পবিত্র রমজান কেবল একটি মাসের নাম নয়, এটি এক আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের আহ্বান। এটি আত্মশুদ্ধির মহাসময়, তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণক্ষেত্র এবং আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছার সুবর্ণ সুযোগ। মানবজীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা প্রায়ই নিজেদের হারিয়ে ফেলি দুনিয়াবি চাহিদার অগণিত স্রোতে। রমজান আসে আমাদের থামিয়ে দিতে, নিজেকে ফিরে পেতে, অন্তরের আয়নাকে মুছে দিতে।
রমজানকে গ্রহণ করতে হলে প্রথমেই দরকার মানসিক প্রস্তুতি। রোজা শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়, এটি আত্মনিয়ন্ত্রণের এক গভীর সাধনা। চোখকে পাপ থেকে ফিরিয়ে রাখা, জিহ্বাকে মিথ্যা ও কটুবাক্য থেকে সংযত করা, অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত রাখা এসবই রোজার প্রকৃত চেতনা। যদি আমাদের রোজা কেবল খাদ্য থেকে বিরত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না।

রমজান আমাদের কুরআনের দিকে ফিরে যেতে আহ্বান জানায়। যে মাসে নাজিল হয়েছে আল-কুরআন, সে মাসে কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপনই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে তিলাওয়াত, তাফসির অধ্যয়ন এবং জীবনে তার বাস্তব প্রয়োগ এগুলো রমজানের প্রকৃত গ্রহণ। কারণ কুরআন শুধু পাঠের জন্য নয়, এটি জীবন পরিচালনার দিশারি।
ইবাদতের ক্ষেত্রেও আমাদের হওয়া উচিত সচেতন। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পাশাপাশি তারাবি, তাহাজ্জুদ, নফল নামাজ ও বেশি বেশি দোয়া এসবের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। বিশেষত শেষ দশকে ইতিকাফ, লাইলাতুল কদরের সন্ধান এবং আন্তরিক তাওবা আমাদের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। এই রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, তাই এ সময়টুকু অবহেলা করা আমাদের জন্য চরম বঞ্চনা।

রমজান আমাদের সামাজিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। সমাজের অভাবী মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন, যাকাত ও সদকার মাধ্যমে সম্পদের পবিত্রতা অর্জন এবং ইফতারের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এসবই রমজানের সৌন্দর্য। একটি খেজুর ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও যে অগণিত সওয়াব নিহিত, তা আমাদের হৃদয়কে উদার হতে শেখায়।
এই মাসে আমাদের উচিত আত্মসমালোচনা করা। গত বছরের ভুলত্রুটি, পাপ ও অবহেলার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং ভবিষ্যতের জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার করা। রমজান হলো পরিবর্তনের মাস—অভ্যাস পরিবর্তনের, চরিত্র গঠনের, জীবনকে শুদ্ধ পথে পরিচালিত করার। যদি রমজান আমাদের জীবনযাত্রায় স্থায়ী পরিবর্তন আনতে না পারে, তবে আমরা এই মহিমান্বিত মাসের প্রকৃত ফজিলত থেকে বঞ্চিত হব।
পরিশেষে, রমজানকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে। এটিকে কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং আত্মিক পুনর্জন্মের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। আমরা যেন রমজান শেষে আগের সেই মানুষটি না থাকি বরং আরও পরিশুদ্ধ, আরও সচেতন ও আরও মানবিক হয়ে উঠি এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে পবিত্র রমজানের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করার এবং তার আলোয় জীবন আলোকিত করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)
লেখক জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান 
























