ঢাকা ১০:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পবিপ্রবির পরিবহন বহরে যুক্ত হলো বিআরটিসির দোতলা বাস পাঁচ কোটির কাজ, ৫০ লাখের লেনদেন, চাপে মামলা: প্রশ্নের মুখে বিএডিসি গার্মেন্টসে অস্থিরতায় সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বড়লেখার দাসের বাজারে বিএনপির মতবিনিময় সভা, প্রধান অতিথি নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু অটোরিকশা নিয়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মাইকিং গঙ্গার পানি না এলে ভারতীয় পণ্যও বাংলাদেশে আসবে না: নাহিদ ইসলাম নাটোরের সাবেক এমপি শিমুলের সহযোগী যুবলীগ নেতা আটক তাহসিফের মৃত্যুরহস্য: বারে মদ্যপান থেকে টঙ্গীর মাঠে যাওয়ার বর্ণনা দীপের পিডিবিকে পাত্তা দিচ্ছে না চট্টগ্রাম বিআরটিএ, বকেয়া বিলের কারণে বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে মাতলেন শাবনূর

পাঁচ কোটির কাজ, ৫০ লাখের লেনদেন, চাপে মামলা: প্রশ্নের মুখে বিএডিসি

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামকে হত্যার উদ্দেশ্যে দপ্তরে প্রবেশ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে একটি মামলা এখন নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে। মামলাটি করেছেন বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস। আসামি করা হয়েছে চট্টগ্রামের আবাসন ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীর, তাঁর সহযোগী মো. মনির হোসেন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ছয়-সাতজনকে। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মামলার নেপথ্যে রয়েছে পাঁচ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি কার্যাদেশকে ঘিরে কথিত ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের একটি অভিযোগ, যা পুরো ঘটনাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের চান্দগাঁও থানায় মামলাটি (নম্বর ০৯) দায়ের হয় ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি। এজাহারে ঘটনার তারিখ দেখানো হয়েছে ৪ জানুয়ারি। মামলায় দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৪৩, ৪৪৭, ৪৪৮, ৩২৩ ও ৫০৬ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এজাহারের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামিরা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে দপ্তরের উঁচু দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখান ও প্রাণনাশের হুমকি দেন। দেয়াল টপকে প্রবেশের এই দাবির পক্ষে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথি বা অন্য কোনো দালিলিক প্রমাণ আছে কি না, তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। মামলার তদন্তভার চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ফয়সলের ওপর ন্যস্ত।

মামলার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রথম প্রশ্নটি উঠেছে এখতিয়ার নিয়ে। এজাহারে ঘটনাস্থল হিসেবে পাঁচলাইশ থানাধীন বিএডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তরের ঠিকানা উল্লেখ আছে, অথচ মামলা নেওয়া হয়েছে চান্দগাঁও থানায়। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৬(১) ধারায় থানার স্থানীয় এখতিয়ারের ভিত্তিতে আমলযোগ্য অপরাধ তদন্তের বিধান আছে, আর ১৭৭ ধারায় সাধারণত অপরাধ সংঘটনের এলাকার আদালতেই বিচার ও অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে। অপরাধের স্থান অনিশ্চিত হলে, একাধিক এলাকায় ঘটলে কিংবা ধারাবাহিক প্রকৃতির হলে ১৮২ ধারায় ভিন্ন এলাকার এখতিয়ার খাটতে পারে। কিন্তু এই মামলায় সেরকম কোনো ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। পাঁচলাইশ থানায় আগে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সেখান থেকে চান্দগাঁওয়ে পাঠানো হয়েছিল কি না, নাকি ঘটনার সঙ্গে অন্য এলাকার সংশ্লিষ্টতা ছিল, তা স্পষ্ট নয়। যথাযথ তথ্যপ্রমাণ ছাড়া পাঁচলাইশ থানাকে নিষ্ক্রিয় বলার সুযোগও নেই। দুই থানার রেকর্ড, অভিযোগ গ্রহণের তথ্য ও এখতিয়ারসংক্রান্ত নথি দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে, আর সে জন্য বাদী, সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ ও মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

