জনরোষ থেকে বাঁচতে অতিথি ডটকমের মূল হোতা প্রতারক সাইফুল ইসলাম সোহেল আত্মগোপনে চলে গেছে। সদলবলে শিগগির দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২৯ ও ৩০ জুন দুই পর্বে এ চক্রের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশাসনের টনক নড়েছে। বিভিন্ন ক্যাটাগরির শত শত ভুক্তভোগী সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে, কোনোভাবে যেন এ চক্রের কোনো সদস্য দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এম তানভীর আহমেদ মঙ্গলবার বলেন, ‘সরকার যেখানে এমএলএম ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছে, সেখানে ই-কমার্সের নামে এ ধরনের ব্যবসা করার সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, ইতোমধ্যে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। যদি কোনো ভুক্তভোগী লিখিতভাবে অভিযোগ নিয়ে আসে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।’
এদিকে ধারাবাহিক প্রতিবেদন থামাতে সমাজের একশ্রেণির সুবিধাবাদী লোকজন কোটি টাকার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে। সূত্র জানায়, যারা এই প্রতারকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে তদবির করছেন, তারাও অতিথি ডটকমের সুবিধাভোগী।
সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে ই-কমার্সের আড়ালে বৈধ মালটি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা শুরু করে নোভেরা প্রোডাক্টস লিমিটেড। এই কোম্পানির মালিকই অতিথি ডটকমের বর্তমান সিইও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রতারক সাইফুল ইসলাম সোহেল। বিনিয়োগ নেওয়ার নামে ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে তিনি হাতিয়ে নেন শতকোটি টাকা।
শুরুতে বিনিয়োগে আগ্রহীদের বিভিন্ন ধরনের লোভ দেখিয়ে বলা হতো-নোভেরা ই-কমার্স বা সরাসরি মার্কেটিংয়ের প্রতিষ্ঠান। এখানে বিনিয়োগ করলে প্রোডাক্টস, কমিশন ও মাসিক বেতন দেওয়া হবে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা প্রায় তিন বছর আগে বিনিয়োগ করেও এখন পর্যন্ত কোনো টাকা বা কমিশন ফেরত পাননি। উলটো টাকা চাইতে গেলে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে তাদের বের করে দেওয়া হয়। বরিশাল বানাড়িপাড়ার বাসিন্দা এফআই মানিক জানান, ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নোভেরা প্রোডাক্টস লিমিটেডের ডিওএইচএসের অফিসে বসে ৪৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। মানিক ছাড়াও মো. মনির হোসেন ৯ লাখ ৫০ হাজার, মো. ইয়াকুব ইসলাম সুমন ১১ লাখ, মো. জাহিদ মিয়া ৭ লাখ, মো. সম্রাট রেজা রবিন ৬ লাখ, মো. শাহিন ৭ লাখ, মো. মোস্তাফিজুর রহমান ৪ লাখ, ইফতেখার আহম্মেদ সুমন ১০ লাখ, আসাদুজ্জামান আসাদ ৬ লাখ, মো. সিফাতুল্লাহ সালেহী সাড়ে ৩ লাখ, মো. তাজুল ইসলাম ১২ লাখ, হামিম আহসান ২ লাখ, মো. শহিদুল ইসলাম লাইস ২ লাখ, মো. রাজু আহম্মেদ ২ লাখ টাকাসহ আরও অনেকে বিনিয়োগ করেছিলেন। এসব তথ্য পুলিশের তদন্ত রিপোর্টে সংরক্ষিত আছে।
এদিকে ভুক্তভোগীদের মধ্যে কামরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি প্রতিবেদককে বলেন, নোভেরা প্রোডাক্টসের প্রতারণা নিয়ে পল্লবী থানায় মামলা হওয়ার পর ২০১৯ সালে সাইফুল ইসলাম সোহেল গ্রেফতার হন। কিন্তু কিছু দিন পর আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যান। দশ বছর অতিবাহিত হলেও আজও আমরা এক টাকাও ফেরত পাইনি। উলটো এই সোহেল নতুন করে প্রতারণার দোকান খুলে এখন হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। তার অফিসে চাকরি করেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব, ডিআইজি, ব্রিগেডিয়ার ও মেজর জেনারেলসহ অনেক বড় মাপের লোকজন। তাই এখন তার খুঁটির জোর অনেক। তবে তিনি যে কোনো মুহূর্তে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। ইতোমধ্যে বর্তমান বিনিয়োগকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছেন। এছাড়া প্রতিকার দাবি করে তারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগও করছেন।
