চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হতে যাওয়া ২০ তলা বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন কর ভবন প্রকল্প ঘিরে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত এবং বর্তমানে কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডিই) নানা জালিয়াতি ও কৌশলের আশ্রয় নিয়ে এই মেগা প্রকল্পের দরপত্র হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি নিয়মকানুন ও নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠানটির এমন আগ্রাসী তৎপরতা সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-৪ গত ১২ মে ৩ বেজমেন্টসহ ২০ তলা কর ভবন নির্মাণে প্রথম দফায় দরপত্র আহ্বান করে, যার আইডি নম্বর ১৩২২৪১৩। নির্ধারিত টেন্ডার ক্যাপাস্টি বা সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল ঘুষ বাণিজ্যের জোরে ওই প্রক্রিয়ায় কাজ বাগানোর শেষ চেষ্টা চালায় এনডিই। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পর্যন্ত এনডিইকে কাজটি দেওয়ার প্রস্তাব চলে যায়। তবে শেষ মুহূর্তে সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে জোরালো লেখালেখি এবং জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ পেলে মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়ে প্রথম দফার ওই টেন্ডারটি সম্পূর্ণ বাতিল করে নতুন করে আহ্বান করার নির্দেশ দেয়।
প্রথম দফার দরপত্র বাতিল হওয়ার পর গত ৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় আবারও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-৪। সরাসরি অংশ নেওয়ার আইনি যোগ্যতা না থাকায় এনডিই এবার ভিন্ন কৌশল নেয়। নিজেদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান খোকন কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের (কেসিইএল) সঙ্গে একটি বিশেষ জয়েন্ট ভেঞ্চার এগ্রিমেন্ট বা যৌথ উদ্যোগের চুক্তি করে তারা কেসিইএল-জেভি নামে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। পুরনো কায়দায় প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করে আবারও মন্ত্রণালয়ে এই ছায়া প্রতিষ্ঠানটিকে বিজয়ী করার সুপারিশপত্র পৌঁছে দিতে সক্ষম হয় এনডিই। ইতোমধ্যে এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে।
দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার যৌথ উদ্যোগের মূল চুক্তিপত্র পর্যালোচনা করলে এনডিই’র নানা জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রথম দফার দরপত্রে অযোগ্যতা ও জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় এনডিই এমনিতেই দ্বিতীয় দফায় অংশ নেওয়ার অধিকার হারায়। তদুপরি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় ডেসকো কর্তৃক দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণেও তাদের কোনো সরকারি দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। তা সত্ত্বেও সরকারি সব বিধিবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অভিনব উপায়ে এই মেগা প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পায়তারা চলছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রভাব এবং দলীয় পরিচয়ের জোর খাটিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এনডিই’র বিরুদ্ধে। বিশাল অঙ্কের ব্যাংক লোন নিলেও তাদের কাজের মান বর্তমানে প্রশ্নবিদ্ধ এবং নিম্নমুখী। ডেসকোর একটি কাজ সময়মতো শেষ করতে না পারার কারণে সরকার তাদের কালো তালিকাভুক্ত করলেও সেই তথ্য অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে গোপন রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অন্তত ৫টি সরকারি দপ্তরের অসাধু প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে কালো তালিকাভুক্ত অবস্থাতেই আরও শত শত কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছে বিতর্কিত এই প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনডিইর দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অত্যন্ত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে এই টেন্ডারও বাতিল করা হতে পারে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় বদ্ধপরিকর বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, সাধারণ ঠিকাদার ও উন্নয়ন বিশ্লেষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে বছরের পর বছর ধরে সিন্ডিকেট তৈরি করে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। রাজনৈতিক লবিং ও দুর্নীতির আশ্রয়ে অন্যান্য সৎ ঠিকাদারদের বঞ্চিত করার পাশাপাশি সরকার ও সাধারণ জনগণের সঙ্গেও একপ্রকারের প্রতারণা করা হয়েছে। অবিলম্বে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ ও জোরালো তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন তারা। কালো তালিকাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কোন ৫ জন প্রকৌশলী কত টাকার বিনিময়ে এনডিইকে এই কাজের সুপারিশ করলেন, তা নিয়ে খুব শীঘ্রই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