মামলার পেছনের ঘটনা খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, হাসিমপুরের বাসিন্দা আলমগীরের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের ব্যবসায়িক যোগাযোগ ছিল। আলমগীরের দাবি, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কাজের কার্যাদেশ পাওয়ার আশায় তিনি তিন কিস্তিতে মোট ৫০ লাখ টাকা দিয়েছেন। তাঁর হিসাবে প্রথম কিস্তিতে একজন ঠিকাদারের মাধ্যমে পাঁচ লাখ, পরে সরাসরি ৩৫ লাখ এবং সবশেষ আরও ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার সময় দুজন ঠিকাদার উপস্থিত ছিলেন বলেও তিনি দাবি করেন। আলমগীরের অভিযোগ, টাকা দেওয়ার পরও কার্যাদেশ না মেলায় তিনি একাধিকবার বিষয়টি জানতে চেয়েছেন, তাতেই বিরোধের সূত্রপাত, এবং এর জেরেই তাঁকে ফাঁসাতে মামলাটি করা হয়েছে। তবে এই অর্থ লেনদেন, এর উৎস, গ্রহণকারী ও কথিত কার্যাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি। উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং দরপত্র ও কার্যাদেশের নথি যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বক্তব্য এসেছে খোদ মামলার বাদীর কাছ থেকে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপে সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস দাবি করেন, এ ধরনের মামলা করার ব্যক্তিগত আগ্রহ তাঁর ছিল না; তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের চাপের মুখেই তিনি মামলা করেছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি ঊর্ধ্বতনের চাপে এজাহারে স্বাক্ষর করে থাকেন, তবে সেই চাপের স্বরূপ ও প্রেক্ষাপট কী ছিল, তা জানা জরুরি। বাদীর এই বক্তব্য এজাহারের অভিযোগের সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ এবং তিনি কেন এমন বলছেন, তা-ও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।

আর্থিক অভিযোগের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে চট্টগ্রাম শহরের দুটি ব্যাংক শাখা। অভিযোগ আছে, নুরুল ইসলাম তাঁর দুই-তিনজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে কথিত অর্থ জমার ব্যবস্থা করতেন; কখনো নিজে শাখায় যেতেন, কখনো একান্ত সহকারীদের দিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে পাওয়া টাকা জমা দেওয়াতেন। শাখা দুটির একটি এনসিসি ব্যাংকের কামাল বাজার, অন্যটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মুরাদপুর। অভিযোগের নির্দিষ্ট তারিখ ও লেনদেনের সময় মিলিয়ে এই দুই শাখার সিসিটিভি ফুটেজ দেখা গেলে তাঁর বা তাঁর সহকারীদের উপস্থিতির দৃশ্যমান প্রমাণ মিলতে পারে। তবে শুধু ব্যাংকে উপস্থিতি ঘুষ গ্রহণের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; এর সঙ্গে জমা স্লিপ, জমাদানকারীর পরিচয়, লেনদেনের পরিমাণ, হিসাবধারীর সঙ্গে সম্পর্ক ও ব্যাংকের সংরক্ষিত অন্যান্য নথিও যাচাই করতে হবে। ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর মুছে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় আইনগত প্রক্রিয়ায় দ্রুত তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

নুরুল ইসলাম এসব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে আসছেন। ৫০ লাখ টাকা গ্রহণ, আত্মীয়দের হিসাব ব্যবহার এবং বাদীকে চাপ দেওয়ার প্রতিটি অভিযোগই তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। অভিযোগ বা তাঁর বক্তব্যের সত্যতা নিরূপণে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, ব্যাংক নথি, ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাই একমাত্র পথ।

অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিএডিসির নিজস্ব তদন্ত কর্তৃপক্ষের সমন্বিত অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। দাবিকারীদের মতে, নুরুল ইসলামের চাকরিজীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তাঁর নিজের, পরিবারের সদস্যদের ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ব্যাংক হিসাব এবং সম্পদের উৎস আইনগতভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। বৈধ আয়ের সঙ্গে লেনদেনের সামঞ্জস্য, অস্বাভাবিক জমা, নগদ লেনদেন ও কথিত ঠিকাদারি অর্থের প্রবাহ এর আওতায় আসবে। একই সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকারী ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের ভূমিকা, প্রকল্পের ব্যয়ের সঙ্গে কোনো অস্বাভাবিক আর্থিক সম্পর্ক আছে কি না, তাও দেখতে হবে। অবশ্যই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ প্রযোজ্য বিধিবিধান মেনে এবং যথাযথ আইনগত অনুমোদন নিয়ে এই অনুসন্ধান চালাতে হবে।

