ঢাকা ০৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
‘আমার দেশ’ পত্রিকা ছেঁড়ার ঘটনায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে: গোলাম পরওয়ার বাগেরহাটের রামপালে জাতীয় যুব দিবস পালিত, যুব ঋণের চেক বিতরণ তাহসিফের সঙ্গে থাকা সেই তরুণী ৪ দিনের রিমান্ডে পিএসসির নতুন সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন অধ্যাপক শামীমা সুলতানা অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস শেফালীর দুদকের জালে প্রকৌশলী শামসুল আরেফিন, ঢাকায় ফেরার রহস্য কী? বড়লেখা মোহাম্মদীয়া ফাজিল মাদ্রাসার নবনির্মিত চারতলা ভবনের উদ্বোধন এবার ঢাকা মেডিকেলের ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পে প্রকৌশলী মাসুদ রানার নজর সৌদিতে হত্যা করে মরুভূমিতে বালুচাপা, জসিমের মরদেহ এলো দেশে নওগাঁয় রাতভর ডিবি পুলিশের অভিযানে ২৪ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ৪
গণপূর্তে ৫ কোটি টাকার ভুয়া বিলের অভিযোগ

এবার ঢাকা মেডিকেলের ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পে প্রকৌশলী মাসুদ রানার নজর

সরকারি কোষাগারের মেগা প্রজেক্টের শত কোটি টাকা হরিলুট, টেন্ডার বাণিজ্যে একচ্ছত্র সিন্ডিকেট এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিল পাস করে নামে-বেনামে রূপকথার সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পরও বিতর্কিত লটারির মাধ্যমে অতি গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের বহুল আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা। দুর্নীতির পাহাড়ি নথিতে দুদকের ফাইল ভারী হওয়া এবং স্পর্শকাতর বিভিন্ন জাতীয় স্থাপনায় অনিয়মের জন্ম দেওয়া এই প্রকৌশলী এবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের তিন শ কোটি টাকার বিশাল উন্নয়ন প্রকল্পকে টার্গেট করে লুটপাটের ষোলকলা পূর্ণ করার চূড়ান্ত ছক কষেছেন। নীতি-নৈতিকতা ও আইনকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাঁর এই বেপরোয়া কার্যক্রমে গোটা প্রকৌশলী মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৭তম বিসিএস (গণপূর্ত ক্যাডার) কর্মকর্তা মাসুদ রানা দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে ক্ষমতার পালাবদলে নিজের অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখে গণপূর্তের লোভনীয় ডিভিশনগুলো একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলীর আত্মীয়তার পরিচয় এবং বিগত সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সান্নিধ্য ব্যবহার করে তিনি এতদিন দাপটের সঙ্গে নানা অনিয়ম চালিয়ে গেছেন। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে খোলস পাল্টে নতুন সিন্ডিকেটের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন এবং কথিত লটারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্প্রতি মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগে বদলি হয়ে আসেন।

