ঢাকা ০২:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ফেরার পথ তৈরি করছে জামায়াত: রাশেদ খাঁন বোরহানউদ্দিনে মাদকের আস্তানায় পুলিশের হানা, ৮৫ গ্রাম গাঁজা-মোবাইলসহ ধরা খেলো নাছির! সোহাগের রহস্যজনক মৃত্যু: তালেবের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন? মাদক-জুয়া থেকে কথিত অর্থ লেনদেন, মুগদা ফাঁড়ি ঘিরে গুরুতর অভিযোগ বাসাইলের বাসুলিয়ায় দ্রুতগতির মোটরসাইকেলের ধাক্কায় নারী পথচারীর মৃত্যু ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালান শ্রীপুর উপজেলা ও পৌর প্রশাসন বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী বাধ্য হয়ে জনগণের অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমেছি : শফিকুর রহমান চড়া দামে মাছ-মুরগি-ডিম, বাড়তি দামেও তেলের সংকট ইতালির বিমানবন্দরে যাত্রীর ব্যাগে মিলল মমি করা কুমিরের মাথা
দুই যুগেও সরেনি চেয়ার

রেলওয়ের ২য় শ্রেণির কর্মচারী লুৎফা বেগমের ‘অলৌকিক রাজত্ব 

অফিসে যাতায়াত করেন তিন হাজার সিসির বিলাসবহুল টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার ডাবল কেবিন পিকআপে। অথচ তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তার (সিপিও) কার্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারী। নাম লুৎফা বেগম।

একই দপ্তরে টানা ২৩ বছর চাকরি, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, সহকর্মীদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারের অভিযোগ, অস্বাভাবিক সম্পদ এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিতর্ক-সব মিলিয়ে তাঁকে ঘিরে সংস্থাটির ভেতরে-বাইরে এখন নানা প্রশ্ন।

রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, ২০০৪ সালে সিপিও (পূর্ব) কার্যালয়ে যোগ দেন লুৎফা বেগম। এরপর ২০২৬ সাল পর্যন্ত কোনো বদলি ছাড়াই তিনি একই পদে বহাল রয়েছেন।

সাধারণত বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক প্রয়োজনে বদলি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও দুই যুগের কাছাকাছি সময় তাঁর এক জায়গায় অবস্থান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সহকর্মীরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনের নীরবতার কারণে অনেক সময় কিছু কর্মচারী প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। পরে তাঁরা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে অবস্থান ধরে রাখেন, যা চাকরির শৃঙ্খলার পরিপন্থী।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের এই অবস্থানের সুযোগে তিনি সেখানে একটি শক্তিশালী নিজস্ব বলয় গড়ে তুলেছেন। বদলি, নিয়োগ, পেনশন, সাময়িক বরখাস্তসংক্রান্ত ফাইল, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও টিএলআর নিয়োগসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে তাঁর প্রভাব রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, বিশেষ করে সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে তিনি নিজের অবস্থান পোক্ত করেন।

অতীতে সহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগে তাঁকে দু’বার শোকজ করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাবে তা বাতিল হয়।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাঁর প্রভাব কমেনি বরং রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয়ের সহায়তায় তিনি সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

লুৎফা বেগমের আর্থিক সঙ্গতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্বল্প বেতনের চাকরি করলেও তাঁর ও পরিবারের নামে একাধিক স্থাবর সম্পত্তির অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের হালিশহরের কৃষ্ণচূড়া অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর দুটি ফ্ল্যাট, নালাপাড়াসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় সম্পত্তি, ঢাকায় বাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতে উল্লেখযোগ্য সম্পদ রয়েছে।

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাঁর কার্যালয়ে যাতায়াতের ব্যবহৃত টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার পিকআপটি (ঢাকা মেট্রো-ঠ-১১-৩৫৪৪)।

বিআরটিএ-র তথ্যমতে, ২০০১ সালে নিবন্ধিত গাড়িটির মালিক ঢাকা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (রমনা সড়ক ভবন)।

সওজ-এর সহকারী বৃক্ষপালনবিদ হিসেবে কর্মরত লুৎফার স্বামী রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমে দাবি করেন, গাড়িটি তাঁর নামে বরাদ্দ এবং অফিশিয়াল কাজ শেষে সময় পেলে তিনি স্ত্রীকে আনা-নেওয়ার জন্য এটি ব্যবহার করতে দেন।

তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সওজ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহে আরেফীন গণমাধ্যমকে জানান, সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের কর্মকর্তারা সাধারণত পুলের গাড়ি ব্যবহার করেন, ব্যক্তিগত গাড়ি কেবল দপ্তর প্রধানদের জন্য বরাদ্দ থাকে।

ফলে এক দপ্তরের গাড়ি অন্য দপ্তরের কর্মচারী কীভাবে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে লুৎফা বেগমের মুঠোফোনে কল ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ইমোজি দিয়ে তা এড়িয়ে যান।

