সংবাদ শিরোনাম ::
সরকারের উচ্চপদস্থদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ পোস্ট, গ্রেপ্তার ৬ ‘অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান ৬০ শতাংশের বেশি করতে হবে : শিল্পমন্ত্রী একাধিক দুর্নীতি মামলার আসামি তবুও সিডিএর ক্ষমতাধর কর্মকর্তা হাসান! পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আইওএম মিশন প্রধানের বৈঠক দুই মাস পর আবারও শুরু চাল বিতরণ, সুবিধা পাচ্ছে ১৭ হাজার পরিবার বরগুনায় চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সভা-২০২৬ অনুষ্ঠিত পানি প্রকল্পে ১০ কোটি টাকার লুট, কাজের আগেই কোটি টাকার বিল উত্তোলন একটি ঘরের অপেক্ষায় অসহায় রাসেল মন্ডল পরিবার-প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবন ১৬ জুলাইকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ডেটার স্বাধীনতা ও আস্থা বাড়াতে হবে : পরিকল্পনামন্ত্রী

আমার চোখে দেখা শাপলা চত্বরের ভয়াবহতা

  • সফিউল বাসার
  • আপডেট সময় ০৬:২৭:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
  • ১০৬৭ বার পড়া হয়েছে

২০১৩ সালের ৫ মে—বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক দিন, যা শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের দিন, এক অস্থির রাষ্ট্রবাস্তবতার নগ্ন প্রতিফলন। আমি সেই দিনের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এখনো চোখ বন্ধ করলে ভেসে ওঠে সেই বিকেল, সেই দৌড়ঝাঁপ, সেই আতঙ্কিত মুখগুলো, আর এক অদৃশ্য মৃত্যুভয়ের ছায়া।
আমি তখন দাউদকান্দি এলাকায় অবস্থান করছিলাম। কয়েকদিন ধরেই দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, বিশেষ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী-এর রায় ঘোষণার পর থেকে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মীয় আবেগ, আর সংগঠিত আন্দোলনের মিশ্রণে দেশ যেন ধীরে ধীরে বিস্ফোরণের দিকে এগোচ্ছিল। এরই মধ্যে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর উত্থান সেই অস্থিরতাকে নতুন মাত্রা দেয়।
৪ মে আমি ঢাকায় আসি, পল্টন-এ চারদলীয় জোটের কর্মসূচিতে যোগ দিতে। সেখানে খালেদা জিয়া-এর বক্তব্য শুনে আবার ফিরে যাই। কিন্তু পরদিন কী ঘটতে যাচ্ছে, তার একটা পূর্বাভাস যেন বাতাসেই ছিল।
৫ মে সকাল থেকেই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। যান চলাচল প্রায় বন্ধ, রাস্তা অবরুদ্ধ, চারদিকে মানুষের ঢল। তবুও আমি দাউদকান্দি থেকে বাসে উঠে কাঁচপুর পর্যন্ত আসি। এরপর আর কোনো যানবাহন না পেয়ে হেঁটেই রওনা দিই মতিঝিল-এর দিকে। আমার মতো অসংখ্য মানুষ তখন একই পথে—কেউ কৌতূহল নিয়ে, কেউ সমর্থনে, কেউ বা শুধুই ঘটনাস্থলের দিকে আকৃষ্ট হয়ে।
চিটাগাং রোড থেকে শুরু করে সানারপাড়, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী—প্রতিটি মোড়ে থমথমে উত্তেজনা। গাছের ডাল ফেলে রাস্তা বন্ধ, কোথাও আগুন জ্বলছে, কোথাও মিছিল ছুটছে। স্লোগানে আকাশ ভারী, আর মানুষের চোখে এক অদ্ভুত আগুন—যেখানে প্রতিবাদ আছে, কিন্তু একই সঙ্গে আছে অজানা ক্রোধ।
শেষ পর্যন্ত আমি পৌঁছাই শাপলা চত্বর। এটি সাধারণত দেশের আর্থিক কেন্দ্র, কিন্তু সেদিন সেটি আর কোনো স্বাভাবিক জায়গা ছিল না—পুরো এলাকা যেন এক দমবন্ধ করা রণক্ষেত্র। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
প্রথমে মিছিল, স্লোগান, অবস্থান—সবকিছু যেন নিয়ন্ত্রিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বায়তুল মোকাররমের উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে শুরু হয়ে পল্টন মোড়, দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। একদিকে ছুটে আসছে মিছিল, অন্যদিকে ধাওয়া, তারপরই ইট-পাটকেলের বৃষ্টি। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ বিশৃঙ্খলায় ভরে যায়।
