ঢাকা ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর মহা দুর্নীতিবাজ, টিপু মুন্সির ভায়রা আবু নাসের চৌধুরীর ঢাকায় পোষ্টিং শিক্ষা প্রকৌশলী আলেক হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পিলার ও কয়েন চক্রের মূলহোতা ফরিদপুরের আওয়ামী নেতা আব্দুস সোবহান মিথ্যা বলাৎকারের মামলায় পাঁচ মাস ধরে কারাবন্দি শ্রমজীবী মোতালেব হোসেন দুর্নীতির অভিযোগ ঝুলে থাকতেই এলজিইডির শীর্ষ পদে বেলাল হোসেন শহীদুল্লাহ সিন্ডিকেটের ৩৮৭ কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্য আমিনবাজার ভূমি অফিসে ঘুষের আখড়া নাজির-ক্যাশিয়ার সাজেদুল ও সহযোগীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ ভবভদী আদর্শ যুব সংঘ’-এর উদ্যোগে অসহায়দের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ ভোলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
ডিপিডিসির মাতুয়াইলে গ্রাহক জিম্মি

অবৈধ সংযোগ ও ঘুষ বাণিজ্যের নেপথ্যে লাইনম্যান ফিরোজ

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর মাতুয়াইল ডিভিশন দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহক হয়রানি, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, বিল জালিয়াতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচিত। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পরিবর্তন ও সংস্কারের আলোচনা চললেও এই ডিভিশনে কার্যত কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক ও সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব অনিয়মের কেন্দ্রে রয়েছেন মাতুয়াইল ডিভিশনে কর্মরত লাইনম্যান মো. ফিরোজ শেখ (আইডি নম্বর ২১২৮৩)। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি শুধু গ্রাহকদের জিম্মি করেই ক্ষান্ত হননি, বরং একটি সুসংগঠিত দালালচক্র ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিপুল রাজস্ব ক্ষতির পথ তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় গ্রাহকদের অভিযোগ অনুযায়ী, মাতুয়াইল ডিভিশনের আওতাধীন এলাকায় নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, লোড বৃদ্ধি, মিটার সেটিং, বিল সংশোধন কিংবা সাধারণ অভিযোগ নিষ্পত্তি—ডিপিডিসির নিয়ম অনুযায়ী যেসব সেবা নির্ধারিত সময় ও নির্দিষ্ট ফিতে সম্পন্ন হওয়ার কথা, বাস্তবে সেগুলোর কোনোটিই টাকা ছাড়া হয় না। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফিরোজ শেখের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দালালের মাধ্যমে প্রতিটি সেবার জন্য নির্ধারিত ‘রেট’ আদায় করা হয়। গ্রাহকরা এই রেট দিতে রাজি না হলে তাদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয় কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে নানা জটিলতা সৃষ্টি করা হয়।

একাধিক ভুক্তভোগী গ্রাহক জানান, বৈধ কাগজপত্র ও সব শর্ত পূরণ করার পরও তাদের সংযোগ দেওয়া হয়নি। কখনো বলা হয়েছে ট্রান্সফরমার নেই, কখনো বলা হয়েছে লোড অনুমোদন হয়নি, আবার কখনো নতুন করে নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরে দালালের মাধ্যমে জানানো হয়, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে সব সমস্যা ‘ম্যানেজ’ হয়ে যাবে। অনেক গ্রাহক বাধ্য হয়ে টাকা দিতে রাজি না হলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, মামলা ও জরিমানার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নামে নাটক করে আবার সেই সংযোগ পুনরায় চালু করার অভিযোগও রয়েছে ফিরোজ শেখের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথমে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই দালালচক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে সেই সংযোগ পুনরায় চালু করা হতো। শুধু তাই নয়, অবৈধ সংযোগধারীদের বিদ্যুৎ বিল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়ার ঘটনাও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এতে ডিপিডিসি ও জাতীয় রাজস্বের বিপুল ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যেসব গ্রাহক এই প্রস্তাবে রাজি হননি, তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক গ্রাহকের ওপর হঠাৎ করে দুই থেকে তিন গুণ বেশি বিল চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিল নিয়ে আপত্তি জানাতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা, জরিমানা কিংবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ভয় দেখানো হয়েছে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে গ্রাহকদের একটি অংশ দালালের মাধ্যমে ফিরোজ শেখের কাছে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

উচ্চ লোডের এস.টি সংযোগের ক্ষেত্রেও ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ডিপিডিসির বিধিমালা অনুযায়ী যেখানে উচ্চ লোডের এস.টি সংযোগ নিতে আনুমানিক ৪ লাখ টাকা ব্যয় হওয়ার কথা, সেখানে গ্রাহকদের কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই অতিরিক্ত অর্থের একটি বড় অংশ ফিরোজ শেখের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এই চক্রটি অদৃশ্য সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে থেকে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

