জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল ও পার্শ্ববর্তী পাঁচবিবি উপজেলায় সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। একাধিক ঘটনায় সরকারি যানবাহন পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, সাংবাদিককে গাড়ি চাপার চেষ্টা ও প্রাণ নাশের হুমকি এবং প্রশাসনিক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ক্ষেতলাল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পলাশ চন্দ্র ছুটির দিনে তার জন্য বরাদ্দকৃত ঢাকা মেট্রো-ঠ ১২-০৭৯৯ নম্বরের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে বগুড়ায় যান। ফেরার পথে মোকামতলার জয়পুরহাট মোড়ে সাংবাদিকরা গাড়িটি থামিয়ে কোথায় গিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি উত্তর না দিয়ে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিককে চাপা দিতে চেষ্টা করেন। ওই সাংবাদিক সরে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।
পরে প্রতিবেদকের মোবাইলে একটি নম্বর থেকে কল আসে। কলকারী নিজেকে রাজনৈতিক দলের নেতা পরিচয় দিয়ে গাড়ির ছবি তোলার কারণ জানতে চায় এবং ‘দুই পা কেটে নেওয়া’ ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হুমকি দাতা উপজেলা প্রাণী সম্পদ ও ভেটেনারি হাসপাতালের এলএসপি আব্দুল আলিম।
এছাড়া ক্ষেতলাল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের জন্য বরাদ্দকৃত জয়পুরহাট ঘ–১১-০০১৩ নম্বরের সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সানজিদা চৌধুরীর স্বামী নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে ইউএনওর বাসভবন থেকে গাড়িটি বের হয়ে ৫ টার দিকে বগুড়ার চারমাথা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছায়। সেখানে ইউএনওর স্বামী রাকিবুল হাসানকে ময়মনসিংহগামী বাসে তুলে দিয়ে গাড়িটি পুনরায় ক্ষেতলালে উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
এ বিষয়ে গাড়ির চালক আশরাফুল ইসলামকে ফোন করে কৌশলে ভাতিজা পরিচয় দিয়ে কথা হলে প্রথমে তিনি জানান, স্যারের স্বামীকে বগুড়ায় রেখে বাসায় এসে কথা বলবো। প্রায় ৪৫ মিনিট পর আবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, স্যারকে গাড়িতে তুলে দিয়েছি। এখন চারমাথা থেকে দুপচাঁচিয়া হয়ে ক্ষেতলালে রওনা দেব।
পরে সন্ধ্যা ৬টার দিকে গাড়িটি ইটাখোলা বাজারে এসে পৌঁছলে স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, গাড়িটি সার্ভিসিংয়ের জন্য বগুড়ায় নেওয়া হয়েছিল। তবে কোন গ্যারেজে সার্ভিসিং করা হয়েছে এ সংক্রান্ত কোনো ভাউচার দেখাতে পারেননি তিনি। এ সংক্রান্ত ভিডিও ও বক্তব্য প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
এর আগে, ক্ষেতলাল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক সাজ্জাদ পারভেজ সরকারি গাড়ি নিয়ে প্রমোদভ্রমণে গিয়েছিলেন। সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) তাকে মৌখিকভাবে সতর্ক করেন।
একই দিন বিকেল ৫ টার দিকে ওই মোকামতলার জয়পুরহাট মোড়েই আরও একটি সরকারি গাড়ি আসে, যার নম্বর ঢাকা মেট্রো ঘ ১৪-৮৭৯৬, যা পাঁচবিবি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম আহমেদ–এর নামে বরাদ্দকৃত। গাড়িতে ইউএনও নিজে ছিলেন না; তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
গাড়ির চালক মফিদুল ইসলাম সাংবাদিককে জানিয়েছেন, ‘আমি তো তা বলতে পারবো না। আমাকে ইউএনও স্যার বলেছেন এনেছি। স্যার গাড়িতে নেই, উনার মিসেস আর পরিবার আছে।’ এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে- সরকারি গাড়ি পরিবার বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার কতটা আইনসঙ্গত এবং অনুমতি ছাড়া এটি কতটা গ্রহণযোগ্য।
সরকারি বিধি অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা তার কর্মস্থলের বাইরে উর্ধতনের পূর্বানুমতি ছাড়া যেতে পারবেনা। অনুমতি ছাড়া সরকারি যানবাহন ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল। একাধিক অভিযোগের ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সচেতন মহলে প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবাদিক ও স্থানীয় নাগরিকরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, স্পষ্ট প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, স্বচ্ছ তদন্ত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা ছাড়া জনআস্থা ও সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা পলাশ চন্দ্র রায়কে বারবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। অন্যদিকে তার নাম্বারে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা চৌধুরী বলেন, আমি গাড়িটি সার্ভিসিংয়ে পাঠিয়েছিলাম, তখন আমার হাসবেন্ডকে নামিয়ে দিয়েছে। আমার কাছে গ্যারেজের স্লিপ আছে। ড্রাইভারের স্লিপ দিতে পারেনি বললে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তার কাছে উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তার সরকারি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আপনার থেকে জানলাম। উনার সাথে কথা বলে বিষয় জেনে আপনাকে জানাতে পারবো।
ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা চৌধুরীর স্বামী রাকিবুল হাসানের কাছে গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনাকে সেটা বলতে হবে কেন? এবিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিতে চাচ্ছি না, আপনি ইউএনওর সাথে কথা বলেন। পাঁচবিবি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম আহমেদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য কল করা হলে তিনি প্রতিবেদকের পরিচয় শুনে কল কেটে দেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার মো. মহির উদ্দিন বলেন, গাড়ির বিষয়ে আমার সাথে তিনি কোনো কথা বলেননি। সরকারি গাড়ি নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। হুমকি দেওয়াসহ সব খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক মো. আল মামুন বলেন, ইউএনওরা আমাকে জানিয়ে ছিলেন, গাড়িগুলো রিপিয়ারিংয়ে পাঠিয়েছিল। গাড়িতে ওনাদের পরিবার ছিলো বললে তিনি বলেন, সেটা জানিনা তবে আমাকে রিপিয়ারিংয়ের কথাই জানানো হয়েছিলো। আর প্রাণী সম্পদ অফিসারের বিষয়টি তার কন্ট্রোলিং অফিসারকে জানান, তিনি বিষয়টি দেখবেন। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, আপনি বিষয়টি জেলা প্রশাসক সাহেবের সাথে কথা বলেন। আপনি বললেন, আমি শুনলাম, খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























