ঢাকা ওয়াসা যেন অলৌকিক শক্তির কেন্দ্রস্থল, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও কিছু কর্মকর্তার দাপট ও ভাগ্যরেখা থাকে চির অপরিবর্তিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে যার দাপটে তটস্থ থাকত ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, পটপরিবর্তনের পরও সেই একই কর্মকর্তা সমান প্রভাবে আসীন রয়েছেন নিজের জায়গায়। বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানকে ঘিরে এখন ওয়াসার সর্বস্তরে চলছে জোর গুঞ্জন— ঠিক কোথায় তাঁর অদম্য শক্তির উৎস? দিনের পর দিন পদোন্নতি ও ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের জমাট বাঁধা ক্ষোভ এখন রূপ নিয়েছে এক উন্মুক্ত অসন্তোষে।
রাজনীতির পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যখন দুর্নীতিবাজদের অপসারণের হাওয়া বইছিল, ঠিক তখনই এক অলৌকিক ইশারায় গুরুত্বপূর্ণ পদের টিকিট বাগিয়ে নেন এই কর্মকর্তা। অভিযোগ উঠেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২৩৫ কোটি টাকার ‘অফসাইট পানি সরবরাহ সুবিধাদি স্থাপন’ প্রকল্পের পরিচালক পদে অত্যন্ত গোপনে ও প্রশাসনিক নীতি ভঙ্গ করে বসানো হয়েছে তাঁকে। ঢাকা ওয়াসার বহুল বিতর্কিত সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত মিজানুর রহমান কীভাবে বিএনপি আমলের বর্তমান প্রেক্ষাপটেও এমন বহাল তবিয়তে রয়েছেন, তা নিয়ে জনমনে ও দফতরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে নজিরবিহীন অনিয়মের চিত্র। ২০১৬ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা স্পষ্ট পরিপত্রে আট সদস্যের একটি নিরপেক্ষ নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে চূড়ান্ত তিনজনের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই করে পরিচালক নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু নিয়মকানুনকে তোয়াক্কা না করে কোনো নিয়োগ কমিটি কিংবা সংক্ষিপ্ত তালিকা ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও তৎকালীন অপসারণকৃত এমডি আব্দুস সালাম বেপারীর যোগসাজশে বেআইনিভাবে এই নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ফলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পের শীর্ষ পদে বসানো হয় এমন একজনকে, যার নিয়োগের পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে বেআইনি ভিতের ওপর।
মিজানুর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর নেপথ্য গল্পও বেশ রোমাঞ্চকর। ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আব্দুল জলিলের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তিনি প্রথম ঘনিষ্ট হন বিতর্কিত সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের। পাশাপাশি নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করতেন ‘চুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা’ পরিচয়টি। এই রাজনৈতিক কার্ডগুলো সফলভাবে খেলে তিনি বাগিয়ে নেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর লোভনীয় পদ। বিগত সরকারের সময়ে সবসময় পছন্দসই পোস্টিং ও একের পর এক প্রকল্পের দায়িত্বে থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্ত ও সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে।
সরকার পরিবর্তনের পর যখন সততা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রশাসনে পদোন্নতি বঞ্চিতদের মূল্যায়নের কথা ছিল, তখন উল্টো রাজনৈতিক ছদ্মবেশ ও অবৈধ অর্থের প্রভাবে মিজানুর রহমানের ক্ষমতার দাপট টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় চরম ক্ষুব্ধ বঞ্চিত কর্মকর্তারা। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অপেক্ষাকৃত জোষ্ঠ অফিসারদের টপকে একজন স্বৈরাচারী শাসনের সুবিধাভোগীকে রূপপুরের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় প্রকল্পে পুনর্বাসিত করায় ওয়াসা প্রশাসনের ভেতর এক ধরণের দমবন্ধ পরিবেশ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এসব গুরুতর অভিযোগ ও বেআইনি নিয়োগের বিষয়ে তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানতে ঢাকা ওয়াসা কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে মুখে কুলুপ আঁটেন প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান। পরবর্তীতে আবারও যোগাযোগ করা হলে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন সব প্রশ্ন। শেষমেশ সরাসরি উত্তর না দিয়ে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে এক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (ডিএমডি) কথা বলার দায়িত্ব দিয়ে দায় সারেন তিনি। ওয়াসার ডিএমডি ও অন্য এক প্রকল্পের পরিচালক আজিজুর রহমান পান্না এই অনিয়মের বিষয়ে জানান, পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে দেখা হবে এবং তদন্তে সত্যতা মিললে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আমাদের মার্তৃভূমি ডেস্ক : 
























