ঝিনাইদহ জেলা এবং আশেপাশের এলাকায় সাবরেজিস্ট্রার রিপন মুন্সি নিয়ে অভিযোগের ঢেউ বইছে। স্থানীয় সূত্র এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঝিনাইদহ জেলা রেজিস্টার সাব্বিরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রিপন মুন্সি তিনটি সাবরেজিস্ট্রার অফিসে দায়িত্ব পালন করার সময় নানা ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত আছেন। সাধারণ মানুষ অভিযোগ করছেন, তিনি সরকারি দায়িত্বের বাইরে বেআইনি আর্থিক লেনদেন, ঘুষ নেওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নারী নির্যাতন করছেন।
রিপন মুন্সি ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলার সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বেপরোয়া চাঁদাবাজীতে লিপ্ত ছিলেন। স্থানীয় গ্রাহক এবং দলিল লেখকেরা অভিযোগ করেছেন, তার কাছে সরকারি ফি ছাড়া কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। তিনি শুধু টাকা পেলে কাজ করেন এবং তা না হলে সেবা প্রত্যাশীদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। ঘুষের এই চক্রের মধ্যে তিনি শুধু নিজেই নয়, নিজের পছন্দের লোক নিয়োগ দিয়ে একধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। সূত্র জানায়, তিনি নিজের অধীনে থাকা কর্মীদেরও ঘুষ আদায়ের কাজে যুক্ত করেছেন।
প্রাথমিকভাবে রিপন মুন্সি অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটরের পদে নিয়োগ পান। তারপর তিনি কেরানি পদে উন্নীত হন। কেরানি পদে থাকাকালীন তিনি ঘুষের মাধ্যমে বড় ধরনের অর্থ উপার্জন করেন এবং রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হয়ে ওঠেন। অবৈধ এই অর্থের মাধ্যমে তিনি একাধিক হেড ক্লার্ককে পাশ কাটিয়ে সরাসরি সাবরেজিস্ট্রারের পদে বসেন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা সীমিত; তিনি কেবল এসএসসি পাশ করেছেন। তবে চাকরি নেয়ার সময় ভুয়া এইচএসসি পাসের সনদ দেখিয়ে নিয়োগ পান এবং এরপর থেকে তার পদোন্নতি ও আর্থিক ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
রিপন মুন্সির বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। নকল নবিশ এবং সুন্দরীদের বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখানো হয়। রাজি না হলে তাদের উপর মানসিক ও শারীরিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। পূর্বে যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলায় সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে থাকা অবস্থায় তিনি এক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন। ভুক্তভোগী নারী এই ঘটনায় যশোর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল-১ এ মামলা দায়ের করেন। মামলার নং ৪৭/২০২১। ঝিনাইদহে কার্যক্রম চলাকালীন তিনি এখনও একই ধরনের আচরণ চালিয়ে যাচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, রিপন মুন্সি টাকা ছাড়া কোনো কাজই করেন না। বেআইনকেই আইনে পরিণত করার কাজে তিনি পারদর্শী। তিনি দুই জেলার তিনটি সাবরেজিস্ট্রি অফিস একাই পরিচালনা করছেন। প্রতিটি অফিসে ঘুষের জন্য নির্ধারিত রেট অনুযায়ী টাকা আদায় করেন। কবলা দলিল থেকে শুরু করে কোটি টাকার কমিশন দলিল পর্যন্ত, তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন। দলিল লেখক, গ্রাহক বা দাতাকে বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করা হয়। তার কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ এবং ভীতি বিরাজ করছে।
ঝিনাইদহ জেলা রেজিস্টার সাব্বিরও তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত। তবে কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। রিপন মুন্সি যোগদানের পর অতীতের ঘুষ লেনদেনের রেকর্ডও ধ্বংস করেছেন। তিনি দলিলের ধরন অনুযায়ী মোটা অংকের ঘুষ ধার্য করেন। কমিশন দলিলের ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ টাকা না দিলে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে হয়রানি করা হয়।
সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়িয়ে ঘুষের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। উদাহরণস্বরূপ, সাধারণ কবলা দলিলের জন্য দেড় থেকে পাঁচ হাজার টাকা, ১০ লাখ টাকার দলিলে প্রতি লাখে ৫০০ টাকা, ১০ লাখের বেশি হলে প্রতি লাখে ৪০০ টাকা, এবং এক কোটির বেশি হলে আলোচনার মাধ্যমে রেট নির্ধারণ করা হয়। ওয়ারেশ সম্পত্তি হলে মাথাপ্রতি ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়। দলিল না হলে ৮ থেকে ২০ হাজার, সমস্যা থাকলে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়।
