ঢাকা ০৯:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর মহা দুর্নীতিবাজ, টিপু মুন্সির ভায়রা আবু নাসের চৌধুরীর ঢাকায় পোষ্টিং শিক্ষা প্রকৌশলী আলেক হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পিলার ও কয়েন চক্রের মূলহোতা ফরিদপুরের আওয়ামী নেতা আব্দুস সোবহান মিথ্যা বলাৎকারের মামলায় পাঁচ মাস ধরে কারাবন্দি শ্রমজীবী মোতালেব হোসেন দুর্নীতির অভিযোগ ঝুলে থাকতেই এলজিইডির শীর্ষ পদে বেলাল হোসেন শহীদুল্লাহ সিন্ডিকেটের ৩৮৭ কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্য আমিনবাজার ভূমি অফিসে ঘুষের আখড়া নাজির-ক্যাশিয়ার সাজেদুল ও সহযোগীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ ভবভদী আদর্শ যুব সংঘ’-এর উদ্যোগে অসহায়দের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ ভোলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

বাংলাদেশের বিমানসেবায় আনন্দের দূর্নীতি

জি কে এম সাদিকুল আমিন, যাকে সাধারণভাবে আনন্দ নামে চেনা যায়, বাংলাদেশের ট্রাভেল ও এয়ারলাইনস খাতে প্রতারণার এক ভয়ংকর চিত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। তিনি দোয়েল এয়ারওয়েজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় একাধিক এজেন্সি, এয়ারলাইনস, জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) এবং স্থানীয় ট্রাভেল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত হয়ে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার মাধ্যমে নিজের আর্থিক স্বার্থ হাসিল করেছেন। ইতোমধ্যেই ফ্লাইট এক্সপার্ট ও ফ্লাই ফার নামের দুটি প্রতিষ্ঠান একইভাবে প্রতারণার অভিযোগে আলোচিত হয়েছে, আর দোয়েল এয়ারওয়েজ এবং আনন্দের কর্মকাণ্ড এই চেইনকে আরও ভয়ঙ্কর রূপ দিয়েছে।

আনন্দকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রীসংখ্যা কম দেখিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে ফি কম প্রদান করা। কে বাংলা ট্রাভেলস লিমিটেডের সিইও হিসেবে তিনি এয়ার প্রিমিয়া পরিচালিত ঢাকা-সিউল রুটের নন-শিডিউলড চার্টার ফ্লাইটে যাত্রীসংখ্যা হেরফের করেছেন। বাংলাদেশের বেবিচক এ ধরনের ফ্লাইট থেকে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট ফি গ্রহণ করে, যা এয়ারলাইন্স বা তার স্থানীয় জিএসএ পরিশোধ করে। আনন্দের দায়িত্ব থাকা অবস্থায়, বিভিন্ন ফ্লাইটে প্রকৃত যাত্রীসংখ্যার সঙ্গে ফি পরিশোধের মধ্যে গরমিল ঘটানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে সিউলের ফ্লাইটে ২৬৫ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ অপ্রাপ্তবয়স্ক, মোট ২৭৮ যাত্রী ছিলেন। কিন্তু কে বাংলা ট্রাভেলস শুধুমাত্র ২৫৪ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ অপ্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে ফি কম পরিশোধ করেছে। এই ফি’র ঘাটতি প্রায় ৫৭৫ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৬৯ হাজার টাকা। একই বছরের ১৭ নভেম্বর ফ্লাইটে ২৭৬ জন যাত্রীর বদলে ২৪৪ প্রাপ্তবয়স্ক ও ১১ অপ্রাপ্তবয়স্ক দেখানো হয়েছে। ২০ অক্টোবরের আরেক ফ্লাইটে ২৯৫ জনের বদলে ২৭১ জন দেখানো হয়েছে। এই ধরণের হিসাবভ্রষ্টি একাধিক ফ্লাইটে ঘটেছে এবং মোট ফাঁকি নেওয়া অর্থ ও জাতীয় নিরাপত্তায় ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।