বিগত সময়ে শেরেবাংলা নগর ৩ নম্বর ডিভিশন, রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ঠিকাদারদের ওটিএম (Open Tendering Method) পদ্ধতিতে কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এ রকম দেড় শতাধিক ওটিএম আইডির মধ্যে কতিপয় হচ্ছে- ১৩১২৮৬৩, ১৩১৩০৩৫, ১৩১২৭৫৪, ১৩১২৮৭৭, ১৩১২৮১৫, ১২৯৫৬৪৪, ১২৯৫৬৫১, ১২৮৪৫৮৯, ১২৮৪৩৯৭, ১২৪৭৯৭১, ১২৮২৩৪৮, ১২৮৩৭৫১, ১২৮৩২৩৯, ১২৮২২৯৭, ১২৭৫৬৩৮, ১২৮২৩৫০, ১২৮২২৫৩, ১২৮১১৭৪, ১২৮২৩৩০, ১২৮২১৩৩, ১২৭৫৫৭০, ১২৮৩৩৭৭, ১২৭৫২৬৯, ১২৭৫৬৩২, ১২৭৫৪৭৮, ১২৮৪৫৯৭, ১২৮৪৬৫৮, ১২৮৩৫৬৮, ১২৮৩৭২০, ১২৭৫৪০২, ১২৭৫৫২৮, ১২৮৪৭৭৩, ১২৭৫৪২৯, ১২৭৪৩৯৯, ১২৮৪৭৯০, ১২৭৫৬১২, ১২৭৮৬৩২, ১২৭২৮৪২, ১২৭২৮১৮, ১২৭২৭৭৭, ১২৭২৮৩৩, ১২৭২৭২৩, ১২৪৪৪৬১, ১২৫২৮৯৮, ১২৫২৭৫৪, ১২৫২৯২৯, ১২৪৭৯৮৯, ১২৪৮০০৪, ১২৫২৭২৩, ১২৩৬০৭৫, ১১২৫১৩০. ১১২৫১২২, ১১২৫০৭৬, ১১২০৯১৪, ১১১৭১১৯, ১১১৪৯৮৪, ১১০৪৮৪১, ১০৯৯৯৪৭, ১০৯০৬০৭, ১০৭০৫১২. ১১২৪৯১৫, ১০৮৮৯০৬, ১০৯৩৪০৬, ১০৯৩৩৮৮, ১০৯২৩২৭, ১০৯২২৫৪, ১০৯২২০৭, ১০৯১৭৫০, ১০৯১৭২৭, ১০৯১৬৫৭, ১০৯৪৭৩৭, ১০৯৪৭৫৬, ১০৯৪৭৭৪, ১০৯৪৭৭০ ও ১০৯৪৭৬১, ১০৩৫৯১০, ১০৩৫৯৩৩, ১০৩৫৯৮৯, ১০৩৬১২৯, ১০৩৬১৪৬, ১০৩৬৪১৫, ১০৩৬৯৫৮, ১০৩৭১৩৪। এ রকম আরও শতাধিক টেন্ডার আইডি। এর মধ্যে ২০১৯ সালে জিকে শামীম গ্রেপ্তারের পর শেরেবাংলা নগর এনবিআর ভবনের গুদামে থাকা প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার নির্মাণসামগ্রী ও বৈদ্যুতিক ক্যাবল লোপাটের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাইকোর্ট, বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং মুগদা হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নামে-বেনামে কাজ দেখিয়ে এবং কন্টিনজেন্সি খাতের ৭০ শতাংশ অর্থ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করার চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, প্রকৌশলী মাসুদ রানা প্রশাসনিক ক্ষমতা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নিজের পছন্দের সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। সুপ্রিম কোর্ট এনেক্স ভবনের ভেতরের রংকরণের টেন্ডারে (১০৩৫৯৮৯ নম্বর আইডি) যোগ্যতম প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে বেশি দরদাতা দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ‘হোসেন এন্টারপ্রাইজ’ নামক মাসুদ রানার নিজ ভাগ্নিজামাইয়ের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। একইভাবে শেরেবাংলা নগরে এনবিআর ভবনের বিভিন্ন সংস্কার ও অভ্যন্তরীণ কাজের নামে সাড়ে ৯ কোটি টাকা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেট্রোফিটিং ও অভ্যন্তরীণ সড়ক সংস্কারের ১৮ কোটি টাকার কাজে প্রাক্কলন দ্বিগুণ দেখিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাধারণ ঠিকাদার ও সচেতন মহল আরও জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন দমনে আর্থিক সহায়তা জোগানের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন দপ্তরে তাঁর বিরুদ্ধে নাম-বেনামে ঢাকা ও পাবনায় শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে এতসব গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ থাকার পরও তিনি রহস্যজনক কারণে বহাল তবিয়তে থেকে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৩০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন।

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (পিপিএ) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী সরকারি প্রাক্কলন, টেন্ডার প্রক্রিয়াকরণ এবং বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কঠোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও প্রকৌশলী মাসুদ রানার কার্যক্রমে এর চরম ব্যত্যয় ঘটেছে। তাঁর নিয়ন্ত্রিত দেড় শতাধিক ওটিএম আইডি ও বিভিন্ন কাজের ম্যালেরিয়াঝরা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এপিপির নিয়মকে পাশ কাটানো হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৩ সালের জুনে হাতিরঝিল-রামপুরা-ডেমরা মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্পে অধিগ্রহণকৃত জমির স্থাপনার মূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি দেখিয়ে অর্ধশতাধিক কোটি টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার বেহাল দশাকেই ফুটিয়ে তোলে। সমবায় ও ক্রয় নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সুপরিকল্পিত উপায়ে সরকারি কোষাগারের অর্থ হরিলুট করার এমন সুসংগঠিত জালিয়াতি প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

অভিযুক্ত প্রকৌশলী মাসুদ রানার এ ধরনের বেপরোয়া দুর্নীতি ও মেগা প্রজেক্ট দখলের প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকলে দেশের স্বাস্থ্যখাত এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, সরকারি তহবিলের অপচয় রোধ এবং প্রশাসনিক সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হলে এ ধরনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