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া এই সেচ প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ, বিল পরিশোধ ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কথিত পাঁচ কোটি টাকার কাজের দরপত্র, ঠিকাদার নির্বাচন, অনুমোদিত ব্যয় ও অগ্রগতির নথি পরীক্ষার দাবি উঠেছে। কে কোন কাজের জন্য দরপত্রে অংশ নিয়েছেন, কার্যাদেশ কে পেয়েছেন, কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশেষ করে ৫০ লাখ টাকার কথিত লেনদেনের সঙ্গে কোনো কার্যাদেশ বা আর্থিক সিদ্ধান্তের যোগসূত্র আছে কি না, সেটিই নির্ধারণের মূল প্রশ্ন।

এদিকে আসামি আলমগীর আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন বলে জানা গেছে। জামিনের পর বাদীপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি সমঝোতার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু অভিযোগ যদি সত্যিই একজন সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির মতো গুরুতর হয়, তবে ব্যক্তিগত সমঝোতায় তার নিষ্পত্তি কতটা আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে যদি মামলা সাজানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও তদন্তে উন্মোচিত হওয়া দরকার। নিরপরাধ কাউকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি যেমন মেনে নেওয়া যায় না, তেমনি সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলা বা হত্যার হুমকির অভিযোগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ফয়সল যোগাযোগ করলে জানান, প্রচলিত বিধিবিধান ও আইন অনুসরণ করে নিরপেক্ষভাবে মামলাটির তদন্ত চলছে এবং নির্ধারিত সময়ে ফলাফল আদালতে দাখিল করা হবে।

সব মিলিয়ে ঘটনাটি আর একটি থানার মামলার গণ্ডিতে আটকে নেই। একদিকে সরকারি প্রকৌশলীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ, অন্যদিকে বাদীর নিজের মুখে ঊর্ধ্বতনের চাপের কথা এবং ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের গুরুতর দাবি, এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহির প্রশ্ন। দপ্তরে হামলার ঘটনা সত্যিই ঘটেছিল, নাকি ঠিকাদারি কার্যাদেশ ও অর্থ লেনদেনের বিরোধ থেকেই মামলার জন্ম, বাদী কেন বলছেন তিনি নিজে মামলা করতে চাননি, পাঁচলাইশের বদলে চান্দগাঁওয়ে মামলা হলো কেন, পাঁচলাইশ থানার ভূমিকাই বা কী ছিল, আর দুই ব্যাংকের সিসিটিভিতে কথিত অর্থ জমার সময় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর উপস্থিতির কোনো চিহ্ন মিলবে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তেই মিলতে পারে। তাই মামলার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের পাশাপাশি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া, প্রকল্পের ঠিকাদারি কার্যক্রম, কথিত আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের আইনসম্মত অনুসন্ধান নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পবিপ্রবির পরিবহন বহরে যুক্ত হলো বিআরটিসির দোতলা বাস

পাঁচ কোটির কাজ, ৫০ লাখের লেনদেন, চাপে মামলা: প্রশ্নের মুখে বিএডিসি

আপডেট সময় ১০:৪৪:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামকে হত্যার উদ্দেশ্যে দপ্তরে প্রবেশ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে একটি মামলা এখন নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে। মামলাটি করেছেন বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস। আসামি করা হয়েছে চট্টগ্রামের আবাসন ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীর, তাঁর সহযোগী মো. মনির হোসেন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ছয়-সাতজনকে। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মামলার নেপথ্যে রয়েছে পাঁচ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি কার্যাদেশকে ঘিরে কথিত ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের একটি অভিযোগ, যা পুরো ঘটনাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের চান্দগাঁও থানায় মামলাটি (নম্বর ০৯) দায়ের হয় ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি। এজাহারে ঘটনার তারিখ দেখানো হয়েছে ৪ জানুয়ারি। মামলায় দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৪৩, ৪৪৭, ৪৪৮, ৩২৩ ও ৫০৬ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এজাহারের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামিরা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে দপ্তরের উঁচু দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখান ও প্রাণনাশের হুমকি দেন। দেয়াল টপকে প্রবেশের এই দাবির পক্ষে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথি বা অন্য কোনো দালিলিক প্রমাণ আছে কি না, তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। মামলার তদন্তভার চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ফয়সলের ওপর ন্যস্ত।

