জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) ১১০ কোটি টাকারও বেশি অর্থমানের দুটি পৃথক কেনাকাটায় দরপত্র জালিয়াতি, অনিয়ম ও ভাগাভাগির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত কোনো শাস্তি বা জরিমানা ছাড়াই মামলা দুটি নিষ্পত্তি করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। শুধু তা-ই নয়, কমিশনের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পর গঠিত উচ্চপর্যায়ের একটি সরকারি তদন্ত কমিটিও প্রশাসনিক পর্যায় থেকে অনিয়মে অভিযুক্তদের রেহাই দিয়ে ইতি টেনেছে পুরো প্রক্রিয়ার।
সংগৃহীত তথ্য ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা বাইপাস করে এই দুটি কেনাকাটার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবে তদন্তে একের পর এক নজিরবিহীন অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রমাণ মেলা সত্ত্বেও কেবল অভিযোগকারী পক্ষগুলোর মামলা প্রত্যাহারের দোহাই দিয়ে কমিশন অভিযুক্তদের কঠোর কোনো শাস্তির আওতায় আনেনি।
এর মধ্যে সর্ববৃহৎ অনিয়মটি ঘটে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ওএমআর ফরম ও উত্তরপত্র কেনার কার্যাদেশে। উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির (ওটিএম) কথা বলে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও পরবর্তীতে সেখানে যুক্ত করা হয় কঠোর ও বৈষম্যমূলক শর্ত। ১০৮ কোটি ৫৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিশাল এই কাজটি নিয়মবহির্ভূতভাবে দুটি লটে ভাগ করে নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দিতে দরদাতার সংখ্যা কৃত্রিমভাবে কমিয়ে ফেলা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দাপ্তরিক মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি উপাচার্য ড. এ. এস. এম. আমানুল্লাহ, ট্রেজারার ড. এ. টি. এম. জাফরুল আজম এবং প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে দরপত্র জালিয়াতি সংগঠিত হয়। প্রতিযোগিতা কমিশন স্বয়ং তাদের অনুসন্ধানে আইনের ১৫ (১) ও (২) ধারার মারাত্মক লঙ্ঘনের প্রমাণ পেলেও গত ৮ জানুয়ারি অভিযোগকারী সংগঠন মামলা না চালানোর আবেদন জানালে পুরো বিষয়টি ধামাচাপ পড়ে যায় এবং কমিশন অভিযুক্তদের কেবল ‘ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার পরামর্শ’ দিয়েই দায় সারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) জন্য এক হাজার মোটরসাইকেল ক্রয়ের ১৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার কার্যাদেশেও একই ধরনের অনিয়মের ছায়া দেখা যায়। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিআরইবির ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল সরবরাহকারী হিসেবে কার্যাদেশ পায় দুটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, যাদের নিজেদের কোনো সংযোজন বা উৎপাদন ক্ষমতা ছিল না।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং সরকারি ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিএমটিএফ) প্রতিযোগিতা কমিশনে মামলা করলেও পরবর্তীতে অদ্ভুতভাবে তারাও মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করে। গত ২০ অক্টোবর কমিশন সেই আবেদন মঞ্জুর করে এবং সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষকে শাস্তির মুখোমুখি না করে কেবল প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার মৌখিক বার্তা দিয়ে তদন্তের ইতি টানে।
নজিরবিহীন এই অনিয়মের অভিযোগ সামাল দিতে পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. দেলোয়ার হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে সেই কমিটিও কমিশনের দায়মুক্তির সিদ্ধান্তকেই বহাল রেখে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটিতে (বিপিপিএ) প্রতিবেদন দাখিল করে, যা নিয়ে এখন উঠেছে স্বার্থের সংঘাত ও অনৈতিক সুবিধা লেনদেনের মারাত্মক অভিযোগ।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপরাধীদের পার পাইয়ে দিতে মূল ভূমিকা রাখেন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন সেই বিতর্কিত প্রক্রিয়াকেই প্রশাসনিক বৈধতা প্রদান করেন। যদিও অভিযুক্ত কর্মকর্তা এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে সম্পূর্ণ বিধি মেনেই কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, অন্যদিকে কমিশনের সদস্যের দাবি, বেনামী অভিযোগ ও মূল অভিযোগকারীর অনুপস্থিতির কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























