জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (এনএইচএ) আওতাধীন ঢাকার মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটে ফ্ল্যাটের নামজারি অনুমোদনকে কেন্দ্র করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি, আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং সেবাগ্রহীতাকে হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আকলিমা খানম ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আব্দুল্লাহ নুর।
অভিযোগকারী মো. আব্দুল আওয়াল হিমেল জানিয়েছেন, নিজের ছেলে ও মেয়েকে হেবা দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর করা দুটি ফ্ল্যাটের নামজারির অনুমতি নিতে গেলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আকলিমা খানম ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আব্দুল্লাহ নুর প্রতি ফ্ল্যাটে ৬০ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। দাবিকৃত এই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর থেকেই নামজারির আবেদন দুটি নিয়ে অস্বাভাবিক বিলম্ব ও নানা প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি করা হয়। উপায় না পেয়ে গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন তিনি। অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাঁর ছেলে ও মেয়ের নামে করা নামজারির আবেদন দুটি বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়। সেই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক কাগজপত্র, আবেদন এবং ফ্ল্যাটের নামজারি ও হস্তান্তরসংক্রান্ত অনুমতিপত্রের অনুলিপির মতো সব প্রমাণও সংযুক্ত করা হয়।
চেয়ারম্যানের কাছে দাখিল করা এই অভিযোগটি পরবর্তীতে তদন্তের জন্য জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো হয়। তবে অভিযোগকারী জানিয়েছেন, অভিযোগ দাখিলের পর তদন্তের অগ্রগতি, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ কিংবা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে তাঁকে সুস্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি। তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়ে কোনো তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হয়েছে কি না এবং তদন্তের ফলাফল কী—এসব বিষয় এখনো তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অস্পষ্ট। ফলে চেয়ারম্যানের কাছে লিখিতভাবে দাখিল করা ঘুষ দাবির অভিযোগের তদন্ত কতদূর এগিয়েছে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কেন এত বিলম্ব হচ্ছে, তা নিয়ে বড়ো প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আকলিমা খানমের স্বাক্ষরিত একটি প্রতিবেদন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো হয়, যার তারিখ ছিল ৮ অক্টোবর ২০২৬। ওই প্রতিবেদনে মো. আব্দুল আওয়াল হিমেলের অভিযোগকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করা হয় এবং মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের ‘ক’ ও ‘বি’ ব্লকের কয়েকটি ফ্ল্যাটের নামজারি ও হস্তান্তরসংক্রান্ত অনুমোদনের তথ্য তুলে ধরা হয়। তবে প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অভিযোগের প্রতিটি বিষয় পৃথকভাবে যাচাই করে কোনো ধারাবাহিক ও তথ্য-প্রমাণভিত্তিক ব্যাখ্যা সেখানে দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে প্রতি ফ্ল্যাটে ৬০ হাজার টাকা করে ঘুষ দাবির অভিযোগের বিষয়ে কী ধরনের অনুসন্ধান করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না কিংবা কোনো দালিলিক প্রমাণ যাচাই করা হয়েছে কি না—তার বিস্তারিত বিবরণ প্রতিবেদনে অনুপস্থিত ছিল। একইভাবে, অভিযোগকারীর ছেলে ও মেয়ের নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ, আবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণের সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বের বিষয়েও কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, অভিযোগে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আকলিমা খানমের বিরুদ্ধে সরাসরি অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তাঁর নিজের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনেই অভিযোগের বিষয়ে একপক্ষীয় বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যা পুরো তদন্তের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অভিযোগপত্র ও সংযুক্ত নথি অনুযায়ী, মেয়ের নামে ফ্ল্যাটের নামজারির অনুমতি চেয়ে ১০ মে ২০২৬ এবং ছেলের নামে ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আবেদন করা হয়। মেয়ের আবেদনের শুনানিতে প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্র উপস্থাপন করা হলেও পরবর্তী সময়ে সেই ফাইল প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অথচ একই হাউজিং এস্টেটের অন্য কয়েকটি ফ্ল্যাটের নামজারি ও হস্তান্তরসংক্রান্ত অনুমোদন স্থানীয় এস্টেট কার্যালয়ের কার্যক্রমের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে। একই আবাসিক এলাকার অন্য ফ্ল্যাটের নামজারি অনুমোদন স্থানীয়ভাবে দেওয়া সম্ভব হলে আবেদনকারীর মেয়ের আবেদনের ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজন হলো কেন, তার কোনো সদুত্তর নেই। অন্যদিকে ছেলের নামে করা আবেদনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকার কথা বলা হলেও, ঠিক কোন কোন কাগজপত্রের ঘাটতি ছিল, কখন সেগুলো জমা দিতে বলা হয়েছিল এবং এ বিষয়ে আবেদনকারীকে লিখিতভাবে কখনো অবহিত করা হয়েছিল কি না—তারও কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে আরও বিস্তৃত অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঠিকাদারি বিল ছাড়, প্লট ও ফ্ল্যাটের নামজারি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অননুমোদিত অর্থ আদায় করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে অফিস সহকারী ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে এসব অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ভূমি অফিস, আবাসন কর্তৃপক্ষ ও সম্পত্তিসংক্রান্ত সরকারি দপ্তরে নামজারি বা মালিকানা হস্তান্তর পেতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও হয়রানির চিত্র নতুন কিছু নয়। তবে সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো আবেদনকারীকে হয়রানি করা, অযৌক্তিক বিলম্ব সৃষ্টি করা বা অননুমোদিত অর্থ দাবি করা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রশাসনিক কর্মকর্তা আকলিমা খানম ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আব্দুল্লাহ নুরের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























