ঢাকা মহানগরের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ভূ-উপরিস্থ নদীর পানি সরবরাহের উদ্দেশ্যে হাতে নেওয়া ঢাকা ওয়াসার ‘ঢাকা পরিবেশবান্ধব টেকসই পানি সরবরাহ প্রকল্প (তৃতীয়বার সংশোধিত)’ বাস্তবায়নে ব্যাপক দুর্নীতি, অদক্ষতা ও আর্থিক অনিয়মের প্রমান মিলেছে। দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, প্যাকেজের মূল্য অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বৃদ্ধি এবং ঠিকাদারকে চুক্তি বহির্ভূত অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধসহ নানা প্রক্রিয়ায় সরকারের কয়েক শত কোটি টাকার অনভিপ্রেত আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক সরেজমিন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে।
প্রকল্পের অনুমোদন, মেয়াদ ও অনিয়মতান্ত্রিক ব্যয় বৃদ্ধির ইতিহাস: ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে ৫ হাজার ২৪৮ কোটি ৬ লাখ টাকা আনুমানিক প্রাক্কলিত ব্যয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা। তবে প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা ও ধীরগতির কারণে বারবার ডিপিপি সংশোধনের মাধ্যমে এর মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়, যা মূল মেয়াদের তুলনায় ১২৬.৭৬ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে প্রকল্পের সার্বিক ব্যয় ১০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকায়। গত প্রায় পৌনে ১২ বছরে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৬৩.৭৪ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৯০.২০ শতাংশ। কাজের স্বাভাবিক গতির তুলনায় এই ধীরগতি ও অসামঞ্জস্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় চরম উদাসীনতাকে নির্দেশ করে।
সরকারি ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘন ও অনিয়মতান্ত্রিক বিল পরিশোধ: আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিজিপি) পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকেই ঠিকাদারকে ৩ হাজার ৯২৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঠিকাদারকে মূল চুক্তিমূল্যের চেয়ে ৯২৩.২৬ কোটি টাকা বা ৩০.৭১ শতাংশ অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে, যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিআর) এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক শৃঙ্খলার সরাসরি লঙ্ঘন। এছাড়া, প্রতিটি প্যাকেজে চুক্তি মূল্য পরিবর্তিত হওয়া সত্ত্বেও ডিপিপি সংশোধনের সময় প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে, যা উন্নয়ন পরিকল্পনা পরিপত্রের ব্যত্যয়। একই সঙ্গে ২০২১-২২ অর্থবছরে এডিপির অব্যয়িত ৫৯ লাখ ২৪ হাজার ৯০২ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া এবং ডিপিপির বহির্ভূত খাতগুলোতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর মতো গুরুতর আর্থিক অসঙ্গতি ঘটেছে। প্রকল্পটিতে নিয়োজিত চব্বিশ জন কর্মীকেও বিধি বহির্ভূতভাবে অস্বাভাবিক বেতন-ভাতা প্রদান করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আন্তঃসংস্থা সমন্বয়হীনতা ও অডিট আপত্তির চাপ: প্রকল্পের পাইপলাইন স্থাপনের মতো স্পর্শকাতর কাজগুলো পরিচালনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ট্রাফিক), ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (এমআরটি-১) এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় সাধন করা হয়নি। এই সমন্বয়হীনতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবির সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অধিকন্তু, গত ১০ অর্থবছরে এই প্রকল্পের বিপরীতে উত্থাপিত ৮৩টি অডিট আপত্তির মধ্যে ৫৪টি আপত্তিই এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যার সাথে জড়িয়ে আছে ১ হাজার ৫৪৪ কোটি ২২ লাখ টাকার বিশাল আর্থিক সংশ্লেষ।
অনিয়ম প্রতিরোধে আইএমইডির সুপারিশমালা: প্রকল্পের সরেজমিন ও নথিপত্র অনুসন্ধান শেষে আইএমইডির চার সদস্যের তদন্ত কমিটি অনিয়ম বন্ধে ও শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বহুমাত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা দূর করতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করতে হবে, যা প্রতি দুই মাস পর পর অগ্রগতির তদারকি করবে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় ১ বছর ৯ মাস থেকে ৩ বছর ৮ মাস পর্যন্ত অযৌক্তিক বিলম্বের কারণে প্যাকেজগুলোতে যে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই ভেরিয়েশন ও নতুন আইটেম পিপিআর-এর সীমা অতিক্রম করেছে কি না তা বিচারে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনা, সিসিজিপির অনুমোদন ছাড়া পরিশোধিত বাড়তি ৯২৩ কোটি টাকার ঘটনার আলাদা তদন্ত, বেআইনি জনবল নিয়োগ ও বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে অনুসন্ধান এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বকেয়া বিলের কারণে বন্ধ থাকা বিশনন্দী ইনটেক পাম্পিং স্টেশনের নির্মাণকাজ দ্রুত চালু করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
দাপ্তরিক চিঠি গায়েব ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা: গত বছরের ১৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকের নির্দেশনার আলোকে গঠিত আইএমইডির চার সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি ২০ অক্টোবর তাদের প্রতিবেদনটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে পাঠায়। তবে আইএমইডির নির্দেশনার পরও স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আইএমইডির ওই গোপনীয় প্রতিবেদন ও দাপ্তরিক চিঠি খুঁজে পাচ্ছেন না বলে দাবি করছেন। ওয়াসার বহুল আলোচিত প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদকে প্রশাসনিক ও আইনি দায় থেকে আড়াল করতেই ওই প্রতিবেদনের চিঠি গায়েব করে দেওয়া হয়েছে বলে জোর গুঞ্জন উঠেছে।
ওয়াসা ও স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্বশীলদের প্রতিক্রিয়া: আইএমইডির অনুসন্ধানী তথ্যের ভিত্তিতে ওয়াসার প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম ও চিঠির বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা দায়িত্ব এড়িয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন অনুবিভাগের মহাপরিচালক শিবির বিচিত্র বড়ুয়া এবং অতিরিক্ত সচিব আবু নছর মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এ বিষয়ে কিছু জানা নেই বলে মন্তব্য করেন। পরবর্তীতে পানি সরবরাহ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব তাছলিমা শিরিন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা জীবন কৃষ্ণ ভৌমিক ও যুগ্মসচিব মো. সামছুল ইসলাম জানান যে আইএমইডির কোনো প্রতিবেদন তাদের হস্তগত হয়নি কিংবা থাকলেও তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, অনিয়মের সাথে মূল অভিযুক্ত প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ এবং ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মুহা. মনিরুজ্জামানকে একাধিকবার ফোন করা এবং বার্তা পাঠানো হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























