মুষলধারে টানা বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকককে ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন নগরীর গভর্নর। দেশটির আবহাওয়া দপ্তর চলতি সপ্তাহান্তজুড়ে তীব্র বজ্রপাতসহ ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস বজায় রাখায় পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে মোড় নিয়েছে।
গত ৪৮ ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ মিলিমিটার (১২ ইঞ্চি) বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর ফলে শহরের প্রধান সড়কগুলো কার্যত নদী ও খালে পরিণত হয়েছে। প্রধান সড়কগুলোতে বহু যানবাহন অর্ধেক নিমজ্জিত অবস্থায় আটকে পড়েছে এবং নগরবাসীকে বাধ্য হয়ে কোমরপানি ভেঙে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
সংকটজনক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিথিপুন্ট সতর্কবার্তা জারি করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামোর বিপুল ক্ষতি হতে পারে। তিনি আরও জানান, শহরের খালসংলগ্ন এলাকাগুলোতে বন্যার তাণ্ডব সবচেয়ে মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও বিপন্ন মানুষের সুরক্ষায় থাই সেনাবাহিনী ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করেছে। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র ও ফিল্ড কিচেন বা ভ্রাম্যমাণ রান্নাঘর স্থাপন করছে। পাশাপাশি ব্যাংকক মেট্রোপলিটন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিএমএ) শহরের স্থানীয় স্কুলগুলোকে সাময়িক থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে এবং বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলতে অনুরোধ জানিয়েছে।
ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটার জন্য সুপারমার্কেটগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ও হুড়োহুড়ি দেখা গেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আতঙ্ক প্রকাশ করে ১৯ বছর বয়সী তরুণ সানসুক লাওওয়াচ্চারাকুল জানান, তিনি চরম চিন্তার মধ্যে আছেন, কারণ আগে থেকে কোনো খাবার প্রস্তুত বা মজুত রাখা সম্ভব হয়নি। জীবনে প্রথমবার মা-বাবাকে ছাড়া একা এমন একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় তিনি বেশ শঙ্কিত।
উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় শনিবার সরকারের পক্ষ থেকে খালসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের অবিলম্বে বাসাবাড়ির প্রয়োজনীয় মালামাল ও আসবাবপত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি বিশেষ জরুরি নির্দেশিকা জারি করা হয়।
সরকারি আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে কিছুটা বিলম্বে সচেতন হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন প্লাবিত একটি কনডমিনিয়াম থেকে সপরিবারে লাগেজ হাতে বেরিয়ে আসা ব্যাংককের স্থানীয় বাসিন্দা সুপ্পাকার্ন জুলাভিজিতফং। তিনি জানান, সতর্কতা জারি করার আগে পর্যন্ত স্থান পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার মতো সচেতনতা তার ছিল না। ফলে এখন হঠাৎ করে চরম বিপাকে পড়তে হয়েছে।
জলজটের চরম ভোগান্তির মধ্যেও থাইল্যান্ডের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সুবর্ণভূমিতে ফ্লাইট পরিচালনা স্বাভাবিক রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। তবে দেশের পর্যটন কর্তৃপক্ষ সব আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় যাত্রীর সুবিধার্থে যেকোনো ভ্রমণ পরিকল্পনায় অতিরিক্ত দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় হাতে রেখে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডে গত নভেম্বর মাসেই বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা হয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে আঘাত হানা সেই বিপর্যয়ে অন্তত ১৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং হাজার হাজার বসতবাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেটির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার খোদ রাজধানী ব্যাংকক ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ল।
সূত্র: রয়টার্স
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 























