লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগর আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রায় দেড়শ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। লক্ষ্মীপুর-চর আলেকজান্ডার-সোনারপুর সড়কের কমলনগরের হাজিরহাট থেকে আলেকজান্ডারের আজাদনগর পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার সড়ক দুই পাশে আড়াই ফুট প্রশস্তকরণে দরপত্র আহ্বান করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। যৌথ উদ্যোগের (জয়েন্ট ভেঞ্চার) দরপত্রে সর্বনিম্নে ১৪৬ কোটি ৪৭ লাখ ১১ হাজার টাকা দর উল্লেখ করে কাজটি পায় আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও রিমি নির্মাণ লিমিটেড। তবে অভিযোগ উঠেছে, চুক্তি লঙ্ঘন করে প্রধান বা লিড পার্টনার রিমি নির্মাণ লিমিটেডকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা আবদুল হাইয়ের প্রতিষ্ঠান আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডকে অনৈতিকভাবে কাজের অনুমোদন দিয়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম।
দরপত্রের পর মূল লিড পার্টনার হিসেবে রিমি নির্মাণ লিমিটেডের কাছেই কাজের সমস্ত কার্যক্রম ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার নিয়ম ছিল। কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম নিয়ম বহির্ভূতভাবে গত ১২ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কেবল আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডকে কাজ শুরুর অনুমোদন প্রদান করেন। বিষয়টি জানতে পেরে চুক্তিভঙ্গের দায়ে যৌথ উদ্যোগের সব চুক্তি বাতিলের আবেদন জমা দেন রিমি নির্মাণ লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল হক সরকার। একই সঙ্গে কোনো একক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যেন আদেশের পর কাজ করার সুযোগ না দেওয়া হয়, সে বিষয়েও তিনি প্রকৌশলী বরাবর দরখাস্ত করেন। কিন্তু সড়ক ও জনপথ বিভাগের উক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী সকল নিয়ম তোয়াক্কা না করে অসৎ সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী ও যুবলীগ নেতা আবদুল হাইকে কাজ চালানোর সুবিধা করে দিয়েছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন অপকর্ম ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে। গত ৫ আগস্টের পর জুলাই হত্যা মামলাসহ একাধিক সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় তিনি অভিযুক্ত হন এবং বিভিন্ন মেয়াদে জেলও খাটেন। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার বদরপুর গ্রামের হাজী গুনাগাজী ব্যাপারী বাড়ির মো. ইউনূছ মিয়ার ছেলে আবদুল হাই বর্তমানে ঢাকার শান্তিনগরের পীর সাহেবের গলিতে বসবাস করেন। যৌথভাবে কাজ করার দরপত্রে অংশগ্রহণকালে তিনি যুবলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার মতো সংবেদনশীল তথ্য গোপন করেছিলেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রিমি নির্মাণ লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক সরকার জানান, দরপত্রে জয়েন্ট ভেঞ্চারে যৌথভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাজ পাওয়ার পর থেকে আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড আচমকা যোগাযোগের বাইরে চলে যায়। প্রতিষ্ঠানটির কোনো কর্মকর্তা সড়ক ও জনপথ বিভাগের চিঠি পাওয়া সত্ত্বেও যোগাযোগ না করায় দায়িত্বপ্রাপ্ত লিড পার্টনার হিসেবে রিমি নির্মাণ লিমিটেড পুরো প্রক্রিয়াটির কার্যক্রম একাই এগিয়ে নেয়। দীর্ঘ ৪২ দিন নিখোঁজ থাকার পর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আবদুল হাই জুলাই হত্যাকাণ্ডের একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। ওবায়দুল হক সরকার প্রশ্ন তোলেন, একজন পলাতক বা গ্রেপ্তারকৃত জুলাই মামলার আসামির সঙ্গে কীভাবে লিড পার্টনারকে বাদ দিয়ে সড়ক বিভাগ মেগা প্রকল্পের অনৈতিক ডিল করে এবং ভবিষ্যতে কাজের মানে কোনো গলদ থাকলে সেই দায় রিমি নির্মাণ লিমিটেড কেন নেবে। তাই আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশ এনে প্রকৌশলী নজরুল ইসলামকে চিঠি প্রদান করা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আবদুল হাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। অপরদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে লক্ষ্মীপুর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম দাবি করেন, কাজ পাওয়ার পরপরই দুই পক্ষ ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই চুক্তিতে সুস্পষ্টভাবে বলা ছিল যে যাবতীয় অফিসিয়াল বিষয় এবং ব্যাংকিং সংক্রান্ত সব দেনাপাওনা পরিচালনা করবে আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। ফলে সেই স্ট্যাম্প চুক্তির বিধি মেনেই আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার কাজ পরিচালনা করছে এবং সরকারি অনিয়মের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