আমি নিজের চোখে দেখেছি—মানুষ দৌড়াচ্ছে, কেউ পড়ে যাচ্ছে, কেউ আবার তাকে টেনে তুলছে। হঠাৎ পাশেই একজন মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। কয়েকজন তাকে তুলে নিয়ে দৌড়ে গেল—কোথায় নিয়ে গেল, জানি না। সেই দৃশ্যটা আজও আমার মনে গেঁথে আছে। এটা আর কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ ছিল না—এটা ছিল বেঁচে থাকার লড়াই।
সময় যত গড়াচ্ছিল, ভয়াবহতা তত বাড়ছিল। চারপাশে শুধু শব্দ—চিৎকার, স্লোগান, বিস্ফোরণের মতো আওয়াজ, আর মানুষের ছুটোছুটি। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল ধোঁয়া আর আতঙ্কে। আমি নিজেও কয়েকবার এমন পরিস্থিতিতে পড়েছি, যেখানে মনে হয়েছে—এই বুঝি আর বাঁচা হবে না।
বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ চরমে পৌঁছায়। চারদিক থেকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়া জনতা, আর মাঝখানে পড়ে থাকা অসংখ্য আহত মানুষ—এই দৃশ্য কোনোভাবেই স্বাভাবিক ছিল না। এমনকি কোথাও কোথাও মানুষ আশ্রয়ের জন্য দোকান, ভবন কিংবা মসজিদের ভেতরে ঢুকে পড়ছিল।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ভয় যেন আরও ঘনীভূত হয়। আলো কমে আসে, কিন্তু উত্তেজনা কমে না। বরং অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে। তখন মনে হচ্ছিল—চারপাশে কী ঘটছে, তা কেউই পুরোপুরি জানে না। কে কোথায়, কে বেঁচে আছে, কে আহত—সবকিছুই অনিশ্চিত।
সেই সময়টাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ তখন আর কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না—না আন্দোলনকারীদের, না সাধারণ মানুষের। সবাই যেন নিজ নিজ বাঁচার পথ খুঁজছিল। চারপাশে আতঙ্ক এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, মানুষ একে অপরকে ঠেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল, শুধু নিরাপদ কোনো জায়গায় পৌঁছানোর আশায়।
এই অবস্থায় আমি উপলব্ধি করি—এখানে আর থাকা নিরাপদ নয়। সিদ্ধান্ত নিই ফিরে যাওয়ার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও সহজ ছিল না। কারণ বের হওয়ার পথটাই তখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও সাহস করে হেঁটে রওনা দিই সায়েদাবাদের দিকে।
সেই হাঁটাটা ছিল জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ হাঁটা। প্রতিটি পদক্ষেপে ভয়—কোথাও আবার সংঘর্ষ শুরু হবে না তো? কোথাও আটকে পড়ব না তো? পথের প্রতিটি মুখ যেন আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি।
অবশেষে সায়েদাবাদে পৌঁছে একটি বাস পাই। রাত তখন প্রায় নয়টা। মনে হচ্ছিল—এবার হয়তো একটু স্বস্তি মিলবে। কিন্তু সেই রাতের ভয়াবহতা তখনো শেষ হয়নি।
বাসটি যখন মেঘনা ব্রিজ-এর কাছে পৌঁছায়, হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যে বাসের ভেতরে চিৎকার শুরু হয়ে যায়। আমার মনে হচ্ছিল—আজকের দিনটা এখানেই শেষ হয়ে যাবে, আর আমি হয়তো আর কখনো বাড়ি ফিরতে পারব না।
কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল। বাসটি কোনোভাবে ব্রিজ পার হয়ে একটি পাম্পের কাছে গিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। বড় ধরনের দুর্ঘটনা হয়নি, কিন্তু সেই মুহূর্তের আতঙ্ক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সেই দিনটি আমাকে শিখিয়েছে—ভয় কাকে বলে, অনিশ্চয়তা কাকে বলে, আর জীবনের মূল্য কতটা গভীর। শাপলা চত্বরের সেই অভিজ্ঞতা শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার স্মৃতি নয়; এটি এক মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আজও যখন সেই দিনের কথা মনে পড়ে, মনে হয়—মানুষ কত সহজেই সহিংসতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, আর কত দ্রুত একটি শহর, একটি সমাজ অচেনা হয়ে যেতে পারে। সেই দিনের ভয়াবহতা আমাকে এখনো তাড়া করে ফেরে।
এটি ছিল এমন এক দিন, যখন ঢাকা শহর শুধু উত্তাল ছিল না—ভীত, বিধ্বস্ত এবং অনিশ্চিত ছিল। আর আমি ছিলাম সেই ভয়ের ভেতরে আটকে থাকা এক সাধারণ মানুষ, যে শুধু বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছিল—অলৌকিকভাবে।