ফাইনান্স ও প্রশাসনিক দিক থেকে আনন্দের প্রতারণার পদ্ধতি অত্যন্ত পরিকল্পিত ছিল। নিজের পরিচয় পরিবর্তন করে তিনি কখনো মালিকপক্ষ, কখনো পরিচালক এবং কখনো এমডি পরিচয় ব্যবহার করতেন। বিভিন্ন শেল কোম্পানি ও বেনামি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তিনি চুক্তি সম্পন্ন ও অর্থ গ্রহণ করতেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের জুনে দেশের একটি স্বনামধন্য এয়ারলাইন্সের অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছিলেন। এই চুক্তি অনুযায়ী, ঢাকা-সিউল-ঢাকা রুটের ১০০টি টিকিট অগ্রিম বিক্রি করা হয় এবং ৫০ লাখ টাকা অগ্রিম অর্থ গ্রহণের কথা থাকলেও প্রকৃত এমডি মোহসিনুল বারী শাকিরের অনুমতি বা জ্ঞাতি ছাড়াই অর্থ দোয়েল এয়ারওয়েজের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে নিজের কাছে স্থানান্তর করা হয়।

আনন্দের প্রতারণা কেবল আর্থিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। যাত্রীসংখ্যার তথ্য হেরফের করার ফলে ইমিগ্রেশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গোয়েন্দা সংস্থা বিভ্রান্ত হতে পারে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি বা অপরাধী দেশ ত্যাগ করতে সক্ষম হতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন দুর্ঘটনা বা জরুরি উদ্ধার অভিযান, ভুল তথ্য উদ্ধার ও নিরাপত্তা তদারকিতে ব্যর্থতা ঘটায়। যুক্তরাজ্য অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ইমিগ্রেশন ও বর্ডার কন্ট্রোল অফিসার তানভীর আহমেদ পিয়াল বলেন, এ ধরনের হেরফের শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষতি এবং অপরাধী গোষ্ঠীকে সহায়তা করে।

কেবল ফ্লাইট ফি হেরফের নয়, আনন্দ ভুয়া টিকিট বিক্রির মাধ্যমেও অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ধর্মপ্রাণ ওমরাহ-যাত্রীরা তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। চট্টগ্রামের নুর-এ-ফাতিমা হজ কাফেলা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের কাছে ফ্লাই এ ডিল এয়ারলাইনসের ৩৫০টি টিকিট বিক্রির বিপরীতে অগ্রিম ৫০ লাখ টাকা গ্রহণের পর টিকিট ইস্যু হয়নি। পরবর্তীতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওই টিকিটগুলো ভুয়া হিসেবে ধরা পড়ে। এ ঘটনায় বনানী থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি জানে।

কেবল বিমানসংক্রান্ত নয়, আনন্দ বিভিন্ন এজেন্সি ও লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে শেল কোম্পানি ব্যবহার করেছেন। লোডস্টার অ্যাভিয়েশন লিমিটেডের নাম ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন চুক্তি সম্পন্ন এবং এয়ার প্রিমিয়ার কার্গো জিএসএ হিসেবে দেখানো হলেও ব্যাংক লেনদেন দোয়েল এয়ারওয়েজের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়েছে। এতে শীর্ষ লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান, ট্রাভেল এজেন্সি এবং অন্যান্য সংস্থা বিভ্রান্ত হয়েছে।

আনন্দকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ তদন্তও শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে কে বাংলার এমডি শাকির তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। তবে চেয়ারম্যান মাহবুবা খাতুনের হস্তক্ষেপে উল্টো কে বাংলা ট্রাভেলস চুক্তি হারায়, আনন্দ বেঁচে যান এবং তার প্রতারণা চলতে থাকে। এক সাক্ষাৎকারে আনন্দ স্বীকার করেন যে যাত্রীসংখ্যা কম দেখানো হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত দায় স্বীকার না করে প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেন। এছাড়া এমডি শাকিরকে গরমিলের বিষয়টি গোপন রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন।

আনন্দের কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। বেবিচকের ফি ফাঁকি, ভুয়া টিকিট, শেল কোম্পানি ব্যবহার এবং বিভিন্ন পরিচয় দিয়ে চুক্তি সম্পন্ন—all combined—দেশের এভিয়েশন সেক্টরের নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্বাসযোগ্যতাকে হুমকিতে ফেলেছে।

