর হয়েছেন। এই পদোন্নতির জন্য প্রায় দুই কোটি টাকার একটি ‘চুক্তি’ হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ডিপিডিসির কয়েকজন প্রকৌশলী বলেন, এ ধরনের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দুর্নীতির বিষয় নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে দায়িত্ব পাওয়ার অভিযোগও মো. মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের। অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে একাধিকবার তিনি তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। এতে সংস্থার ভেতরে অসন্তোষ ও বিভাজন তৈরি হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, এই ধরনের অনিয়ম ডিপিডিসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও মো. মাসুদুর রহমান সিদ্ধিগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারে বহাল থাকায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর অনেক জায়গায় রদবদল হলেও তিনি ওই পদে বহাল ছিলেন বলে অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তার প্রভাব ও যোগাযোগ এখনো কার্যকর রয়েছে।
এ বিষয়ে মো. মাসুদুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে জানা গেছে। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে সরাসরি তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বি এম মিজানুল হাসানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমি ঘুষ খেয়েছি ভালো করেছি। জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করেন। এর চেয়ে আমি আর কিছু বলতে পারবো না।” তার এই বক্তব্য নিয়েও ডিপিডিসির ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে যদি রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করা হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি, নইলে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে।
ডিপিডিসির একাংশ কর্মকর্তা মনে করছেন, মো. মাসুদুর রহমানকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, দুদকের তদন্তই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের একমাত্র পথ। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট হবে। আর যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুর রহমানকে ঘিরে ওঠা ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ডিপিডিসির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একটি রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থায় এ ধরনের অভিযোগ শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করছে। এখন দেখার বিষয়, দুদকের তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপে এই অভিযোগগুলোর কী পরিণতি হয় এবং ডিপিডিসিতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা কতটা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















