“সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু আমলারা বহাল তবিয়তে থেকে যায়।” বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে এই বাক্যটি যেন এক ধ্রুব সত্য। ক্ষমতার পালাবদল হলেও সুবিধাবাদী আমলারা সব সময়ই নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজেদের জায়গা ঠিক করে নেন। সুযোগসন্ধানী আমলাতন্ত্রের ঠিক তেমনই এক নিখুঁত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার রমজান খান।
পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর। ক্ষমতার দাপট কতটা প্রবল হলে একজন থানা পর্যায়ের কর্মকর্তা (সাব-রেজিস্ট্রার) সরাসরি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ডিনারে অংশ নিতে পারেন, তা সহজেই অনুমেয়। প্রশাসনের স্তরবিন্যাসে একজন সাব-রেজিস্ট্রার এবং একজন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার দূরত্ব বিশাল। কিন্তু রমজান খানের ক্ষেত্রে সেই দূরত্ব ঘুচে গিয়েছিল তার অদৃশ্য রাজনৈতিক সংযোগ ও ক্ষমতার প্রভাবের কারণে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই টেবিলে বসে নৈশভোজ করা প্রমাণ করে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের অন্দরমহলে তার শেকড় কতদূর বিস্তৃত ছিল।
সময়ের পরিক্রমায় গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে, সরকারের পতন ঘটেছে, কিন্তু রমজান খানের মতো সুবিধাভোগী আমলাদের পতন হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গতকালও যিনি শেখ হাসিনা ও আনিসুল হকের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ক্ষমতার চূড়ান্ত স্বাদ গ্রহণ করেছেন, আজ তিনি ভোল পাল্টে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের এই কর্মকর্তা বর্তমানে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আইনবিষয়ক নেতৃত্বের ছত্রছায়ায় অত্যন্ত নিরাপদে বহাল রয়েছেন এবং মুন্সিগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পতিত হাসিনা সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নির্বাচনী এলাকা আখাউড়া উপজেলায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে আইনমন্ত্রীর মাধ্যমে বিগত ১৫ বছর দেশের শীর্ষস্থানীয় অফিসগুলোতে পোস্টিং নিয়ে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ও প্রচুর অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন মুন্সিগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রার মোঃ রমজান খান। বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তার সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে BRSA সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের আড়ালে তিনি নিবন্ধন অধিদপ্তরে নানাবিধ বদলি, নিয়োগ, পদোন্নতি বাণিজ্য এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই বিরতিহীন বদলি বাণিজ্য ঠেকাতে গত বছর মে মাসে আইন উপদেষ্টা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন এক ভুক্তভোগী। এতে দেশের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ আওয়ামী ক্যাডার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্যের গডফাদার রমজান খানের দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বদলি বাণিজ্য করে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করা হয়। বাংলাদেশ নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীনস্থ কর্মরত কর্মচারীদের পক্ষে দায়ের করা ওই অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার জেলা রেজিস্ট্রার মোঃ রমজান খান দীর্ঘদিন সাব-রেজিস্ট্রার পদে চাকরি করে দেশের লোভনীয় স্টেশনগুলোতে দুহাতে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। ২০০৪ সালে সাব-রেজিস্ট্রার পদে চাকরিতে যোগদান করেন। সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে আওয়ামী লীগের ক্যাডার পরিচয় দিয়ে তাঁর বাড়ি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নির্বাচনী এলাকা আখাউড়া উপজেলায় হওয়ার সুবাদে তিনি আইনমন্ত্রীর মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় অফিসগুলোতে বদলি হয়ে কোটিপতি বনে যান।
ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের ক্যাডার ছিলেন। সেই সুবাদে প্রথমে জেল পুলিশ হিসেবে বিভিন্ন জেলে চাকরি করেছেন। সর্বশেষ যশোর জেলে বন্দীদের অত্যাচার করে টাকা আদায় করার অভিযোগে তাঁর চাকরি চলে গেলে সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেন। তারপরই রমজান খানের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। তিনি নরসিংদী সদর, কালামপুর, ফতুল্লা, গুলশান, নেত্রকোনা সদর ও মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত থেকে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্য করে দুহাতে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। আর ওই টাকা বিনিয়োগ করেছেন তাঁর শ্যালকের মাধ্যমে লন্ডন, মালয়েশিয়া ও দুবাইতে। তাঁর দুবাই, লন্ডন ও মালয়েশিয়ায় রয়েছে প্রায় অর্ধ ডজন বাড়ি।
