জুলাই আমার কাছে কেবল একটি মাস নয়—এটি জীবনের সবচেয়ে তীব্র, ভয়ংকর, গৌরবময় এবং অবিস্মরণীয় স্মৃতি।
জুলাইজুড়ে, এমনকি ৫ আগস্ট পর্যন্তও, বেশিরভাগ সময় আমার সঙ্গে স্মার্টফোন ছিল না। প্রতিদিন ভোরে চিটাগাং রোড থেকে বের হতাম। পথে পথে মোবাইল ফোন তল্লাশি হতো, তাই অনেক সময় নিরাপত্তার স্বার্থে ফোন সঙ্গে রাখাই সম্ভব হতো না।
সাইনবোর্ড, মাতুয়াইল, রায়েরবাগ, শনিরআখড়া—এসব এলাকা তখন যেন একেকটি যুদ্ধক্ষেত্র। সেই রাস্তাগুলোতেই হেঁটে হেঁটে মিছিলে অংশ নিয়েছি, স্লোগান দিয়েছি, ছাত্র-জনতাকে সাহস ও প্রেরণা দিয়েছি। সুযোগ পেলেই কিছু ছবি তুলে ফেসবুকে প্রকাশ করেছি, আবার নিরাপত্তার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছবি নিজ হাতেই ফোনের মেমোরি থেকে মুছে ফেলতে হয়েছে।
কতবার পুলিশের ধাওয়ায় আহত হয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই। রায়েরবাগে জ্বলন্ত লাশ দেখেছি, চোখের সামনে অচেনা মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে শহীদ হতে দেখেছি। শত শত আহত মানুষের আর্তনাদ শুনেছি। তবুও ভয় আমাদের থামাতে পারেনি। এক অদম্য বিশ্বাস, এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি প্রতিদিন রাজপথে ফিরিয়ে এনেছে।
কখনো অলিগলি পেরিয়ে, কখনো হানিফ ফ্লাইওভার ধরে পল্টনের রাজনৈতিক মিছিলে, সেখান থেকে শাহবাগের ছাত্র-জনতার সমাবেশে, তারপর শহীদ মিনারে—এভাবেই কেটেছে দিনের পর দিন। দিনের শেষে পার্টি অফিস হয়ে দুর্গম পথ পেরিয়ে বাসায় ফিরেছি। ক্লান্তি ছিল, ঝুঁকি ছিল, কিন্তু ভয় ছিল না। যেন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ছুটে চলা এক অদম্য নেশা।
জুলাই আমাকে আরেকটি বাংলাদেশ দেখিয়েছে। দেখেছি ডান-বাম, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়েছে। দেখেছি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কওমি ও আলিয়ার শিক্ষার্থীরা সব মতভেদ ভুলে এক পতাকার নিচে, এক স্বপ্নে, এক সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সেই ঐক্যই ছিল জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।
জুলাই কোনো ব্যক্তি, কোনো দল বা কোনো সংগঠনের একক কৃতিত্ব নয়। এটি ছিল অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগ, সাহস ও প্রতিরোধের ফসল। জুলাই শেষ হলেও আন্দোলনের উত্তাপ থামেনি। আগস্টের ৪ তারিখ পর্যন্ত পল্টন, বিজয়নগর ও শাহবাগে রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে চলমান মিছিলে স্লোগান দিয়েছি, মানুষকে সাহস জুগিয়েছি। সেই সময় রিকশাচালকেরাও ছিলেন নীরব যোদ্ধা। জীবন বাজি রেখে তারা আন্দোলনকারীদের বহন করেছেন, পাশে থেকেছেন। অথচ আজ তাদের কথা খুব কমই উচ্চারিত হয়। কিন্তু পল্টন, বিজয়নগর, নাইটিঙ্গেল মোড়, শাহবাগ—এসব রাজপথ তাদের সাহসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
আজ আমার মোবাইলের গ্যালারিতে সেই সময়ের অনেক মূল্যবান ছবি নেই। হয়তো কোনো অচেনা মানুষের ফোনে সেগুলো এখনো সংরক্ষিত আছে। তবুও যখন জুলাইয়ের প্রদর্শনীতে বা অন্য কারও সংগ্রহে সেই দিনগুলোর ছবি দেখি, হৃদয় ভরে যায়। আবার গভীর এক আফসোসও কাজ করে—নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর অনেক স্মৃতিই হারিয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় কষ্ট, যে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে আমরা রাজপথে নেমেছিলাম, সেই পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু তাই বলে সেই আত্মত্যাগ, সেই রক্ত, সেই ঐক্য এবং সেই স্বপ্নকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যায় না।
আমার কাছে জুলাই কেবল ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়; এটি সাহসের নাম, আত্মত্যাগের নাম, ঐক্যের নাম, প্রতিরোধের নাম এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্নের নাম।
শহীদদের রক্তের ঋণ ভুলে যাওয়া যাবে না। আহতদের ত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। লাখো মানুষের সংগ্রাম ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।
জুলাইকে ব্যর্থ হতে দেব না। কখনোই না।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