মামলার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রথম প্রশ্নটি উঠেছে এখতিয়ার নিয়ে। এজাহারে ঘটনাস্থল হিসেবে পাঁচলাইশ থানাধীন বিএডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তরের ঠিকানা উল্লেখ আছে, অথচ মামলা নেওয়া হয়েছে চান্দগাঁও থানায়। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৬(১) ধারায় থানার স্থানীয় এখতিয়ারের ভিত্তিতে আমলযোগ্য অপরাধ তদন্তের বিধান আছে, আর ১৭৭ ধারায় সাধারণত অপরাধ সংঘটনের এলাকার আদালতেই বিচার ও অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে। অপরাধের স্থান অনিশ্চিত হলে, একাধিক এলাকায় ঘটলে কিংবা ধারাবাহিক প্রকৃতির হলে ১৮২ ধারায় ভিন্ন এলাকার এখতিয়ার খাটতে পারে। কিন্তু এই মামলায় সেরকম কোনো ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। পাঁচলাইশ থানায় আগে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সেখান থেকে চান্দগাঁওয়ে পাঠানো হয়েছিল কি না, নাকি ঘটনার সঙ্গে অন্য এলাকার সংশ্লিষ্টতা ছিল, তা স্পষ্ট নয়। যথাযথ তথ্যপ্রমাণ ছাড়া পাঁচলাইশ থানাকে নিষ্ক্রিয় বলার সুযোগও নেই। দুই থানার রেকর্ড, অভিযোগ গ্রহণের তথ্য ও এখতিয়ারসংক্রান্ত নথি দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে, আর সে জন্য বাদী, সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ ও মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

মামলার পেছনের ঘটনা খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, হাসিমপুরের বাসিন্দা আলমগীরের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের ব্যবসায়িক যোগাযোগ ছিল। আলমগীরের দাবি, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কাজের কার্যাদেশ পাওয়ার আশায় তিনি তিন কিস্তিতে মোট ৫০ লাখ টাকা দিয়েছেন। তাঁর হিসাবে প্রথম কিস্তিতে একজন ঠিকাদারের মাধ্যমে পাঁচ লাখ, পরে সরাসরি ৩৫ লাখ এবং সবশেষ আরও ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার সময় দুজন ঠিকাদার উপস্থিত ছিলেন বলেও তিনি দাবি করেন। আলমগীরের অভিযোগ, টাকা দেওয়ার পরও কার্যাদেশ না মেলায় তিনি একাধিকবার বিষয়টি জানতে চেয়েছেন, তাতেই বিরোধের সূত্রপাত, এবং এর জেরেই তাঁকে ফাঁসাতে মামলাটি করা হয়েছে। তবে এই অর্থ লেনদেন, এর উৎস, গ্রহণকারী ও কথিত কার্যাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি। উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং দরপত্র ও কার্যাদেশের নথি যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বক্তব্য এসেছে খোদ মামলার বাদীর কাছ থেকে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপে সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস দাবি করেন, এ ধরনের মামলা করার ব্যক্তিগত আগ্রহ তাঁর ছিল না; তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের চাপের মুখেই তিনি মামলা করেছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি ঊর্ধ্বতনের চাপে এজাহারে স্বাক্ষর করে থাকেন, তবে সেই চাপের স্বরূপ ও প্রেক্ষাপট কী ছিল, তা জানা জরুরি। বাদীর এই বক্তব্য এজাহারের অভিযোগের সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ এবং তিনি কেন এমন বলছেন, তা-ও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।

আর্থিক অভিযোগের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে চট্টগ্রাম শহরের দুটি ব্যাংক শাখা। অভিযোগ আছে, নুরুল ইসলাম তাঁর দুই-তিনজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে কথিত অর্থ জমার ব্যবস্থা করতেন; কখনো নিজে শাখায় যেতেন, কখনো একান্ত সহকারীদের দিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে পাওয়া টাকা জমা দেওয়াতেন। শাখা দুটির একটি এনসিসি ব্যাংকের কামাল বাজার, অন্যটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মুরাদপুর। অভিযোগের নির্দিষ্ট তারিখ ও লেনদেনের সময় মিলিয়ে এই দুই শাখার সিসিটিভি ফুটেজ দেখা গেলে তাঁর বা তাঁর সহকারীদের উপস্থিতির দৃশ্যমান প্রমাণ মিলতে পারে। তবে শুধু ব্যাংকে উপস্থিতি ঘুষ গ্রহণের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; এর সঙ্গে জমা স্লিপ, জমাদানকারীর পরিচয়, লেনদেনের পরিমাণ, হিসাবধারীর সঙ্গে সম্পর্ক ও ব্যাংকের সংরক্ষিত অন্যান্য নথিও যাচাই করতে হবে। ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর মুছে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় আইনগত প্রক্রিয়ায় দ্রুত তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