 

-লেখক: এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকারের উচ্চপদস্থদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ পোস্ট, গ্রেপ্তার ৬

আমার চোখে দেখা শাপলা চত্বরের ভয়াবহতা

আপডেট সময় ০৬:২৭:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬

২০১৩ সালের ৫ মে—বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক দিন, যা শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের দিন, এক অস্থির রাষ্ট্রবাস্তবতার নগ্ন প্রতিফলন। আমি সেই দিনের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এখনো চোখ বন্ধ করলে ভেসে ওঠে সেই বিকেল, সেই দৌড়ঝাঁপ, সেই আতঙ্কিত মুখগুলো, আর এক অদৃশ্য মৃত্যুভয়ের ছায়া।
আমি তখন দাউদকান্দি এলাকায় অবস্থান করছিলাম। কয়েকদিন ধরেই দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, বিশেষ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী-এর রায় ঘোষণার পর থেকে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মীয় আবেগ, আর সংগঠিত আন্দোলনের মিশ্রণে দেশ যেন ধীরে ধীরে বিস্ফোরণের দিকে এগোচ্ছিল। এরই মধ্যে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর উত্থান সেই অস্থিরতাকে নতুন মাত্রা দেয়।
৪ মে আমি ঢাকায় আসি, পল্টন-এ চারদলীয় জোটের কর্মসূচিতে যোগ দিতে। সেখানে খালেদা জিয়া-এর বক্তব্য শুনে আবার ফিরে যাই। কিন্তু পরদিন কী ঘটতে যাচ্ছে, তার একটা পূর্বাভাস যেন বাতাসেই ছিল।
৫ মে সকাল থেকেই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। যান চলাচল প্রায় বন্ধ, রাস্তা অবরুদ্ধ, চারদিকে মানুষের ঢল। তবুও আমি দাউদকান্দি থেকে বাসে উঠে কাঁচপুর পর্যন্ত আসি। এরপর আর কোনো যানবাহন না পেয়ে হেঁটেই রওনা দিই মতিঝিল-এর দিকে। আমার মতো অসংখ্য মানুষ তখন একই পথে—কেউ কৌতূহল নিয়ে, কেউ সমর্থনে, কেউ বা শুধুই ঘটনাস্থলের দিকে আকৃষ্ট হয়ে।
চিটাগাং রোড থেকে শুরু করে সানারপাড়, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী—প্রতিটি মোড়ে থমথমে উত্তেজনা। গাছের ডাল ফেলে রাস্তা বন্ধ, কোথাও আগুন জ্বলছে, কোথাও মিছিল ছুটছে। স্লোগানে আকাশ ভারী, আর মানুষের চোখে এক অদ্ভুত আগুন—যেখানে প্রতিবাদ আছে, কিন্তু একই সঙ্গে আছে অজানা ক্রোধ।
শেষ পর্যন্ত আমি পৌঁছাই শাপলা চত্বর। এটি সাধারণত দেশের আর্থিক কেন্দ্র, কিন্তু সেদিন সেটি আর কোনো স্বাভাবিক জায়গা ছিল না—পুরো এলাকা যেন এক দমবন্ধ করা রণক্ষেত্র। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
প্রথমে মিছিল, স্লোগান, অবস্থান—সবকিছু যেন নিয়ন্ত্রিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বায়তুল মোকাররমের উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে শুরু হয়ে পল্টন মোড়, দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। একদিকে ছুটে আসছে মিছিল, অন্যদিকে ধাওয়া, তারপরই ইট-পাটকেলের বৃষ্টি। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ বিশৃঙ্খলায় ভরে যায়।
আমি নিজের চোখে দেখেছি—মানুষ দৌড়াচ্ছে, কেউ পড়ে যাচ্ছে, কেউ আবার তাকে টেনে তুলছে। হঠাৎ পাশেই একজন মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। কয়েকজন তাকে তুলে নিয়ে দৌড়ে গেল—কোথায় নিয়ে গেল, জানি না। সেই দৃশ্যটা আজও আমার মনে গেঁথে আছে। এটা আর কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ ছিল না—এটা ছিল বেঁচে থাকার লড়াই।
সময় যত গড়াচ্ছিল, ভয়াবহতা তত বাড়ছিল। চারপাশে শুধু শব্দ—চিৎকার, স্লোগান, বিস্ফোরণের মতো আওয়াজ, আর মানুষের ছুটোছুটি। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল ধোঁয়া আর আতঙ্কে। আমি নিজেও কয়েকবার এমন পরিস্থিতিতে পড়েছি, যেখানে মনে হয়েছে—এই বুঝি আর বাঁচা হবে না।
বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ চরমে পৌঁছায়। চারদিক থেকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়া জনতা, আর মাঝখানে পড়ে থাকা অসংখ্য আহত মানুষ—এই দৃশ্য কোনোভাবেই স্বাভাবিক ছিল না। এমনকি কোথাও কোথাও মানুষ আশ্রয়ের জন্য দোকান, ভবন কিংবা মসজিদের ভেতরে ঢুকে পড়ছিল।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ভয় যেন আরও ঘনীভূত হয়। আলো কমে আসে, কিন্তু উত্তেজনা কমে না। বরং অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে। তখন মনে হচ্ছিল—চারপাশে কী ঘটছে, তা কেউই পুরোপুরি জানে না। কে কোথায়, কে বেঁচে আছে, কে আহত—সবকিছুই অনিশ্চিত।
সেই সময়টাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ তখন আর কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না—না আন্দোলনকারীদের, না সাধারণ মানুষের। সবাই যেন নিজ নিজ বাঁচার পথ খুঁজছিল। চারপাশে আতঙ্ক এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, মানুষ একে অপরকে ঠেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল, শুধু নিরাপদ কোনো জায়গায় পৌঁছানোর আশায়।
এই অবস্থায় আমি উপলব্ধি করি—এখানে আর থাকা নিরাপদ নয়। সিদ্ধান্ত নিই ফিরে যাওয়ার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও সহজ ছিল না। কারণ বের হওয়ার পথটাই তখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও সাহস করে হেঁটে রওনা দিই সায়েদাবাদের দিকে।
সেই হাঁটাটা ছিল জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ হাঁটা। প্রতিটি পদক্ষেপে ভয়—কোথাও আবার সংঘর্ষ শুরু হবে না তো? কোথাও আটকে পড়ব না তো? পথের প্রতিটি মুখ যেন আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি।
অবশেষে সায়েদাবাদে পৌঁছে একটি বাস পাই। রাত তখন প্রায় নয়টা। মনে হচ্ছিল—এবার হয়তো একটু স্বস্তি মিলবে। কিন্তু সেই রাতের ভয়াবহতা তখনো শেষ হয়নি।
বাসটি যখন মেঘনা ব্রিজ-এর কাছে পৌঁছায়, হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যে বাসের ভেতরে চিৎকার শুরু হয়ে যায়। আমার মনে হচ্ছিল—আজকের দিনটা এখানেই শেষ হয়ে যাবে, আর আমি হয়তো আর কখনো বাড়ি ফিরতে পারব না।
কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল। বাসটি কোনোভাবে ব্রিজ পার হয়ে একটি পাম্পের কাছে গিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। বড় ধরনের দুর্ঘটনা হয়নি, কিন্তু সেই মুহূর্তের আতঙ্ক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সেই দিনটি আমাকে শিখিয়েছে—ভয় কাকে বলে, অনিশ্চয়তা কাকে বলে, আর জীবনের মূল্য কতটা গভীর। শাপলা চত্বরের সেই অভিজ্ঞতা শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার স্মৃতি নয়; এটি এক মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আজও যখন সেই দিনের কথা মনে পড়ে, মনে হয়—মানুষ কত সহজেই সহিংসতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, আর কত দ্রুত একটি শহর, একটি সমাজ অচেনা হয়ে যেতে পারে। সেই দিনের ভয়াবহতা আমাকে এখনো তাড়া করে ফেরে।
এটি ছিল এমন এক দিন, যখন ঢাকা শহর শুধু উত্তাল ছিল না—ভীত, বিধ্বস্ত এবং অনিশ্চিত ছিল। আর আমি ছিলাম সেই ভয়ের ভেতরে আটকে থাকা এক সাধারণ মানুষ, যে শুধু বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছিল—অলৌকিকভাবে।

 

-লেখক: এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক।