দেশের অন্যতম সেবামূলক সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সাধারণ মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সংস্থার সহকারী পরিচালক (লাইসেন্স) পদে থাকা জিয়াউর রহমান নামের এক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে অসংখ্য অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
সূত্রে জানা গেছে, জিয়াউর রহমানের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল মিরপুরের বিআরটিএতে একজন সাধারণ মেকানিক হিসেবে। এরপর চাতুর্য এবং সুপারিশের মাধ্যমে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে ইন্সপেক্টর হন। নরসিংদীতে পোস্টিং পাওয়ার পর তিনি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেন। সেখান থেকেই মিরপুরে সহকারী পরিচালক (এডি) হিসেবে পদোন্নতি পান।
একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, জিয়াউর রহমানের পদোন্নতি এবং মিরপুরে নিয়োগের পেছনে সরাসরি প্রভাবশালী সাবেক শিল্প ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সুপারিশ কাজ করেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, “তৎকালীন সময়ে মিরপুরে একজন এডি থাকা সত্ত্বেও জিয়াকে সেখানে পদায়ন করা হয়। এরপর থেকে তিনি নিজের ক্ষমতা দাপটের সঙ্গে ব্যবহার শুরু করেন।”
বিআরটিএর সাধারণ বেতনভুক্ত কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে তুলনা করলে জিয়াউর রহমানের জীবনযাত্রা অত্যন্ত অভিজাত মনে হয়। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এফ ব্লকের ৯ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর সড়কের ৪১৩ নম্বর বাড়িতে তার রাজকীয় বসবাস। শুধু ঢাকাতেই নয়, গ্রামে তার বাড়িতে এবং নামে-বেনামে অসংখ্য ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে।
দর্শনীয় বিষয় হলো, জিয়াউর রহমান সার্বক্ষণিক একটি ব্যক্তিগত গাড়ি (ঢাকা মেট্রো গ ১৬-১৪১৭) ব্যবহার করেন। স্থানীয়রা এবং সাধারণ মানুষ তার গাড়ি ও অন্যান্য সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। জানা গেছে, বিআরটিএর লাইসেন্স বাণিজ্য এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে তিনি এই বিশাল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন।
একাধিক সূত্র বলছে, “তিনি শুধু নিজের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পদোন্নতি পাননি, বরং বর্তমান সরকারের কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে তার চেয়ারও ধরে রেখেছেন। ফলে দুর্নীতি এবং অনিয়মে তার প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।”
জিয়াউর রহমানের অবস্থান এবং ক্ষমতার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “সরকারি সংস্থাগুলিতে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সংযোগ থাকলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। এটি সংস্থার স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতা হ্রাস করে।”
বিআরটিএর সাধারণ মানুষের অভিযোগ হলো, লাইসেন্স বাণিজ্য, অনিয়ম এবং দুর্নীতির কারণে সাধারণ নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এমনকি শিক্ষিত ও সচেতন মানুষও এডি জিয়াউর রহমানের দাপটের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছেন না।
তবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রশাসনকে বিষয়টি নজরে আনার জন্য সাধারণ মানুষ সোচ্চার। তারা দাবি করছেন, “মেকানিক জিয়ার অবৈধ সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা হোক এবং প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
বিআরটিএর ভেতরের কিছু সূত্র জানাচ্ছে, জিয়াউর রহমান শুধুমাত্র লাইসেন্স বাণিজ্যের মাধ্যমে নয়, বরং অন্যান্য সরকারি কাজেও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছেন। তার দীর্ঘ মেয়াদি অবস্থান এবং অসংখ্য সম্পদ বিষয়টি আরও জটিল করে তুলেছে।
অভ্যন্তরীণ একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের অবৈধ সম্পদ ও প্রভাবের মাত্রা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “যদি প্রশাসন এবং দুদক যথাযথ তদন্ত শুরু করে, তবে সম্ভবত এই ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের একটি বড় চক্রের খোঁজ পাওয়া যাবে।”
মিরপুর এবং খিলক্ষেত এলাকায় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, জিয়াউর রহমানের নামের সঙ্গে লাইসেন্স বাণিজ্য, গাড়ি নিবন্ধন এবং বিভিন্ন সরকারি কাজের অনিয়ম যুক্ত। স্থানীয়রা বলছেন, “তার ক্ষমতা এত বেশি যে, সাধারণ মানুষ অভিযোগ করলেও কোনো প্রভাব পড়ছে না। বরং তার ধাপ্পা বেড়েছে।”