মাতুয়াইল ডিভিশনের নূর উর জামান নামের এক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ট্রান্সফরমার ভাড়ার নিয়ম ভেঙে ভাড়া মওকুফ করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগও উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এ ঘটনায় বিষয়টি প্রকাশ পেতে শুরু করলে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার তালুকদারকে ম্যানেজ করেই পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। এতে করে শুধু অনিয়মই বৈধতা পায়নি, বরং অন্য কর্মকর্তাদের জন্যও একটি খারাপ উদাহরণ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছ থেকে সোলার প্যানেল কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ফিরোজ শেখের মনোনীত ব্যক্তিদের কাছ থেকেই এসব সোলার প্যানেল কিনতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পরও সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়নি। আবার কোথাও নিম্নমানের সোলার বসানো হয়েছে, যা ডিপিডিসির নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে না।

ডিপিডিসির ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই ডিভিশনে কোনো কাজই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ইশারা ছাড়া হয় না। তাদের ভাষায়, লাইন সংযোগ, মিটার সেটিং, বিল সংশোধন কিংবা অভিযোগ নিষ্পত্তি—সব কিছুই চলে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের নির্দেশে। ফিরোজ শেখ এই সিন্ডিকেটের মাঠপর্যায়ের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ফিরোজ শেখের নামে অটো রিকশা ও হালকা যানবাহনের মালিকানার তথ্য রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এগুলো মূলত ঘুষের অর্থ ঘোরানোর একটি মাধ্যম। প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ লেনদেন হয়, তা সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় না এনে এসব যানবাহনের ব্যবসার আড়ালে বৈধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. ফিরোজ শেখের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। একইভাবে ডিপিডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার তালুকদারকে ফোন করা হলেও তিনিও কল রিসিভ করেননি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের ক্ষেত্রে সাধারণ শাস্তি কার্যকর হয় না। তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে এই ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত, এখানে দুর্নীতি হলে সরাসরি জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাতুয়াইল ডিভিশনের এই অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে সাধারণ গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ বলছেন, অভিযোগ করলে আরও বিপদ বাড়বে। ফলে এক ধরনের নীরব আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, লাইনম্যান পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা কীভাবে বছরের পর বছর এত বড় পরিসরে অনিয়ম চালিয়ে যেতে পারেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এর পেছনে নিশ্চয়ই শক্তিশালী একটি চক্র কাজ করছে, যারা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এই দুর্নীতিকে টিকিয়ে রেখেছে।

ডিপিডিসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ শুধু সংস্থার ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। বিদ্যুৎ সংযোগের মতো মৌলিক সেবা পেতে যদি গ্রাহকদের ঘুষ দিতে হয়, তাহলে তা সুশাসনের চরম ব্যর্থতারই প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মাতুয়াইল ডিভিশনের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। একই সঙ্গে তারা এই চক্রের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

প্রিয় পাঠক, অনুসন্ধান এখানেই শেষ নয়। আগামী পর্বে থাকছে গ্রাহকের টাকা হরিলুটের নেপথ্যের আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য, দালালচক্রের বিস্তার এবং এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী মহলের নাম।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ

ডিপিডিসির মাতুয়াইলে গ্রাহক জিম্মি

অবৈধ সংযোগ ও ঘুষ বাণিজ্যের নেপথ্যে লাইনম্যান ফিরোজ

আপডেট সময় ১২:২৭:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর মাতুয়াইল ডিভিশন দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহক হয়রানি, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, বিল জালিয়াতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচিত। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পরিবর্তন ও সংস্কারের আলোচনা চললেও এই ডিভিশনে কার্যত কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক ও সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব অনিয়মের কেন্দ্রে রয়েছেন মাতুয়াইল ডিভিশনে কর্মরত লাইনম্যান মো. ফিরোজ শেখ (আইডি নম্বর ২১২৮৩)। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি শুধু গ্রাহকদের জিম্মি করেই ক্ষান্ত হননি, বরং একটি সুসংগঠিত দালালচক্র ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিপুল রাজস্ব ক্ষতির পথ তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় গ্রাহকদের অভিযোগ অনুযায়ী, মাতুয়াইল ডিভিশনের আওতাধীন এলাকায় নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, লোড বৃদ্ধি, মিটার সেটিং, বিল সংশোধন কিংবা সাধারণ অভিযোগ নিষ্পত্তি—ডিপিডিসির নিয়ম অনুযায়ী যেসব সেবা নির্ধারিত সময় ও নির্দিষ্ট ফিতে সম্পন্ন হওয়ার কথা, বাস্তবে সেগুলোর কোনোটিই টাকা ছাড়া হয় না। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফিরোজ শেখের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দালালের মাধ্যমে প্রতিটি সেবার জন্য নির্ধারিত ‘রেট’ আদায় করা হয়। গ্রাহকরা এই রেট দিতে রাজি না হলে তাদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয় কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে নানা জটিলতা সৃষ্টি করা হয়।