উপসংহারে বলা যায়, কেবল বদলি বা সাময়িক লটারির মারপ্যাঁচে পার পাওয়ার সুযোগ না রেখে দুদক ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৌশলী মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত দুর্নীতির নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর অবৈধ সাম্রাজ্য ও সিন্ডিকেটের শিকড় উৎপাটন করতে না পারলে সরকারি অর্থের হরিলুট ঠেকানো সম্ভব হবে না, যা রাষ্ট্রের সার্বিক অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। (প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় অভিযুক্ত প্রকৌশলী মাসুদ রানার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।)

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘আমার দেশ’ পত্রিকা ছেঁড়ার ঘটনায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে: গোলাম পরওয়ার

গণপূর্তে ৫ কোটি টাকার ভুয়া বিলের অভিযোগ

এবার ঢাকা মেডিকেলের ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পে প্রকৌশলী মাসুদ রানার নজর

আপডেট সময় ০৪:২১:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

সরকারি কোষাগারের মেগা প্রজেক্টের শত কোটি টাকা হরিলুট, টেন্ডার বাণিজ্যে একচ্ছত্র সিন্ডিকেট এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিল পাস করে নামে-বেনামে রূপকথার সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পরও বিতর্কিত লটারির মাধ্যমে অতি গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের বহুল আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা। দুর্নীতির পাহাড়ি নথিতে দুদকের ফাইল ভারী হওয়া এবং স্পর্শকাতর বিভিন্ন জাতীয় স্থাপনায় অনিয়মের জন্ম দেওয়া এই প্রকৌশলী এবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের তিন শ কোটি টাকার বিশাল উন্নয়ন প্রকল্পকে টার্গেট করে লুটপাটের ষোলকলা পূর্ণ করার চূড়ান্ত ছক কষেছেন। নীতি-নৈতিকতা ও আইনকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাঁর এই বেপরোয়া কার্যক্রমে গোটা প্রকৌশলী মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৭তম বিসিএস (গণপূর্ত ক্যাডার) কর্মকর্তা মাসুদ রানা দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে ক্ষমতার পালাবদলে নিজের অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখে গণপূর্তের লোভনীয় ডিভিশনগুলো একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলীর আত্মীয়তার পরিচয় এবং বিগত সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সান্নিধ্য ব্যবহার করে তিনি এতদিন দাপটের সঙ্গে নানা অনিয়ম চালিয়ে গেছেন। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে খোলস পাল্টে নতুন সিন্ডিকেটের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন এবং কথিত লটারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্প্রতি মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগে বদলি হয়ে আসেন।