আওয়ামী সরকারের পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক দলের ভোল পাল্টে রাতারাতি হয়ে যান বিএনপি নেতা। শুরু করেন তদবির বাণিজ্য ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিএনপির কমিটি গঠনের দায়িত্ব। আওয়ামী দোসরদের প্রতিষ্ঠিত করতে কয়েকশ আওয়ামী চিহ্নিত কর্মীকে বিএনপিতে যোগদান করিয়ে এবং তাদের রক্ষা করেন। নিজে বিএনপির খাস লোক পরিচয় দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার পদ থেকে জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতি নিয়ে অবৈধভাবে একই জেলার জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন তদবিরের মাধ্যমে। যা বিধিবহির্ভূত।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর মামলাবাণিজ্যও করেন এই সুচতুর জেলা রেজিস্ট্রার রমজান খান। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গত ১৭ বছরে যত বদলি বাণিজ্য সংঘটিত হয়েছে, তার সিংহভাগই বদলিতে নেপথ্য ভূমিকা রেখেছেন রমজান খান। আইন মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ যুগ্ম সচিব বিকাশ কুমার সাহার ডান হাত হিসেবে বদলি বাণিজ্য পাকাপোক্ত করতেই তিনি গুলশান-১-এর গ্লোরিয়া জিন্স হোটেলটি বেছে নিয়েছিলেন। সেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যার পরেই বসত রমজান খানের সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রার, অফিস সহকারীদের বদলি বাণিজ্যের হাট।
চট্টগ্রাম সদর, গুলশান, শ্যামপুর, কেরানীগঞ্জ, গজারিয়া, রূপগঞ্জ, কাপাসিয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর সদর, রাঙ্গুনিয়া, কক্সবাজার সদর, পটিয়া, নোয়াখালী সদর, টাঙ্গাইল সদর, নবাবগঞ্জ, মধুপুর, ঘাটাইল, ত্রিশাল, কান্দিরপাড়, ফুলপুর, খিলগাঁওসহ দেড় শতাধিক সাব-রেজিস্ট্রার বদলি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন গত ১ বছরে। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় দুই কর্মকর্তাসহ কতিপয় সাব-রেজিস্ট্রারকে সঙ্গে নিয়ে রমজান খান এক সিন্ডিকেট গঠন করে এ বদলি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন অবলীলাক্রমে।
নীলফামারী জেলার জলঢাকা সাব-রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান মোল্লাকে চট্টগ্রাম সদর অথবা রূপগঞ্জে বদলির কথা বলে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন রমজান খান। পরে তাঁকে বদলির আদেশ করান সীতাকুণ্ডে। আরও অতিরিক্ত বেশি টাকা পেয়ে রূপগঞ্জ ও চট্টগ্রাম সদরে অন্যদের বদলি করান। পরবর্তীতে আনডিউ বদলির দোহাই দিয়ে ৬০ লাখ টাকা নিয়ে সীতাকুণ্ডের বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবিবের বদলির আদেশ বাতিল করেন। সাব-রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান মোল্লার টাকাগুলো আত্মসাৎ করেন জেলা রেজিস্ট্রার রমজান খান।
বদলি বাণিজ্যের গডফাদার রমজান খান মুন্সিগঞ্জ জেলা থেকে এখন ঢাকা জেলার তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে বদলি হয়ে আসবেন ও ঢাকার জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। একজন আওয়ামী ক্যাডার ও দেশের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ জেলা রেজিস্ট্রার বিদেশে অর্থ পাচারকারী যদি ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে বদলি হয়ে আসেন, তাহলে ঢাকা জেলার ২২টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসই দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, এমনিতেই রমজান খানের ৩০ জন ব্যক্তিগত দালাল রয়েছে সারাদেশে। যারা প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অফিসে দলিল ধরে জোর করে সাব-রেজিস্ট্রারদের দলিল করতে বাধ্য করছে। তার মধ্যে যদি রমজান খান ঢাকায় যোগদান করেন, তাহলে ঘুষ, দুর্নীতি, দলিল বাণিজ্য ও অনিয়ম বেড়ে যাবে কয়েক গুণ বেশি। তাই ঢাকা জেলা সহ সমস্ত রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সজুড়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে এখন রমজান আতঙ্ক বিরাজ করছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, রমজান খানের রয়েছে গুলশানে নামে-বেনামে ৩০টি ফ্ল্যাট ও প্লট বুকিং করা। গুলশান নিকেতনে তিনি সপরিবারে বসবাস করছেন। আখাউড়াতে রয়েছে তাঁর কয়েকশ একর জমি। ব্যাংকে রয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। দুর্নীতিবাজ ও বদলি বাণিজ্যের গডফাদার রমজান খানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয় লিখিত ওই অভিযোগে। তবে অদৃশ্য কারণে রমজান খানকে এখনো বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি, বরং তিনি রয়েছেন খোশমেজাজে বহাল তবিয়তে।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান এমপির হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ভুক্তভোগী জনগণ।
রমজান খানের এই রূপান্তর কেবল একজন ব্যক্তির সুবিধাবাদের চিত্র নয়; এটি আমাদের পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। যারা বিগত দিনে ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ফুলেফেঁপে উঠেছেন, তারা যদি আজ নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ে নিজেদের অতীত মুছে ফেলে ফের পুনর্বাসিত হন, তবে সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন কেবল অধরাই থেকে যাবে। রাজনীতির মাঠের পরিবর্তন তখনই সার্থক হবে, যখন প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা এমন সুবিধাবাদীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