একাধিক ভুক্তভোগী গ্রাহক জানান, বৈধ কাগজপত্র ও সব শর্ত পূরণ করার পরও তাদের সংযোগ দেওয়া হয়নি। কখনো বলা হয়েছে ট্রান্সফরমার নেই, কখনো বলা হয়েছে লোড অনুমোদন হয়নি, আবার কখনো নতুন করে নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরে দালালের মাধ্যমে জানানো হয়, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে সব সমস্যা ‘ম্যানেজ’ হয়ে যাবে। অনেক গ্রাহক বাধ্য হয়ে টাকা দিতে রাজি না হলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, মামলা ও জরিমানার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নামে নাটক করে আবার সেই সংযোগ পুনরায় চালু করার অভিযোগও রয়েছে ফিরোজ শেখের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথমে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই দালালচক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে সেই সংযোগ পুনরায় চালু করা হতো। শুধু তাই নয়, অবৈধ সংযোগধারীদের বিদ্যুৎ বিল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়ার ঘটনাও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এতে ডিপিডিসি ও জাতীয় রাজস্বের বিপুল ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যেসব গ্রাহক এই প্রস্তাবে রাজি হননি, তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক গ্রাহকের ওপর হঠাৎ করে দুই থেকে তিন গুণ বেশি বিল চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিল নিয়ে আপত্তি জানাতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা, জরিমানা কিংবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ভয় দেখানো হয়েছে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে গ্রাহকদের একটি অংশ দালালের মাধ্যমে ফিরোজ শেখের কাছে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

উচ্চ লোডের এস.টি সংযোগের ক্ষেত্রেও ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ডিপিডিসির বিধিমালা অনুযায়ী যেখানে উচ্চ লোডের এস.টি সংযোগ নিতে আনুমানিক ৪ লাখ টাকা ব্যয় হওয়ার কথা, সেখানে গ্রাহকদের কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই অতিরিক্ত অর্থের একটি বড় অংশ ফিরোজ শেখের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এই চক্রটি অদৃশ্য সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে থেকে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

মাতুয়াইল ডিভিশনের নূর উর জামান নামের এক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ট্রান্সফরমার ভাড়ার নিয়ম ভেঙে ভাড়া মওকুফ করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগও উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এ ঘটনায় বিষয়টি প্রকাশ পেতে শুরু করলে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার তালুকদারকে ম্যানেজ করেই পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। এতে করে শুধু অনিয়মই বৈধতা পায়নি, বরং অন্য কর্মকর্তাদের জন্যও একটি খারাপ উদাহরণ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছ থেকে সোলার প্যানেল কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ফিরোজ শেখের মনোনীত ব্যক্তিদের কাছ থেকেই এসব সোলার প্যানেল কিনতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পরও সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়নি। আবার কোথাও নিম্নমানের সোলার বসানো হয়েছে, যা ডিপিডিসির নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে না।

ডিপিডিসির ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই ডিভিশনে কোনো কাজই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ইশারা ছাড়া হয় না। তাদের ভাষায়, লাইন সংযোগ, মিটার সেটিং, বিল সংশোধন কিংবা অভিযোগ নিষ্পত্তি—সব কিছুই চলে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের নির্দেশে। ফিরোজ শেখ এই সিন্ডিকেটের মাঠপর্যায়ের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ফিরোজ শেখের নামে অটো রিকশা ও হালকা যানবাহনের মালিকানার তথ্য রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এগুলো মূলত ঘুষের অর্থ ঘোরানোর একটি মাধ্যম। প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ লেনদেন হয়, তা সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় না এনে এসব যানবাহনের ব্যবসার আড়ালে বৈধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. ফিরোজ শেখের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। একইভাবে ডিপিডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার তালুকদারকে ফোন করা হলেও তিনিও কল রিসিভ করেননি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের ক্ষেত্রে সাধারণ শাস্তি কার্যকর হয় না। তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে এই ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত, এখানে দুর্নীতি হলে সরাসরি জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাতুয়াইল ডিভিশনের এই অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে সাধারণ গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ বলছেন, অভিযোগ করলে আরও বিপদ বাড়বে। ফলে এক ধরনের নীরব আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, লাইনম্যান পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা কীভাবে বছরের পর বছর এত বড় পরিসরে অনিয়ম চালিয়ে যেতে পারেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এর পেছনে নিশ্চয়ই শক্তিশালী একটি চক্র কাজ করছে, যারা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এই দুর্নীতিকে টিকিয়ে রেখেছে।

ডিপিডিসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ শুধু সংস্থার ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। বিদ্যুৎ সংযোগের মতো মৌলিক সেবা পেতে যদি গ্রাহকদের ঘুষ দিতে হয়, তাহলে তা সুশাসনের চরম ব্যর্থতারই প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মাতুয়াইল ডিভিশনের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। একই সঙ্গে তারা এই চক্রের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

প্রিয় পাঠক, অনুসন্ধান এখানেই শেষ নয়। আগামী পর্বে থাকছে গ্রাহকের টাকা হরিলুটের নেপথ্যের আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য, দালালচক্রের বিস্তার এবং এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী মহলের নাম।