তবে এর আগে অপর একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, আমি জানি কে এসব পাঠিয়েছে। একটি পক্ষ পদোন্নতির আশায় আমাকে সরানোর চক্রান্ত করছে। আল্লাহর অলৌকিক শক্তি ছাড়া কোনো অশুভ শক্তি আমাকে সরাতে পারবে না। আমার প্রশাসন আমাকে ভালোভাবে চেনে।

রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করছেন, দীর্ঘ ২৩ বছর একই দপ্তরে অবস্থান, আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য এবং সরকারি গাড়ির অপব্যবহারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ফেরার পথ তৈরি করছে জামায়াত: রাশেদ খাঁন

দুই যুগেও সরেনি চেয়ার

রেলওয়ের ২য় শ্রেণির কর্মচারী লুৎফা বেগমের ‘অলৌকিক রাজত্ব 

আপডেট সময় ০৪:১৮:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অফিসে যাতায়াত করেন তিন হাজার সিসির বিলাসবহুল টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার ডাবল কেবিন পিকআপে। অথচ তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তার (সিপিও) কার্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারী। নাম লুৎফা বেগম।

একই দপ্তরে টানা ২৩ বছর চাকরি, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, সহকর্মীদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারের অভিযোগ, অস্বাভাবিক সম্পদ এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিতর্ক-সব মিলিয়ে তাঁকে ঘিরে সংস্থাটির ভেতরে-বাইরে এখন নানা প্রশ্ন।

রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, ২০০৪ সালে সিপিও (পূর্ব) কার্যালয়ে যোগ দেন লুৎফা বেগম। এরপর ২০২৬ সাল পর্যন্ত কোনো বদলি ছাড়াই তিনি একই পদে বহাল রয়েছেন।

সাধারণত বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক প্রয়োজনে বদলি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও দুই যুগের কাছাকাছি সময় তাঁর এক জায়গায় অবস্থান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সহকর্মীরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনের নীরবতার কারণে অনেক সময় কিছু কর্মচারী প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। পরে তাঁরা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে অবস্থান ধরে রাখেন, যা চাকরির শৃঙ্খলার পরিপন্থী।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের এই অবস্থানের সুযোগে তিনি সেখানে একটি শক্তিশালী নিজস্ব বলয় গড়ে তুলেছেন। বদলি, নিয়োগ, পেনশন, সাময়িক বরখাস্তসংক্রান্ত ফাইল, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও টিএলআর নিয়োগসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে তাঁর প্রভাব রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, বিশেষ করে সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে তিনি নিজের অবস্থান পোক্ত করেন।

অতীতে সহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগে তাঁকে দু’বার শোকজ করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাবে তা বাতিল হয়।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাঁর প্রভাব কমেনি বরং রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয়ের সহায়তায় তিনি সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

লুৎফা বেগমের আর্থিক সঙ্গতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্বল্প বেতনের চাকরি করলেও তাঁর ও পরিবারের নামে একাধিক স্থাবর সম্পত্তির অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের হালিশহরের কৃষ্ণচূড়া অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর দুটি ফ্ল্যাট, নালাপাড়াসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় সম্পত্তি, ঢাকায় বাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতে উল্লেখযোগ্য সম্পদ রয়েছে।

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাঁর কার্যালয়ে যাতায়াতের ব্যবহৃত টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার পিকআপটি (ঢাকা মেট্রো-ঠ-১১-৩৫৪৪)।

বিআরটিএ-র তথ্যমতে, ২০০১ সালে নিবন্ধিত গাড়িটির মালিক ঢাকা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (রমনা সড়ক ভবন)।

সওজ-এর সহকারী বৃক্ষপালনবিদ হিসেবে কর্মরত লুৎফার স্বামী রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমে দাবি করেন, গাড়িটি তাঁর নামে বরাদ্দ এবং অফিশিয়াল কাজ শেষে সময় পেলে তিনি স্ত্রীকে আনা-নেওয়ার জন্য এটি ব্যবহার করতে দেন।

তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সওজ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহে আরেফীন গণমাধ্যমকে জানান, সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের কর্মকর্তারা সাধারণত পুলের গাড়ি ব্যবহার করেন, ব্যক্তিগত গাড়ি কেবল দপ্তর প্রধানদের জন্য বরাদ্দ থাকে।

ফলে এক দপ্তরের গাড়ি অন্য দপ্তরের কর্মচারী কীভাবে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে লুৎফা বেগমের মুঠোফোনে কল ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ইমোজি দিয়ে তা এড়িয়ে যান।

তবে এর আগে অপর একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, আমি জানি কে এসব পাঠিয়েছে। একটি পক্ষ পদোন্নতির আশায় আমাকে সরানোর চক্রান্ত করছে। আল্লাহর অলৌকিক শক্তি ছাড়া কোনো অশুভ শক্তি আমাকে সরাতে পারবে না। আমার প্রশাসন আমাকে ভালোভাবে চেনে।

রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করছেন, দীর্ঘ ২৩ বছর একই দপ্তরে অবস্থান, আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য এবং সরকারি গাড়ির অপব্যবহারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।