মাত্র ১৪ বছর আগে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রলিম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন মোহাম্মদ শাহজাহান ওরফে সিনথিয়া শাহজাহান। একসময় বাসে চড়ে রাজধানীতে আসা সেই সাধারণ যুবকটিই আজ শতকোটি টাকার বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক। সাধারণ এক বিমানবন্দর কর্মীর এমন অস্বাভাবিক ও চোখধাঁধানো আর্থিক উত্থান এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। রাজধানী ঢাকা এবং নিজ গ্রামে তিনি গড়ে তুলেছেন একাধিক আলিশান বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট ও নানা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। চলাচলের জন্য তার বহরে রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি। তবে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা গুরুতর অনিয়ম ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদের তথ্য ফাঁস হয়ে পড়ার পর প্রশাসনের সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের ভয়ে তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।
জানা যায়, ২০১০ সালে মাত্র আট হাজার টাকা মাসিক বেতনে বিমানবন্দর কাস্টমসের এক কর্মকর্তার সহায়তায় ট্রলিম্যান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন শাহজাহান। অথচ অত অল্প সময়ের মধ্যে তার সম্পদ ও জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান আকাশছোঁয়া পরিবর্তন আসে, যা তার সহকর্মীদের মনেও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাদের মতে, এত সীমিত আয়ের একটি চাকরি করে কোনো মানুষের পক্ষে কীভাবে শতকোটি টাকার বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব, তা এক বড় রহস্য।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকায় আসার পর শুরুর দিনগুলোতে ইউসুফ আলী নামের এক ব্যক্তির মেসে উঠতেন শাহজাহান। সে সময় সেখানে তার থাকা-খাওয়ার ন্যূনতম খরচ জোগাতেই চরম হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু রহস্যজনক অর্থবিত্তের জোরে মাত্র দুই বছর আগে ইসমাইল নামের এক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় শাহজাহান সেই মেসটিই কিনে নেন। পরবর্তীতে কাস্টমস এলাকার কাছে ‘সিনথিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি, যা থেকে বর্তমানে তার সমস্ত ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। তবে শাহজাহান আত্মগোপনে থাকলেও তার ম্যানেজারের পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন কাজ এখনো নিয়মিত চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের বিভিন্ন স্থানে শাহজাহানের অঢেল সম্পদের রয়েছে। তার মধ্যে দক্ষিণখানে তার মালিকানায় রয়েছে ‘সিনথিয়া অ্যান্ড সিলভিয়া কটেজ’ নামে একটি সুবিশাল দশতলা ভবন। আশকোনায় রয়েছে প্রায় ছয় কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং সেখানে ১৮ কাঠা জমির ওপর আরও একটি ভবনের নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। একই এলাকার আশিয়ান সিটিতে একাধিক প্লটের মালিকানার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া উত্তরার ১ নম্বর সেক্টরে নিজস্ব বাড়ি এবং ১৮ নম্বর সেক্টরে নির্মাণাধীন আরও একটি ভবনের তথ্য অনুসন্ধান সূত্রে উঠে এসেছে।
ঢাকার বাইরে শাহজাহানের পৈতৃক ভিটায় গিয়েও একই ধরনের বিস্ময়কর দৃশ্য দৃশ্যমান হয়। ২০১০ সালেও জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে তাদের পরিবার ভিটেমাটি ছাড়া আর উল্লেখ করার মতো কোনো সম্পদের মালিক ছিল না। অথচ সেখানে এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন ও বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। পাশাপাশি এক বিঘা জমির ওপর একটি জলাশয় তৈরি করে সেখানে তিনি শখ করে মৎস্যচাষ করেন। শুধু নিজ গ্রামেই নয়, শাহজাহানের বিরুদ্ধে তার শ্বশুরবাড়ির এলাকাতেও অঢেল সম্পদ গড়ে তোলার জোরালো অভিযোগ বিদ্যমান।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপকর্ম ঢাকা এবং ক্ষমতা ব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে শাহজাহানের বিরুদ্ধে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্য তৈরি করে তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এই রাজনৈতিক প্রভাবের জেরে ২০২০ সালে তিনি ঢাকা কাস্টমস অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ হাতিয়ে নেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুহূর্তের মধ্যেই তিনি রাজনৈতিক খোলস পাল্টে ফেলে বর্তমানে নিজেকে বিএনপির নেতা হিসেবে দাবি করছেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শাহজাহানের এই বিপুল সম্পদ অর্জনের পেছনে রয়েছে গভীর অনিয়ম ও চোরাচালানের যোগসাজশ। বিমানবন্দর কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আঁতাত করে তিনি একটি আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্র গড়ে তোলেন এবং অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। এসব গুরুতর অপরাধের কারণে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একাধীক অভিযোগ দুদকে দাখিল করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, তার এই আয়বহির্ভূত সম্পদের সুনির্দিষ্ট উৎসের সন্ধানে খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা হবে।
আইনি সংকটের দিক থেকেও শাহজাহান এখন বেশ কোণঠাসা। অনুসন্ধানে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানাসহ বিভিন্ন স্থানে দায়ের করা অন্তত পাঁচটি মামলার আসামির তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সম্প্রতি আশুলিয়া থানায়ও তার বিরুদ্ধে নতুন করে একটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব মামলার কারণেই প্রধানত তিনি এখন আত্মগোপনে রয়েছেন, যদিও তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়মিতই খোলা রাখা হচ্ছে।
আট হাজার টাকার সাধারণ ট্রলিম্যান থেকে শতকোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া এই শাহজাহানের ঘটনাটি এখন সর্বত্র নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিমানবন্দর কেন্দ্রিক অনিয়ম-চোরাচালানে আর কোন কোন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার মদদদাতা ছিলেন, তার প্রকৃত উৎসের ভিত্তি কী—তা সুষ্ঠুভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। যদিও আত্মগোপনে থাকার কারণে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মোহাম্মদ শাহজাহানের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। কাস্টমস কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জড়িত থাকা, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড এবং দুদকের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই এই রহস্যের সত্যতা উদঘাটিত হতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























