দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রশিক্ষণ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে এক নারী উপপরিচালকের (ডিডি) সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক, স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের প্রতিকার ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে দুদক সচিব সাইদুর রহমান খানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন তাঁর স্ত্রী নাজমীন সুলতানা। এ নিয়ে সংস্থাটির ভেতরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
অভিযোগপত্রে নাজমীন সুলতানা দাবি করেছেন, তাঁর স্বামীর সঙ্গে দুদকের ওই নারী উপপরিচালকের সম্পর্কের কারণে তাঁদের ২০ বছরের দাম্পত্য জীবন সংকটের মুখে পড়েছে। বিষয়টির প্রতিবাদ করায় তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। পাশাপাশি সন্তানদের নিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নারী উপপরিচালককে দুদক থেকে অন্যত্র বদলি করা হলেও প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে পুনরায় প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।
এ ছাড়া জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ওই নারী কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের নথি নিয়ন্ত্রণ, পছন্দমতো প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন নাজমীন সুলতানা।
আবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, গত ১৫ মে ওই নারী উপপরিচালকের জন্মদিন উপলক্ষে দাপ্তরিক কাজের অজুহাতে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলের রেস্তোরাঁ বুকিং দেওয়া এবং মূল্যবান উপহার দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ১৪ ফেব্রুয়ারি ও মে মাসের ছুটির সময়ে দাপ্তরিক সফরের আড়ালে শ্রীমঙ্গল ও কক্সবাজারের বিলাসবহুল রিসোর্টে সময় কাটানোর অভিযোগও করা হয়েছে।
নাজমীন সুলতানার অভিযোগ, স্বামীর সঙ্গে ওই কর্মকর্তার সম্পর্কের প্রতিবাদ করায় তাঁকে একাধিকবার শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানসিক নির্যাতন ও সন্তানদের নিয়ে হুমকির শিকার হতে হয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এদিকে, চলতি বছরের মার্চে নাজমুল হাসান দুদকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মামলা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের নামে মামলা নেই—এমন ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করেন তিনি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সমালোচনার মুখে ওই ছাড়পত্র প্রত্যাহার করা হলেও এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং পরবর্তী সময়ে পরিচালক থেকে নাজমুল হাসান দুদকের প্রশিক্ষণ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান।
এ ছাড়া জানা গেছে, নাজমুল হাসানের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে। অতীতে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের লোক হিসেবে পরিচয় দিতেন। এ ছাড়া দুদকে আব্দুল হামিদের দুর্নীতির অনুসন্ধান আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কাতার দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্বও পালন করেছেন।
প্রতিবেদক অভিযোগের বিষয়ে জানতে দুদকের ওই নারী উপপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এড়িয়ে যান। মুঠোফোনে তিনি বলেন, আমি দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা নই। আমি আপনার সঙ্গে এই মুহূর্তে এই বিষয়ে কিছু বলব না, পরে সুযোগ হলে বলব।
স্ত্রীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মহাপরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, আমাকে বলেছেন সচিব স্যার। আমার কমেন্ট করার কিছু নেই। আমি আলহামদুলিল্লাহ পারিবারিকভাবে ভালো আছি। স্ত্রীকে জানিয়েছি, সে এমন কোনো অভিযোগ দেয়নি।
মহাপরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসানের স্ত্রীর নামে অভিযোগ দায়েরের বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, অভিযোগপত্রে আবেদনকারীর স্বাক্ষর নেই। দেখে মনে হচ্ছে এটা সঠিক নয়। তবে আমরা এটা দেখব কী করা যায়।
এদিকে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সদস্য মো. মাজেদুল হক বলেন, যারা দুর্নীতি দমনে কাজ করবেন, তারাই যদি নৈতিক বা আইনিভাবে সমালোচিত হন, তাহলে বিষয়টি ভালো দেখায় না এবং স্বাভাবিক কাজ ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন নাও হতে পারে। এসব বিষয়ে দুদককে আরও সচেতন ও সতর্ক হওয়া জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