অভিযোগ আছে, বর্তমান সরকারের অন্তর্বর্তী সময়েও তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এমনকি ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরও অন্যান্য দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আত্মগোপনে গেলেও জিয়াউর রহমানকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, জিয়াউর রহমানের পদোন্নতি, দীর্ঘ মেয়াদি অবস্থান এবং সম্পদের উৎস নিয়ে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে, তিনি যেভাবে লাইসেন্স বাণিজ্যের মাধ্যমে অসংখ্য সম্পদ অর্জন করেছেন তা জনমনের আস্থা ক্ষুণ্ণ করেছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, “জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা এবং প্রভাবের কারণে অনেকেই তার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। তবে আমাদের আশা, প্রশাসন এবং দুদক যদি শক্ত হাতে কাজ শুরু করে, তবে সত্য বেরিয়ে আসবে।”
অন্যদিকে, স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “বিআরটিএর মতো সেবামূলক সংস্থায় এই ধরনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার টিকে থাকা শুধু সংস্থার স্বচ্ছতা নয়, পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতার পরিচয় দেয়। এই ধরনের ঘটনায় জনমনে সরকারের প্রতি আস্থা কমে যায়।”
জনমতের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ এবং গাড়িচালকরা জানিয়েছেন, তারা লাইসেন্স নেওয়া বা গাড়ি নিবন্ধনের সময় বিভিন্ন অনিয়মের মুখোমুখি হন। এক অংশ দাবি করেছেন, “যদি জিয়াউর রহমানের মতো কর্মকর্তারা দায়িত্বে না থাকেন, তবে অনেক বিষয় স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হতে পারত।”
দুদক এবং প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে বলা হচ্ছে, “যে কোনো সরকারি কর্মকর্তা, যিনি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান এবং অসংখ্য সম্পদ অর্জন করেছেন, তার অবৈধ সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা আমাদের দায়িত্ব। জনগণ যদি দেখেন যে দুর্নীতি দমন করা হচ্ছে, তবে সরকারের প্রতি আস্থা ফিরে আসে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জিয়াউর রহমানের ঘটনা শুধু ব্যক্তির দুর্নীতির উদাহরণ নয়, বরং সরকারি সংস্থার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং নজরদারির দুর্বলতার একটি প্রতীক। এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে সরকারি সংস্থাগুলিতে স্বচ্ছতা, নিয়মিত নিরীক্ষণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এছাড়া স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে, জিয়াউর রহমানের সমালোচনার মূল কারণ তার অবৈধ সম্পদ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। তিনি যে ধরনের জীবনযাত্রা করছেন তা সাধারণ বেতনভুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য কল্পনাতীত। রাজধানী এবং গ্রামের বাড়িতে ফ্ল্যাট, প্লট, এবং অন্যান্য সম্পদ অর্জন করেছেন।
সংক্ষেপে বলা যায়, মেকানিক হিসেবে শুরু করা একজন সাধারণ কর্মকর্তা আজ বিআরটিএর সহকারী পরিচালক পদে থেকে লাইসেন্স বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে অসংখ্য সম্পদ অর্জন করেছেন। তার প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংযোগ এবং ক্ষমতার ব্যবহার তাকে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানে টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
জনমনে ক্ষোভ এবং প্রশাসনের প্রতি চাপ বাড়ার কারণে আশা করা হচ্ছে, দুদক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা অবিলম্বে তদন্ত শুরু করবে। সাধারণ মানুষ চায়, দুর্নীতির সাথে জড়িত সকল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং সরকারি সংস্থাগুলো স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধভাবে পরিচালিত হোক।
বিআরটিএর এমন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার উপস্থিতি কেবল সংস্থার স্বচ্ছতা নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতার পরিচয় দেয়। জনমনে এই ঘটনার কারণে আস্থা ক্ষুণ্ণ হলেও যদি প্রশাসন এবং দুদক কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নেয়, তবে মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব।
জিয়াউর রহমানের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন, বাংলাদেশের সরকারি সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বিষয়ে বড় প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। জনমনে চাপ রয়েছে, দুদক এবং প্রশাসন দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিক। কেবল এভাবেই সরকারি সংস্থাগুলোর সেবামূলক চরিত্র এবং সাধারণ নাগরিকের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















