রাজধানীর ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দৈনিক মজুরিভিত্তিক বা নামমাত্র পদে কর্মরত অতিরিক্ত উমেদারদের দীর্ঘদিনের আধিপত্য এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলিল নিবন্ধন-সংক্রান্ত কাজে দলিল লেখক, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষকে সহায়তা করার কথা থাকলেও এই উমেদারদের ইশারায় সাব-রেজিস্ট্রাররা দলিল রেজিস্ট্রি কিংবা তা থেকে বিরত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রারদের সংরক্ষিত খাসকামরায় কাঙ্ক্ষিত ঘুষ লেনদেন হলে অনেক অসাধ্য সাধন হয়। তথ্য অনুযায়ী, উমেদার মো. আশিক উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে এই অফিসের ঘুষের টাকা সংগ্রহ এবং সিন্ডিকেট পরিচালনায় মূল ভূমিকা পালন করে আসছেন। একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে দলিলদাতা ও গ্রহীতাদের জিম্মি করে বড় অঙ্কের ঘুষ আদায় করাই তার মূল লক্ষ্য। যখনই কোনো নতুন সাব-রেজিস্ট্রার এই অফিসে পদায়ন পান, তখনই এই সিন্ডিকেট তাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে বা নিজেদের বলয়ে যুক্ত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। উমেদারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নতুন কর্মকর্তাকে প্রলুব্ধ করে বা প্রশাসনিক জাল বিছিয়ে সিন্ডিকেটের ধারা বজায় রাখতে তৎপরতা বাড়ান, যার উদ্দেশ্য একটাই—কর্মকর্তাকে সামনে রেখে আড়ালে নিজেদের অবৈধ আয়ের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা।
উমেদার আশিকের নিয়ন্ত্রণাধীন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন জমির শ্রেণি পরিবর্তন, অনিয়ম এবং অতিরিক্ত ঘুষ আদায়ের ফলে একদিকে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। মাঝে মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এসব সিন্ডিকেট ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও এদের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। এমনই এক দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন ঢাকার ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দৈনিক হাজিরা ৬০ টাকা মজুরির উমেদার মো. আশিক উদ্দিন। সূত্র মতে, দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে কাজ করার সুবাদে উমেদার আশিক গড়ে তুলেছেন নিজের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আগত দলিলদাতা-গ্রহিতা ও দলিল লেখকদের জিম্মি করে এবং সাব-রেজিস্ট্রারের সাথে আঁতাত করে তিনি প্রতিদিন অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
সম্প্রতি সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর ও তৎকালীন দুর্নীতিবাজ আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের উমেদার মো. আশিক উদ্দিনের বিরুদ্ধে জাল-জালিয়াতি, গ্রাহক হয়রানি, দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনা, দুর্নীতি এবং সাব-রেজিস্ট্রারের সাথে আঁতাত করে প্রতিনিয়ত রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর জমা পড়েছে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, দৈনিক মাত্র ৬০ টাকা মজুরিতে সাবেক সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মাধ্যমে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে আশিক উদ্দিন ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসকে জিম্মি করে রেখেছেন। তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের অধীন ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস যেন দুর্নীতির এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, আর এই অনিয়মের মূল কারিগর খোদ উমেদার আশিক উদ্দিন। পদবিতে ছোট হলেও ক্ষমতার দাপটে তিনিই অফিসের ‘অঘোষিত সাব-রেজিস্ট্রার’। তার ইশারা ছাড়া ফাইলে কলম চালান না খোদ সাব-রেজিস্ট্রারও।