নুরুল ইসলাম এসব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে আসছেন। ৫০ লাখ টাকা গ্রহণ, আত্মীয়দের হিসাব ব্যবহার এবং বাদীকে চাপ দেওয়ার প্রতিটি অভিযোগই তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। অভিযোগ বা তাঁর বক্তব্যের সত্যতা নিরূপণে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, ব্যাংক নথি, ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাই একমাত্র পথ।

অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিএডিসির নিজস্ব তদন্ত কর্তৃপক্ষের সমন্বিত অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। দাবিকারীদের মতে, নুরুল ইসলামের চাকরিজীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তাঁর নিজের, পরিবারের সদস্যদের ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ব্যাংক হিসাব এবং সম্পদের উৎস আইনগতভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। বৈধ আয়ের সঙ্গে লেনদেনের সামঞ্জস্য, অস্বাভাবিক জমা, নগদ লেনদেন ও কথিত ঠিকাদারি অর্থের প্রবাহ এর আওতায় আসবে। একই সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকারী ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের ভূমিকা, প্রকল্পের ব্যয়ের সঙ্গে কোনো অস্বাভাবিক আর্থিক সম্পর্ক আছে কি না, তাও দেখতে হবে। অবশ্যই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ প্রযোজ্য বিধিবিধান মেনে এবং যথাযথ আইনগত অনুমোদন নিয়ে এই অনুসন্ধান চালাতে হবে।

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া এই সেচ প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ, বিল পরিশোধ ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কথিত পাঁচ কোটি টাকার কাজের দরপত্র, ঠিকাদার নির্বাচন, অনুমোদিত ব্যয় ও অগ্রগতির নথি পরীক্ষার দাবি উঠেছে। কে কোন কাজের জন্য দরপত্রে অংশ নিয়েছেন, কার্যাদেশ কে পেয়েছেন, কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশেষ করে ৫০ লাখ টাকার কথিত লেনদেনের সঙ্গে কোনো কার্যাদেশ বা আর্থিক সিদ্ধান্তের যোগসূত্র আছে কি না, সেটিই নির্ধারণের মূল প্রশ্ন।

এদিকে আসামি আলমগীর আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন বলে জানা গেছে। জামিনের পর বাদীপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি সমঝোতার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু অভিযোগ যদি সত্যিই একজন সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির মতো গুরুতর হয়, তবে ব্যক্তিগত সমঝোতায় তার নিষ্পত্তি কতটা আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে যদি মামলা সাজানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও তদন্তে উন্মোচিত হওয়া দরকার। নিরপরাধ কাউকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি যেমন মেনে নেওয়া যায় না, তেমনি সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলা বা হত্যার হুমকির অভিযোগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ফয়সল যোগাযোগ করলে জানান, প্রচলিত বিধিবিধান ও আইন অনুসরণ করে নিরপেক্ষভাবে মামলাটির তদন্ত চলছে এবং নির্ধারিত সময়ে ফলাফল আদালতে দাখিল করা হবে।

সব মিলিয়ে ঘটনাটি আর একটি থানার মামলার গণ্ডিতে আটকে নেই। একদিকে সরকারি প্রকৌশলীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ, অন্যদিকে বাদীর নিজের মুখে ঊর্ধ্বতনের চাপের কথা এবং ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের গুরুতর দাবি, এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহির প্রশ্ন। দপ্তরে হামলার ঘটনা সত্যিই ঘটেছিল, নাকি ঠিকাদারি কার্যাদেশ ও অর্থ লেনদেনের বিরোধ থেকেই মামলার জন্ম, বাদী কেন বলছেন তিনি নিজে মামলা করতে চাননি, পাঁচলাইশের বদলে চান্দগাঁওয়ে মামলা হলো কেন, পাঁচলাইশ থানার ভূমিকাই বা কী ছিল, আর দুই ব্যাংকের সিসিটিভিতে কথিত অর্থ জমার সময় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর উপস্থিতির কোনো চিহ্ন মিলবে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তেই মিলতে পারে। তাই মামলার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের পাশাপাশি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া, প্রকল্পের ঠিকাদারি কার্যক্রম, কথিত আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের আইনসম্মত অনুসন্ধান নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।