এই প্রতারণার প্রভাব বহুস্তরীয়। প্রথমত, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বৈধ রাজস্ব হারাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, যাত্রী ও ট্যুরিজম খাতের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সর্বোপরি, একটি সিস্টেম্যাটিক ও পরিকল্পিত আর্থিক এবং প্রশাসনিক প্রতারণার মাধ্যমে আনন্দ নিজের স্বার্থ হাসিল করছেন।

আইন শৃঙ্খলা সংস্থা ও সিআইডি এই বিষয়টি তদন্ত করছেন। কে বাংলার এমডি মোহসিনুল বারী শাকির আদালতে মামলা করেন এবং তদন্তে আনন্দের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। মামলাটি আদালতে রুজু হয়েছে এবং শিগগিরই গ্রেপ্তার ওয়ারেন্ট জারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আনন্দ বলেন, “উকিল কাজ করছে।” তবে ঘটনা স্পষ্ট যে, তিনি ইতোমধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার জাল বিস্তার করেছেন।

আনন্দের এই কর্মকাণ্ড একটি উদাহরণ যে, কিভাবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠান এবং নিয়মকানুনের শর্ত ভেঙে অর্থ ও ক্ষমতা দখল করতে পারেন। দোয়েল এয়ারওয়েজ লিমিটেড, কে বাংলা ট্রাভেলস এবং সম্পর্কিত অন্যান্য এজেন্সি—সবই তার পরিকল্পিত প্রতারণার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নিরাপত্তা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার গুরুত্ব যেন একপলকে ছাপিয়ে গেছে।

আনন্দের প্রতারণা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের নয়, এটি পুরো এভিয়েশন খাতের ওপর নৈতিক, আর্থিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করেছে। ৬০টিরও বেশি ফ্লাইটে যাত্রীসংখ্যা হেরফের, বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে শেল কোম্পানির মাধ্যমে চুক্তি, ভুয়া টিকিট এবং ব্যাংক লেনদেন—এই সব ঘটনা তার পরিকল্পিত প্রতারণার এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপস্থাপন করছে।

যেসব প্রতিষ্ঠান এবং যাত্রী তার শিকার হয়েছেন, তারা আর্থিক ক্ষতি ও মানহানি উভয়ই ভুগেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বেবিচকসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছেন। তবে আনন্দের দীর্ঘমেয়াদি প্রতারণার ধরন প্রমাণ করে যে, এই ধরনের অপরাধগুলো দ্রুত প্রকাশ না হলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সিস্টেমের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদে ফেনীতে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ

বাংলাদেশের বিমানসেবায় আনন্দের দূর্নীতি

আপডেট সময় ০১:৪৩:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

জি কে এম সাদিকুল আমিন, যাকে সাধারণভাবে আনন্দ নামে চেনা যায়, বাংলাদেশের ট্রাভেল ও এয়ারলাইনস খাতে প্রতারণার এক ভয়ংকর চিত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। তিনি দোয়েল এয়ারওয়েজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় একাধিক এজেন্সি, এয়ারলাইনস, জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) এবং স্থানীয় ট্রাভেল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত হয়ে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার মাধ্যমে নিজের আর্থিক স্বার্থ হাসিল করেছেন। ইতোমধ্যেই ফ্লাইট এক্সপার্ট ও ফ্লাই ফার নামের দুটি প্রতিষ্ঠান একইভাবে প্রতারণার অভিযোগে আলোচিত হয়েছে, আর দোয়েল এয়ারওয়েজ এবং আনন্দের কর্মকাণ্ড এই চেইনকে আরও ভয়ঙ্কর রূপ দিয়েছে।

আনন্দকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রীসংখ্যা কম দেখিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে ফি কম প্রদান করা। কে বাংলা ট্রাভেলস লিমিটেডের সিইও হিসেবে তিনি এয়ার প্রিমিয়া পরিচালিত ঢাকা-সিউল রুটের নন-শিডিউলড চার্টার ফ্লাইটে যাত্রীসংখ্যা হেরফের করেছেন। বাংলাদেশের বেবিচক এ ধরনের ফ্লাইট থেকে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট ফি গ্রহণ করে, যা এয়ারলাইন্স বা তার স্থানীয় জিএসএ পরিশোধ করে। আনন্দের দায়িত্ব থাকা অবস্থায়, বিভিন্ন ফ্লাইটে প্রকৃত যাত্রীসংখ্যার সঙ্গে ফি পরিশোধের মধ্যে গরমিল ঘটানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে সিউলের ফ্লাইটে ২৬৫ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ অপ্রাপ্তবয়স্ক, মোট ২৭৮ যাত্রী ছিলেন। কিন্তু কে বাংলা ট্রাভেলস শুধুমাত্র ২৫৪ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ অপ্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে ফি কম পরিশোধ করেছে। এই ফি’র ঘাটতি প্রায় ৫৭৫ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৬৯ হাজার টাকা। একই বছরের ১৭ নভেম্বর ফ্লাইটে ২৭৬ জন যাত্রীর বদলে ২৪৪ প্রাপ্তবয়স্ক ও ১১ অপ্রাপ্তবয়স্ক দেখানো হয়েছে। ২০ অক্টোবরের আরেক ফ্লাইটে ২৯৫ জনের বদলে ২৭১ জন দেখানো হয়েছে। এই ধরণের হিসাবভ্রষ্টি একাধিক ফ্লাইটে ঘটেছে এবং মোট ফাঁকি নেওয়া অর্থ ও জাতীয় নিরাপত্তায় ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।

ফাইনান্স ও প্রশাসনিক দিক থেকে আনন্দের প্রতারণার পদ্ধতি অত্যন্ত পরিকল্পিত ছিল। নিজের পরিচয় পরিবর্তন করে তিনি কখনো মালিকপক্ষ, কখনো পরিচালক এবং কখনো এমডি পরিচয় ব্যবহার করতেন। বিভিন্ন শেল কোম্পানি ও বেনামি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তিনি চুক্তি সম্পন্ন ও অর্থ গ্রহণ করতেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের জুনে দেশের একটি স্বনামধন্য এয়ারলাইন্সের অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছিলেন। এই চুক্তি অনুযায়ী, ঢাকা-সিউল-ঢাকা রুটের ১০০টি টিকিট অগ্রিম বিক্রি করা হয় এবং ৫০ লাখ টাকা অগ্রিম অর্থ গ্রহণের কথা থাকলেও প্রকৃত এমডি মোহসিনুল বারী শাকিরের অনুমতি বা জ্ঞাতি ছাড়াই অর্থ দোয়েল এয়ারওয়েজের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে নিজের কাছে স্থানান্তর করা হয়।

আনন্দের প্রতারণা কেবল আর্থিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। যাত্রীসংখ্যার তথ্য হেরফের করার ফলে ইমিগ্রেশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গোয়েন্দা সংস্থা বিভ্রান্ত হতে পারে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি বা অপরাধী দেশ ত্যাগ করতে সক্ষম হতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন দুর্ঘটনা বা জরুরি উদ্ধার অভিযান, ভুল তথ্য উদ্ধার ও নিরাপত্তা তদারকিতে ব্যর্থতা ঘটায়। যুক্তরাজ্য অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ইমিগ্রেশন ও বর্ডার কন্ট্রোল অফিসার তানভীর আহমেদ পিয়াল বলেন, এ ধরনের হেরফের শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষতি এবং অপরাধী গোষ্ঠীকে সহায়তা করে।

কেবল ফ্লাইট ফি হেরফের নয়, আনন্দ ভুয়া টিকিট বিক্রির মাধ্যমেও অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ধর্মপ্রাণ ওমরাহ-যাত্রীরা তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। চট্টগ্রামের নুর-এ-ফাতিমা হজ কাফেলা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের কাছে ফ্লাই এ ডিল এয়ারলাইনসের ৩৫০টি টিকিট বিক্রির বিপরীতে অগ্রিম ৫০ লাখ টাকা গ্রহণের পর টিকিট ইস্যু হয়নি। পরবর্তীতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওই টিকিটগুলো ভুয়া হিসেবে ধরা পড়ে। এ ঘটনায় বনানী থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি জানে।

কেবল বিমানসংক্রান্ত নয়, আনন্দ বিভিন্ন এজেন্সি ও লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে শেল কোম্পানি ব্যবহার করেছেন। লোডস্টার অ্যাভিয়েশন লিমিটেডের নাম ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন চুক্তি সম্পন্ন এবং এয়ার প্রিমিয়ার কার্গো জিএসএ হিসেবে দেখানো হলেও ব্যাংক লেনদেন দোয়েল এয়ারওয়েজের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়েছে। এতে শীর্ষ লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান, ট্রাভেল এজেন্সি এবং অন্যান্য সংস্থা বিভ্রান্ত হয়েছে।

আনন্দকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ তদন্তও শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে কে বাংলার এমডি শাকির তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। তবে চেয়ারম্যান মাহবুবা খাতুনের হস্তক্ষেপে উল্টো কে বাংলা ট্রাভেলস চুক্তি হারায়, আনন্দ বেঁচে যান এবং তার প্রতারণা চলতে থাকে। এক সাক্ষাৎকারে আনন্দ স্বীকার করেন যে যাত্রীসংখ্যা কম দেখানো হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত দায় স্বীকার না করে প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেন। এছাড়া এমডি শাকিরকে গরমিলের বিষয়টি গোপন রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন।

আনন্দের কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। বেবিচকের ফি ফাঁকি, ভুয়া টিকিট, শেল কোম্পানি ব্যবহার এবং বিভিন্ন পরিচয় দিয়ে চুক্তি সম্পন্ন—all combined—দেশের এভিয়েশন সেক্টরের নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্বাসযোগ্যতাকে হুমকিতে ফেলেছে।

এই প্রতারণার প্রভাব বহুস্তরীয়। প্রথমত, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বৈধ রাজস্ব হারাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, যাত্রী ও ট্যুরিজম খাতের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সর্বোপরি, একটি সিস্টেম্যাটিক ও পরিকল্পিত আর্থিক এবং প্রশাসনিক প্রতারণার মাধ্যমে আনন্দ নিজের স্বার্থ হাসিল করছেন।

আইন শৃঙ্খলা সংস্থা ও সিআইডি এই বিষয়টি তদন্ত করছেন। কে বাংলার এমডি মোহসিনুল বারী শাকির আদালতে মামলা করেন এবং তদন্তে আনন্দের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। মামলাটি আদালতে রুজু হয়েছে এবং শিগগিরই গ্রেপ্তার ওয়ারেন্ট জারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আনন্দ বলেন, “উকিল কাজ করছে।” তবে ঘটনা স্পষ্ট যে, তিনি ইতোমধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার জাল বিস্তার করেছেন।

আনন্দের এই কর্মকাণ্ড একটি উদাহরণ যে, কিভাবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠান এবং নিয়মকানুনের শর্ত ভেঙে অর্থ ও ক্ষমতা দখল করতে পারেন। দোয়েল এয়ারওয়েজ লিমিটেড, কে বাংলা ট্রাভেলস এবং সম্পর্কিত অন্যান্য এজেন্সি—সবই তার পরিকল্পিত প্রতারণার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নিরাপত্তা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার গুরুত্ব যেন একপলকে ছাপিয়ে গেছে।

আনন্দের প্রতারণা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের নয়, এটি পুরো এভিয়েশন খাতের ওপর নৈতিক, আর্থিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করেছে। ৬০টিরও বেশি ফ্লাইটে যাত্রীসংখ্যা হেরফের, বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে শেল কোম্পানির মাধ্যমে চুক্তি, ভুয়া টিকিট এবং ব্যাংক লেনদেন—এই সব ঘটনা তার পরিকল্পিত প্রতারণার এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপস্থাপন করছে।

যেসব প্রতিষ্ঠান এবং যাত্রী তার শিকার হয়েছেন, তারা আর্থিক ক্ষতি ও মানহানি উভয়ই ভুগেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বেবিচকসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছেন। তবে আনন্দের দীর্ঘমেয়াদি প্রতারণার ধরন প্রমাণ করে যে, এই ধরনের অপরাধগুলো দ্রুত প্রকাশ না হলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সিস্টেমের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।