পূর্ব রেলের সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা, যার ওপর নির্ভর করে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। আধুনিক রেল ব্যবস্থায় সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশন প্রযুক্তি হলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার। অথচ অভিযোগ উঠেছে, এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটিতেই বছরের পর বছর ধরে চলছে লাগামহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্য। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে অতি: প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী (সিএসটিই–পূর্ব) তারেক মোহাম্মদ শামছ্ তুষারের নাম।
রেলওয়ের সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ নতুন রেললাইন স্থাপন, সিগন্যাল আপগ্রেডেশন, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু, অপটিক্যাল ফাইবার ও টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণসহ বহুমুখী দায়িত্ব পালন করে। এই বিভাগের কার্যক্রমের ওপরই নির্ভর করে ট্রেনের গতিপথ নির্ধারণ, সংঘর্ষ প্রতিরোধ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত যোগাযোগ। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, পূর্ব রেলের এই বিভাগটি দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির চক্রের কবলে রয়েছে।
রেল সূত্রে জানা যায়, তারেক মোহাম্মদ শামছ্ তুষার জুন ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পূর্ব রেলের অতি: প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ফেব্রুয়ারি ২০২১ থেকে মার্চ ২০২২ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় রেল ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ডিআরএম থাকা অবস্থায় তিনি একসঙ্গে প্রায় ১৩টি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন এবং সেই সুযোগে বিভিন্ন বিভাগে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে আঁতাত করে ব্যাপক অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে তিনি পুনরায় অতি: সিএসটিই–পূর্ব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও রেল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রকল্প ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজগুলোতে বছরের পর বছর ধরে একই কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পাচ্ছে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা নেই বললেই চলে। নতুন বা বাইরের ঠিকাদারদের টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় না। কেউ চেষ্টা করলে হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, যারা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ বণ্টন করে নেয়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজে ঠিকাদারদের ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। বিল ছাড়, কাজের অনুমোদন, পরিমাপ বই (এমবি) স্বাক্ষর—সব ক্ষেত্রেই ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্য চালু রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ না করেই বা নিম্নমানের কাজ দেখিয়ে বিল তোলা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হলেও বাস্তবে সংকেত ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি।
রেলওয়ের উন্নয়নে গত একযুগে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। কিন্তু সেই তুলনায় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ খুবই সীমিত। এখনো দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে ম্যানুয়াল সিগন্যালিং পদ্ধতিতে ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে, যা ডিজিটাল যুগে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক ইলেকট্রনিক ইন্টারলকিং ও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে এবং প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে।
রেল সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দেশের ইতিহাসে যেসব বড় ট্রেন দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে, তার অনেকগুলোর পেছনেই সংকেত ব্যবস্থার ত্রুটি ছিল। এসব ত্রুটির দায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। অথচ দুর্ঘটনার পর দায় নিরূপণ না করে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের একাধিক প্রকল্পের অর্থ ছাড় ও ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে। ওই চিঠি প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রকৌশলী সুশীল কুমার হালদারের কাছে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে প্রকৌশলী তারেক মোহাম্মদ শামছ্ তুষার দুদক বরাবর প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন। তবে দুদকের এই উদ্যোগকে সংশ্লিষ্টরা সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তের অংশ হিসেবে দেখছেন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তারেক মোহাম্মদ শামছ্ তুষার স্বীকার করেন যে নির্দিষ্ট ঠিকাদাররাই মূলত এই বিভাগে কাজ করে থাকে। তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী তাকে কাজ করতে হয় এবং একা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী টাকা খাওয়া হয় এবং কাজের ধরন অনুযায়ী কমিশনের পরিমাণ নির্ধারিত থাকে। তার বক্তব্যে কমিশন গ্রহণের বিষয়টি কার্যত স্বীকারোক্তির পর্যায়ে পড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
রেলওয়ের ভুক্তভোগী কিছু ঠিকাদার জানান, বছরের পর বছর ধরে তারা এই বিভাগের কাজ থেকে বঞ্চিত। টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে চাইলে তাদের ভয় দেখানো হয়। কেউ মুখ খুললে ভবিষ্যতে আর কোনো কাজ না পাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অনেক ঠিকাদার বাধ্য হয়ে মুখ বন্ধ করে থাকতে বাধ্য হন। তাদের ভাষায়, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট পুরো বিভাগটিকে জিম্মি করে রেখেছে।
রেল সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম–দোহাজারী রেললাইন প্রকল্পের মতো বড় প্রকল্পের আওতায় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ আধুনিকীকরণের কাজেও বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রকল্পে আংশিক আধুনিকীকরণ দেখিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডে তারেক মোহাম্মদ শামছ্ তুষার সরাসরি জড়িত ছিলেন।
সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের কার্যক্রমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিভাগের সঠিক ও স্বচ্ছ কার্যক্রমের ওপরই নির্ভর করে পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই বিভাগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখায় দীর্ঘদিন একই কর্মকর্তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে রাখাই দুর্নীতির মূল কারণ। যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহির অভাব থাকায় একটি দুর্নীতিবাজ চক্র গড়ে উঠেছে। তারা মনে করেন, প্রকৃত তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে রেলওয়ের নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকেই যাবে।
এই পরিস্থিতিতে সচেতন মহল দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত, দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, রেলওয়ের সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, এটি সরাসরি মানুষের জীবনঝুঁকির সঙ্গে জড়িত। তাই এই অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হলে দেশের রেল ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