ঘুষ, জালিয়াতি এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে আশিক উদ্দিন এই অফিসকে নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসার কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছেন। সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশনে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতে সহযোগিতা, রেজিস্ট্রি বহির বালাম বইয়ে ঘষামাজা, মূল দলিলের পাতা গায়েব করা এবং নতুন পৃষ্ঠা সংযোজনসহ বিভিন্ন জালিয়াতিপূর্ণ কার্যক্রম তার কাছে ডালভাত। এসব উমেদারের রয়েছে একটি অলিখিত রেট-চার্ট। সাব-রেজিস্ট্রারের খাসকামরা থেকে রেকর্ড রুম পর্যন্ত উমেদারদের রয়েছে অবাধ প্রবেশাধিকার, যার কারণে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের প্রতিটি পর্যায়ে তার একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অভিযোগকারী জানান, উমেদার আশিকের সাঙ্কেতিক ভাষাতেই নিয়ন্ত্রিত হয় এই দপ্তরের রেজিস্ট্রি ও নকল প্রদান কার্যক্রম। সাধারণ নামজারি, সাব-কবলা দলিল বা হেবা দলিলের ক্ষেত্রে সরকারি ফির বাইরে মোটা অঙ্কের ঘুষের অলিখিত রেট নির্ধারণ করে তিনি সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেন।
ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তিনি অফিসের সহকারী, পিওন ও নকলনবিশদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে রেখেছেন, ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দ করার সাহস পান না। তিনি প্রকাশ্যে কর্মকর্তার টেবিল-চেয়ারে বসে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে অবৈধ ঘুষের লেনদেন করেন। দলিলের পাতা ছিঁড়ে ফেলা, ভলিউম পরিবর্তন, দাগ ও খতিয়ান পরিবর্তন, জমির শ্রেণি বদল, রেজিস্ট্রেশনের সময় গ্রাহককে হয়রানি এবং সামান্য কাজের জন্যও টাকা আদায় করার মাধ্যমে তিনি প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন। এভাবে অবৈধ পথে অর্জিত অর্থে তিনি রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং গ্রামের বাড়ি ফেনিতে নিজের ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন, যার সঠিক অনুসন্ধান করলে এই দুর্নীতির থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
এর আগেও বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে অন্যত্র বদলি করা হলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অল্প দিনের মধ্যে তিনি পুনরায় ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ফিরে আসেন। ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর চারটি দলিল (নম্বার ২৮১৯, ২৮২০, ২৮২১ এবং ২৮২২) রেজিস্ট্রি সম্পাদনে উমেদার আশিকের দালাল সিন্ডিকেটের সরাসরি হস্তক্ষেপে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ পেলে তৎকালীন গুলশানের সাব-রেজিস্ট্রারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, উক্ত দলিল বাবদ কোনো ভ্যাট ও উৎস কর প্রদান করা হয়নি, ফলে সরকারি কোষাগারে প্রায় ১৪ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় ব্যাহত হয়। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বরের ৬৮৪ সংখ্যক স্মারকে উমেদার মো. আশিককে শ্যামপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে বদলি করা হলেও, অল্প সময়ের ব্যবধানে তদবির ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের উৎকোচ দিয়ে তিনি পুনরায় ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ফিরে আসেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল ১৫০৬ নম্বর দলিলের দুই লাখ তিপান্ন হাজার টাকা ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আত্মসাৎ করেন এই উমেদার।
ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতির এই জাদুর কাঠির ইশারায় উমেদার আশিকের গঠিত সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে সেবাগ্রহীতা থেকে শুরু করে সাব-রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকরাও তার কাছে জিম্মি। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর এই সিন্ডিকেট ভাঙতে, সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ করতে এবং উমেদারদের অবৈধ দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নেওয়া জরুরি। মন্ত্রণালয়ে দাখিলকৃত এই অভিযোগের বিষয়ে মতামত জানতে ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের উমেদার মো. আশিক উদ্দিনের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি কোনো অনিয়মের সাথে জড়িত নন বলে দাবি করে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এ ছাড়া ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নবনিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার টিনু চাকমার নিকট উমেদার মো. আশিক উদ্দিনের দুর্নীতি ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নিজস্ব প্রতিবেদক: 