পুলিশ প্লাজার সামনে দেখা মেলে এমন বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর। টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে নাম প্রকাশ না করে তারা জানান, বর্তমানে নোভেরার ভুক্তভোগীরা যখন সাইফুলের নতুন অফিস ‘অতিথি ডটকম’-এ গিয়ে পাওনা টাকা দাবি করেন, তখন তাদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেককে হুমকি দেওয়া হয় এই বলে যে, ‘পুরোনো কথা ভুলে যাও, নতুন কোম্পানিতে লোক ঢোকাও, তবেই টাকা তুলতে পারবে।’ অর্থাৎ নিজের টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আরও দশজন মানুষের টাকা মারার ব্যবস্থা করতে বলা হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট বলা আছে, বাংলাদেশে সরাসরি বা পরোক্ষ কোনো ধরনের এমএলএম ব্যবসা করা যাবে না। বিশেষ করে যেখানে সদস্য অন্তর্ভুক্তিই আয়ের প্রধান উৎস, সেটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘অতিথি ডটকম’ বুকিং সেবার আড়ালে যা করছে তা শতভাগ এমএলএম। ইতোমধ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫০ হাজার এজেন্ট তৈরি করেছে। এজেন্ট হওয়ার জন্য নির্ধারিত ফিস দিতে হয় ২ হাজার ৫০০ টাকা। একই সঙ্গে ১০ হাজার টাকার সহযোগী উদ্যোক্তা প্যাকেজও কিনতে হয়। এ হিসাবে মোট টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬৩ কোটি টাকা।
এই বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘অতিথি ডট কমের প্রতারণা সম্পর্কে আমি এইমাত্র অবহিত হলাম। ২০১৫ সালের পর বাংলাদেশে কোনো এমএলএম কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তাই আইন অনুযায়ী বর্তমানে কোনো বৈধ এমএলএম কোম্পানির অস্তিত্ব নেই। যেহেতু অতিথি ডটকম পর্দার আড়ালে নিষিদ্ধ এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করছে, বিষয়টি দ্রুত মন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করব এবং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সমাজবিজ্ঞানী ড. রেজা তৌফিক বারির মতে, বাংলাদেশের বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতি মানুষকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের নেশায় অন্ধ করে দেয়। সাইফুলদের মতো প্রতারকরা জানে কীভাবে মানুষের এই দুর্বলতাকে ব্যবহার করতে হয়। তারা মানুষকে স্বপ্ন দেখায় ‘আপনি ঘুমালেও আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হবে।’ এই ‘প্যাসিভ ইনকাম’-এর ধারণাটি যখন একজন বেকার যুবকের কানে পৌঁছায়, তখন সে তার শেষ সম্বলটুকু বা পরিবারের জমি বিক্রি করে এখানে বিনিয়োগ করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অর্গানাইজড ক্রাইম টিম সূত্রে জানা গেছে, সাইফুলের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে তারা তথ্য সংগ্রহ করছেন। এর আগে নোভেরা প্রোডাক্টসের সময় সাইফুলের ব্যবহৃত গাড়ি ও কম্পিউটার জব্দ করা হয়েছিল, কিন্তু যথাযথ আইনি তদারকির অভাবে তিনি আবার মুক্ত হয়ে একই কাজ শুরু করেছেন। ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, এখনই ‘অতিথি ডটকম’-এর এই বিশাল জাল গুঁড়িয়ে দেওয়া না হয়, তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের ধস নামাবে বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে ভয়াবহ। ডেসটিনির সময় মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারিয়েছিল, নতুন এই ‘অতিথি ডটকম’-এর ছোবলে আবারও একই পরিণতি হবে আমানতকারীদের।
সাইফুল ইসলাম সোহেলের বক্তব্য : প্রকাশিত তিন পর্বের রিপোর্টে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গত রোববার তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ করছি-কোনো অভিযোগ সত্য নয়। অতিথি ডটকমের সুনাম ও আমাকে হেয় করার জন্য মহলবিশেষ এসব ছড়াচ্ছে।’ তাকে কয়েকটি মামলায় দুই দফায় গ্রেফতার করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এগুলো আমার ব্যক্তিগত বিষয়। এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না।’ এরপর আর কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সরাসরি দেখা করে কথা বলতে জোর অনুরোধ জানান। প্রতিবেদক তাকে অফিসে এসে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি আসতে চাননি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 















