ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে ও অনলাইন জুয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে হবিগঞ্জের মো. রুবেল মিয়া (৩৭) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ইন্টারনেটভিত্তিক জুয়ার মাধ্যমে বিপুল অপরাধমূলক সাম্রাজ্য গড়ে তোলায় স্থানীয়ভাবে তিনি ‘ক্যাসিনো সম্রাট রুবেল’ নামে পরিচিতি পান। যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ভুয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি ঢাকার পল্টন মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। উক্ত মামলায় রুবেল মিয়াকে অভিযুক্ত করে এশিয়া অঞ্চলে এই প্রতারক চক্রের ‘কান্ট্রি ডিরেক্টর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আইনি পদক্ষেপের পর দুবাই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গত ২ অক্টোবর সন্ধ্যায় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া একটি হত্যা মামলায় পরোয়ানা থাকায় তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয় এবং পরবর্তীতে পল্টন থানার প্রতারণা মামলায় হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দক্ষিণ বিভাগ এই মামলার তদন্ত পরিচালনা করছে। ডিবি সূত্রের মতে, কেবল একটিমাত্র অ্যাপ নয়, রুবেলের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন অ্যাপ চালুর মাধ্যমে এ জুয়া ও প্রতারণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল, যা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান চলছে।
বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জামিন লাভ ও একই অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি দেশের অপরাধ পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সিটি সাইবার ক্রাইম ইউনিট সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অনলাইন জুয়া চক্রের মূল নিয়ন্তা হিসেবে রুবেলকে গ্রেফতার করে এবং আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তবে পরবর্তীতে আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও আগের পদ্ধতিতে অপরাধ নেটওয়ার্ক সচল করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক সময়ের চরম আর্থিক অনটনে থাকা একটি পরিবারের এই অস্বাভাবিক ও অলৌকিক অর্থনৈতিক উত্থান স্থানীয় অধিবাসীদের স্তম্ভিত করেছে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার শরীফপুর গ্রামে রুবেলের পৈতৃক ভিটায় গিয়ে জানা যায়, ২০১২ সালেও তাঁর পিতা আব্দুল লতিফ দিনমজুরের কাজ করতেন। স্থানীয় লস্করপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. উজ্জ্বল জানান, রুবেলের বর্তমান জীবনযাত্রা কোনো রূপকথাকেও হার মানায়। সামান্য চায়ের দোকান পরিচালনা করা এবং দিনমজুরের সন্তানের স্বল্প সময়ে এত সম্পদের মালিক হওয়া কেবল সাইবার অপরাধ ও জুয়ার মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। এই হঠাৎ উত্থান এলাকার উঠতি বয়সী যুবসমাজকেও জুয়ার অনৈতিক পথে ধাবিত করেছে, যা এখন সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এলাকায় দৃশ্যমান সম্পত্তির আনুমানিক মূল্যই শতকোটি টাকার কাছাকাছি, আর সরকারি সংস্থাগুলো গভীরে তদন্ত করলে অদৃশ্যে থাকা আরও কয়েকশ কোটি টাকার সন্ধান পাবে। অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ দুবাইয়ে পাচার করা হয়েছে এবং সেখান থেকেই কার্যক্রম চালানো হতো।
সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ের নথি অনুসন্ধান করে ক্যাসিনো রুবেল ও তাঁর স্বজনদের নামে গত ৫ বছরে কেনা প্রায় শতকোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তির নথিপত্র পাওয়া গেছে। সরকারি নথিতে দেখা যায়, ২০১৯ সালে সুলতানশী মৌজায় ১৬০০ নম্বর দলিলে ৯ শতক, ২০২১ সালে ৩৮২৯ নম্বর দলিলে ১০ শতক, ২০২২ সালে ৭৪১৫ ও ৫১১৫ নম্বর দলিলে যথাক্রমে ৪৬.৮ শতক ও ১০ অযুতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৫৬৩৪ ও ৫৬৩৫ নম্বর দলিলে ২৫ শতক জমি রেজিস্ট্রি করা হয়। এ ছাড়া সুলতানশী মৌজায় রুবেলের নামে ১৫ বিঘা এবং তাঁর ভাই সোহাগসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে আরও ১৭ বিঘা জমির মালিকানা রয়েছে। পাশাপাশি ২০২২ সালে যমুনাবাদ মৌজায় ১৫ শতক (দলিল নং ৪৬১৮), দারিয়া মৌজায় ১ একর ৭৬ শতক এবং ২০২৪ সালে আনন্দপুর পৌরসভা এলাকায় ১১.৭২ শতক জমিসহ একটি আবাসিক ভবন কেনা হয়। স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কটিয়াদী বাজারে ১০ শতক জায়গার ওপর নির্মিত বহু তলা মার্কেট, শ্রীমঙ্গলে পল্লীবিদ্যুৎ সংলগ্ন এলাকায় ৪ তলা বিশিষ্ট চার ইউনিটের ভবন, রেলগেটের নিকট ৩ তলা ভবন, হবিগঞ্জ ইনাতাবাদ এলাকায় ১১ শতক, পুরাতন মুন্সীতে ৮ শতক জমি এবং ১৫ কাঠার ওপর নির্মিত দুটি আলিশান বাড়ি রয়েছে। এছাড়া রাজধানী ঢাকার মতিঝিল ও উত্তরায় একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, পৈতৃক গ্রামে প্রাসাদোপম ভবন, দামী গাড়ি, শ্রীমঙ্গলে শত বিঘার রিসোর্ট এবং দুবাইয়ে হোটেল, সুপার শপ ও ক্যাসিনো ব্যবসার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব স্থাবর সম্পত্তির দলিল ও প্রকৃত মূল্য সক্রান্ত তথ্য সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারীরা।
প্রতারণার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে গত ২৯ সেপ্টেম্বর পল্টন থানায় মামলাটি করেন মো. আকবর হোসেন। মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২২ জুন থেকে ৬ আগস্টের মধ্যে অভিযুক্তরা ‘harrywinstongold.vip’ নামক একটি ভুয়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজেদের একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বাদীর কাছ থেকে মোট ৭০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। এজাহারে ঢাকা ও বিভিন্ন জেলার কয়েকজন সহযোগীর সাথে রুবেলকে এশিয়া অঞ্চলের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন রাজধানীর বাড্ডা এলাকার মো. ইকবাল আশরাফ, গাজীপুরের তাসনুভা নওরীন সানজানা, কুমিল্লার জুয়েল রানা, চুয়াডাঙ্গার মো. সুজন এবং হবিগঞ্জের ময়নুল হাসান।
এই অপরাধ চক্র পরিচালনায় কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত ময়নুল হাসান ওরফে দুলাল স্থানীয়ভাবে রুবেলের অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত এবং তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে সম্প্রতি অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটরের পদ হাতিয়ে নিয়েছিলেন (যা পরবর্তীতে আইন মন্ত্রণালয় বাতিল করে)। অন্যদিকে রুবেলের ভাই মো. সোহাগ মিয়া ওরফে ‘ক্যাসিনো সোহাগ’ বর্তমানে দুবাই অবস্থান করে হুন্ডি, সাইবার জুয়া ও মাদক চোরাচালানের সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রুবেল সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু জাহিরের অর্থ জোগানদাতা হিসেবে কাজ করতেন এবং যুবলীগ নেতা পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন। রুবেলের রাজনৈতিক আশ্রয় এবং চক্রের অন্যান্যদের ভূমিকা প্রসঙ্গে হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জিকে গউছ জানান, সাবেক সরকারি দলের ছত্রছায়াতেই রুবেল এসব অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, বর্তমান সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ছাড় দেবে না এবং দুলালের মতো ব্যক্তিদের অপরাধের দায় দল নেবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