বিগত সময়ে শেরেবাংলা নগর ৩ নম্বর ডিভিশন, রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ঠিকাদারদের ওটিএম (Open Tendering Method) পদ্ধতিতে কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এ রকম দেড় শতাধিক ওটিএম আইডির মধ্যে কতিপয় হচ্ছে- ১৩১২৮৬৩, ১৩১৩০৩৫, ১৩১২৭৫৪, ১৩১২৮৭৭, ১৩১২৮১৫, ১২৯৫৬৪৪, ১২৯৫৬৫১, ১২৮৪৫৮৯, ১২৮৪৩৯৭, ১২৪৭৯৭১, ১২৮২৩৪৮, ১২৮৩৭৫১, ১২৮৩২৩৯, ১২৮২২৯৭, ১২৭৫৬৩৮, ১২৮২৩৫০, ১২৮২২৫৩, ১২৮১১৭৪, ১২৮২৩৩০, ১২৮২১৩৩, ১২৭৫৫৭০, ১২৮৩৩৭৭, ১২৭৫২৬৯, ১২৭৫৬৩২, ১২৭৫৪৭৮, ১২৮৪৫৯৭, ১২৮৪৬৫৮, ১২৮৩৫৬৮, ১২৮৩৭২০, ১২৭৫৪০২, ১২৭৫৫২৮, ১২৮৪৭৭৩, ১২৭৫৪২৯, ১২৭৪৩৯৯, ১২৮৪৭৯০, ১২৭৫৬১২, ১২৭৮৬৩২, ১২৭২৮৪২, ১২৭২৮১৮, ১২৭২৭৭৭, ১২৭২৮৩৩, ১২৭২৭২৩, ১২৪৪৪৬১, ১২৫২৮৯৮, ১২৫২৭৫৪, ১২৫২৯২৯, ১২৪৭৯৮৯, ১২৪৮০০৪, ১২৫২৭২৩, ১২৩৬০৭৫, ১১২৫১৩০. ১১২৫১২২, ১১২৫০৭৬, ১১২০৯১৪, ১১১৭১১৯, ১১১৪৯৮৪, ১১০৪৮৪১, ১০৯৯৯৪৭, ১০৯০৬০৭, ১০৭০৫১২. ১১২৪৯১৫, ১০৮৮৯০৬, ১০৯৩৪০৬, ১০৯৩৩৮৮, ১০৯২৩২৭, ১০৯২২৫৪, ১০৯২২০৭, ১০৯১৭৫০, ১০৯১৭২৭, ১০৯১৬৫৭, ১০৯৪৭৩৭, ১০৯৪৭৫৬, ১০৯৪৭৭৪, ১০৯৪৭৭০ ও ১০৯৪৭৬১, ১০৩৫৯১০, ১০৩৫৯৩৩, ১০৩৫৯৮৯, ১০৩৬১২৯, ১০৩৬১৪৬, ১০৩৬৪১৫, ১০৩৬৯৫৮, ১০৩৭১৩৪। এ রকম আরও শতাধিক টেন্ডার আইডি। এর মধ্যে ২০১৯ সালে জিকে শামীম গ্রেপ্তারের পর শেরেবাংলা নগর এনবিআর ভবনের গুদামে থাকা প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার নির্মাণসামগ্রী ও বৈদ্যুতিক ক্যাবল লোপাটের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাইকোর্ট, বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং মুগদা হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নামে-বেনামে কাজ দেখিয়ে এবং কন্টিনজেন্সি খাতের ৭০ শতাংশ অর্থ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করার চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, প্রকৌশলী মাসুদ রানা প্রশাসনিক ক্ষমতা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নিজের পছন্দের সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। সুপ্রিম কোর্ট এনেক্স ভবনের ভেতরের রংকরণের টেন্ডারে (১০৩৫৯৮৯ নম্বর আইডি) যোগ্যতম প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে বেশি দরদাতা দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ‘হোসেন এন্টারপ্রাইজ’ নামক মাসুদ রানার নিজ ভাগ্নিজামাইয়ের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। একইভাবে শেরেবাংলা নগরে এনবিআর ভবনের বিভিন্ন সংস্কার ও অভ্যন্তরীণ কাজের নামে সাড়ে ৯ কোটি টাকা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেট্রোফিটিং ও অভ্যন্তরীণ সড়ক সংস্কারের ১৮ কোটি টাকার কাজে প্রাক্কলন দ্বিগুণ দেখিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাধারণ ঠিকাদার ও সচেতন মহল আরও জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন দমনে আর্থিক সহায়তা জোগানের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন দপ্তরে তাঁর বিরুদ্ধে নাম-বেনামে ঢাকা ও পাবনায় শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে এতসব গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ থাকার পরও তিনি রহস্যজনক কারণে বহাল তবিয়তে থেকে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৩০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন।

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (পিপিএ) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী সরকারি প্রাক্কলন, টেন্ডার প্রক্রিয়াকরণ এবং বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কঠোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও প্রকৌশলী মাসুদ রানার কার্যক্রমে এর চরম ব্যত্যয় ঘটেছে। তাঁর নিয়ন্ত্রিত দেড় শতাধিক ওটিএম আইডি ও বিভিন্ন কাজের ম্যালেরিয়াঝরা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এপিপির নিয়মকে পাশ কাটানো হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৩ সালের জুনে হাতিরঝিল-রামপুরা-ডেমরা মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্পে অধিগ্রহণকৃত জমির স্থাপনার মূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি দেখিয়ে অর্ধশতাধিক কোটি টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার বেহাল দশাকেই ফুটিয়ে তোলে। সমবায় ও ক্রয় নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সুপরিকল্পিত উপায়ে সরকারি কোষাগারের অর্থ হরিলুট করার এমন সুসংগঠিত জালিয়াতি প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

অভিযুক্ত প্রকৌশলী মাসুদ রানার এ ধরনের বেপরোয়া দুর্নীতি ও মেগা প্রজেক্ট দখলের প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকলে দেশের স্বাস্থ্যখাত এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, সরকারি তহবিলের অপচয় রোধ এবং প্রশাসনিক সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হলে এ ধরনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

উপসংহারে বলা যায়, কেবল বদলি বা সাময়িক লটারির মারপ্যাঁচে পার পাওয়ার সুযোগ না রেখে দুদক ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৌশলী মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত দুর্নীতির নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর অবৈধ সাম্রাজ্য ও সিন্ডিকেটের শিকড় উৎপাটন করতে না পারলে সরকারি অর্থের হরিলুট ঠেকানো সম্ভব হবে না, যা রাষ্ট্রের সার্বিক অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। (প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় অভিযুক্ত প্রকৌশলী মাসুদ রানার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।)