হিন্দুদের জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে তিনি ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। প্রাথমিকভাবে অপারগতা দেখানো হয়, পরে দলিল লেখকের মাধ্যমে গ্রাহককে একান্তে ডেকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। প্রতিটি হিন্দু জমি রেজিস্ট্রিতে দুই লাখ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। কমিশন দলিলের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন এক থেকে চার লাখ টাকা, নকল দলিলের জন্য ২০০ টাকা, এবং দলিল লেখকের লাইসেন্স নবায়নের জন্য মোটা অংকের অর্থ নেওয়া হয়।
রিপন মুন্সি সপ্তাহের বিভিন্ন দিন তিনটি উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন। রোব ও সোমবার মনিরামপুর, মঙ্গলবার কেশবপুর, বুধ ও বৃহস্পতিবার কালীগঞ্জ। কালীগঞ্জে তার ঘুষ আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন নকল নবিশ সাহেব আলী, মনিরামপুরে মোহরার শরীফ, কেশবপুরে ওমেদার মোদন।
পূর্ববর্তী সময়ে তিনি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। বর্তমানে দুই জেলা রেজিস্ট্রারের খুটির জোরে হলেও ঘুষ খাওয়া ও ক্ষমতার অপব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। সরকারের নির্ধারিত ফি ছাড়িয়ে তিন থেকে সাত গুণ অর্থ আদায় এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়াও তার কর্মকাণ্ডের অংশ। দানপত্র দলিলের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা হাতানো হচ্ছে, এবং অফিসের মধ্যে ঘুষের টাকা রাখার জন্য রেকর্ডরুম ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০২২ সালে যশোর মনিরামপুরে দায়িত্ব পালনকালে ভারতীয় নাগরিক শৈলন্দ্রনাথ মণ্ডলের জমি রেজিস্ট্রির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। ৩৫ বছর ধরে ভারতে বসবাসকারী শৈলন্দ্রনাথ শুধু জন্ম সনদ দেখিয়ে ৮০.৫০ শতাংশ জমি বিক্রি করেন এবং অর্থ ভারতে পাচার করা হয়। এছাড়া সাতক্ষীরায় সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে থাকাকালীন শামীমা আক্তার দীপা নামে এক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে চিকিৎসার জন্য ভারতে অবস্থানকালে দীপাকে সফর সঙ্গী হিসেবে নিয়ে যান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রিপন মুন্সি ঝিনাইদহ, যশোর এবং সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় নিজের ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সরকারি কাজের বাইরে বেআইনি আর্থিক লেনদেন, নারী নির্যাতন এবং অন্যান্য অনৈতিক কার্যকলাপে যুক্ত রয়েছেন। সাধারণ দলিল লেখক এবং সেবা গ্রহীতা তার অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন।
ঝিনাইদহ জেলা রেজিস্ট্রার সাব্বিরের সাথে মোবাইল যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। রিপন মুন্সির মুঠোফোনেও ফোন রিসিভ হয়নি। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, তার কর্মকাণ্ডে জনসাধারণের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা এবং ক্ষোভ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংক্ষেপে বলা যায়, রিপন মুন্সি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ, যশোরের মনিরামপুর ও কেশবপুরে দায়িত্ব পালনকালে ঘুষের মাধ্যমে বৈষম্য, অর্থনৈতিক অনিয়ম এবং নারী নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন। তার কর্মকাণ্ডে সরকারি দলিল ফাঁকি, রাজস্ব লুট এবং নারী নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড স্থানীয় মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে এবং প্রশাসনিক নীরবতার কারণে অব্যাহত রয়েছে।
উপরের সব তথ্য যাচাই করা না হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সূত্র এবং আদালতের মামলা নথি মিলিয়ে দেখা গেছে যে, রিপন মুন্সির কর্মকাণ্ড ঝিনাইদহ এবং আশেপাশের এলাকায় দীর্ঘদিনের একটি সংকট তৈরি করেছে। তার নিযুক্ত সিন্ডিকেট, ঘুষ আদায় ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সাধারণ দলিল লেখক এবং গ্রাহকরা নিয়মিত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, হিন্দুদের জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
মোটামুটি, রিপন মুন্সি শুধু ঝিনাইদহ ও যশোরের বিভিন্ন উপজেলার সাবরেজিস্ট্রার পদে দায়িত্ব পালন করছেন না, তিনি নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন এবং নারীদের উপর অত্যাচারের মাধ্যমে একটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। তার কর্মকাণ্ড স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























