কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে শীতের আগমনে শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। ভোরের ঘাসে শিশির, মাঠের বুকে হালকা কুয়াশা আর বাতাসে শীতের মিষ্টি আভাস। হেমন্তের এই স্নিগ্ধ সকালে সুস্বাদু খেজুরের রস সংগ্রহে গাছিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। গ্রামবাংলায় শুরু হয়েছে এক চিরচেনা কর্মযজ্ঞ।
কাঁধে দা, হাতে দড়ি নিয়ে খেজুরগাছের ডালে ডালে ব্যস্ত গাছিরা। কেউ গাছের শুকনো ডালপালা পরিষ্কার করছেন, কেউ চেঁছে নিচ্ছেন গাছের নির্দিষ্ট অংশ। দুপুর থেকে শুরু হয় খেজুরগাছে হাঁড়ি বাঁধার কাজ। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁরা এ কাজে ব্যস্ত থাকেন। কয়েক সপ্তাহের অপেক্ষা শেষে সেই গাছ থেকেই ঝরবে মিষ্টি রস। ভোরের আলো ফোটার আগেই মাটির হাঁড়িভর্তি রস নিয়ে মেঠোপথ ধরে বাড়ি ফিরবেন গাছিরা।
বাড়ির উঠানে রস জ্বালানোর সঙ্গে বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে খেজুরের গুড়ের ম-ম ঘ্রাণ। তৈরি হবে শীতের পিঠা-পায়েস। পূর্ণতা পাবে গ্রামবাংলার চিরায়ত উৎসব।
খেজুরের রস শুধু একটি পানীয় নয়, এটি এ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির পরিচয়। শীতের আগমনী বার্তায় সেই ঐতিহ্যকে ঘিরেই নতুন করে স্বপ্ন বুনছেন মনোহরগঞ্জের গাছি, কৃষক ও উদ্যোক্তারা।
ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে খেজুরগাছ প্রস্তুতের প্রথম ধাপ। আর তিন সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে রস সংগ্রহ। এরপর রস থেকে গুড় তৈরি এবং চাল দিয়ে পায়েস রান্নার ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠবে গ্রামবাংলা।
বাড়ির পাশে, বাড়ির আঙিনায়, রাস্তার দুই ধারে ও পুকুরপাড়ে রয়েছে অসংখ্য খেজুরগাছ। এসব গাছ থেকে মৌসুমে বিপুল পরিমাণ গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। শীতের কয়েক মাসের এই ঐতিহ্যবাহী কর্মযজ্ঞ এখন শুধু স্বাদ ও সংস্কৃতির বিষয় নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিরও বড় সম্ভাবনা।
খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু হয় গাছ পরিচর্যার মধ্য দিয়ে। আশ্বিনের শেষ ভাগ থেকে কার্তিকের শুরুতে গাছিরা খেজুরগাছের শুকনো ডালপালা পরিষ্কার করেন। এরপর গাছের নির্দিষ্ট অংশ চেঁছে নরম শাঁস বের করে দেওয়া হয়। স্থানীয় ভাষায় এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় গাছ তোলা বা গাছ চাঁছা। গাছের কাটা অংশ শুকিয়ে নেওয়ার পর শুরু হয় রস সংগ্রহের প্রস্তুতি।
নির্দিষ্ট স্থানে কাট দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয় মাটির পাত্র, যা স্থানীয়ভাবে ভাঁড় বা ঠিলে নামে পরিচিত। রাতভর ফোঁটা ফোঁটা রস জমে সেই পাত্রে। ভোরে গাছ থেকে নামানো হয় মিষ্টি রস।
এরপর শুরু হয় রস জ্বালানোর পালা। উনুনের আগুনে ধীরে ধীরে ঘন হতে থাকা রসের রং বদলায়, ছড়িয়ে পড়ে মিষ্টি সুবাস। রসের ঘনত্ব ও প্রস্তুতপ্রণালির ওপর নির্ভর করে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের গুড়। পরে সেই গুড় ছাঁচে ঢেলে ঠান্ডা করা হলে জমাট বাঁধে পাটালি। খেজুরের গুড়ের সঙ্গে দুধ, চালের গুঁড়া ও নারকেলের মিশেলে তৈরি পিঠা-পায়েস হয়ে ওঠে শীতের অন্যতম আকর্ষণ।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় যেমন রয়েছে গাছির দক্ষতা ও শ্রম, তেমনি রয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা লোকজ জ্ঞান। তবে সময়ের পরিবর্তনে খেজুরের গুড় তৈরির এই ঐতিহ্য এখন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ারও খুলছে।
চার মাসের পরিশ্রমে লাখ টাকা লাভের আশা
কৃষিকাজে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক এখন বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন। তাঁদের কাছে শীত মৌসুমে খেজুরগাছের পরিচর্যা ও রস সংগ্রহ হয়ে উঠছে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনাময় উৎস।
মৈশাতুয়া ইউনিয়নের গাছি আবুল কালাম জানান, ধান, পাট ও সবজি চাষে পরিশ্রমের তুলনায় লাভ কমে গেছে। শীতকালে নিজের গাছের পাশাপাশি অন্যের খেজুরগাছ ভাগে নিয়ে রস ও গুড় উৎপাদন করলে ভালো আয় করা সম্ভব।
দিকচাঁন্দা গ্রামের গাছি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এক কানি জমিতে ৬০ থেকে ৭০ মণ ধান উৎপাদন হয়। সেই ধান বিক্রি করে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পাওয়া গেলেও সেচ, সার, চারা, শ্রমিক, কাটা ও মাড়াইসহ উৎপাদন খরচ হয় ২৫ হাজার টাকার বেশি। ধান উৎপাদনে সময় লাগে প্রায় চার মাস। অথচ শীত মৌসুমে ১০০টি খেজুরগাছের পরিচর্যা করে রস ও গুড় বিক্রি করলে চার মাসে লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হতে পারে।
মনোহরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সরোয়ার তুষার বলেন, মনোহরগঞ্জে গাছিদের উন্নত ও নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহের বিষয়ে সচেতন করতে উঠান বৈঠক করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাটির কলসের মুখে বিশেষ নাইলন নেট ব্যবহার করে খেজুরের রস সংগ্রহের বিষয়ে গাছিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে বাদুড় বা অন্য পাখির মাধ্যমে রস দূষিত হওয়ার ঝুঁকি কমবে। নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহ নিশ্চিত করা গেলে ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে এবং মনোহরগঞ্জে খেজুরের রসের সুনাম আরও বিস্তৃত হবে।
আবদুর রহিম-মনোহরগঞ্জ (কুমিল্লা) প্রতিনিধি 



















