বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নাম আছে, যেগুলো ব্যক্তি পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে একটি যুগ, একটি ধারার প্রতীক হয়ে ওঠে। তারেক রহমান তেমনই এক নাম। দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন তেমনই একটি ঘটনা, যা একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। এই প্রত্যাবর্তন ব্যক্তি তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে হলেও এর অভিঘাত পড়বে দলীয় রাজনীতি, ক্ষমতার ভারসাম্য, গণতন্ত্রের চর্চা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন শব্দটি নতুন নয়। কিন্তু দীর্ঘ নির্বাসন, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মামলা সংকট ও অনবরত বিতর্কের মধ্য দিয়ে কোনো রাজনৈতিক নেতার পুনরায় কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ফিরে আসা এমন ঘটনা বিরল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন তাই কেবল একটি ব্যক্তির দেশে ফেরা নয় এটি একটি রাজনৈতিক ধারার পুনরুজ্জীবন, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি প্রধান শক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতা ও বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দলটি ক্ষমতার বাইরে, নেতৃত্বের একটি অংশ নির্বাসনে, আর সাংগঠনিক কাঠামো নানা চাপে জর্জরিত ছিল। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য যেমন নতুন আশার আলো, তেমনি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ সামরিক শাসনের ছায়া কাটিয়ে দলীয় গণতন্ত্রে স্থিতি খুঁজছিল। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে বিএনপির ভেতরে তাঁর ক্রমবর্ধমান প্রভাব তাঁকে কেবল দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী হিসেবেই নয়, বরং একটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক সংগঠকের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। তিনি রাজনীতিতে এনেছিলেন কৌশলগত চিন্তা, মাঠপর্যায়ের সংগঠনের ওপর জোর এবং ক্ষমতার বাস্তব রাজনীতির কঠোর পাঠ। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল আধুনিকায়নের ইঙ্গিত। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের গুরুত্ব বোঝার জন্য সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা জরুরি। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, বিরোধী রাজনীতির সংকোচন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে একটি প্রধান বিরোধী দলের কার্যকর নেতৃত্বের অনুপস্থিতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। তারেক রহমানের সক্রিয় উপস্থিতি দলীয় সিদ্ধান্ত, কৌশল নির্ধারণ ও রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণে বিরোধী রাজনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক পরিসরেও নজর কেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও মানবাধিকার নিয়ে বৈশ্বিক আগ্রহের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আওতায়। নির্বাসন শেষে কোনো রাজনৈতিক নেতার দেশে ফিরে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া আন্তর্জাতিক মহলে একটি বার্তা দেয় রাজনীতি চূড়ান্তভাবে স্থবির নয়, পরিবর্তনের সুযোগ এখনও বিদ্যমান। একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত নেতৃত্বের রূপান্তরে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবারকেন্দ্রিক দলীয় নেতৃত্ব একটি পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু সময় বদলেছে। তরুণ ভোটার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর জনমত এবং বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক মানদণ্ড রাজনীতিকে আগের চেয়ে বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের ভূমিকা তিনি কি অতীতের রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশলে ফিরবেন, নাকি নতুন সময়ের দাবির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেকে পুনর্গঠন করবেন এ প্রশ্নের উত্তরই তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রকৃত তাৎপর্য নির্ধারণ করবে। দলীয় রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য একটি সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বড় দল হিসেবে বিএনপি সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখলেও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় এক ধরনের স্থবিরতার অভিযোগ শুনেছে। তারেক রহমান যদি প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দলকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা, নীতিনির্ভর কর্মসূচি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন, তবে তা কেবল বিএনপির নয়, সমগ্র রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্যও ইতিবাচক হতে পারে। কারণ কার্যকর বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র প্রাণবন্ত হয় না। রাষ্ট্রীয় রাজনীতির বৃহত্তর পরিসরে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। দীর্ঘদিন একক আধিপত্য বা সীমিত প্রতিযোগিতার যে অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনীতিকে ঘিরে আছে, সেখানে একটি শক্তিশালী, সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠিত বিরোধী শক্তির উপস্থিতি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে। এতে সংসদীয় বিতর্ক, নীতিনির্ধারণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নতুন গতি পেতে পারে যদি তা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পথে পরিচালিত হয়। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চ্যালেঞ্জও সমানতালে উপস্থিত। প্রথমত, অতীতের বিতর্ক ও অভিযোগের ভার বহন করে নতুন করে আস্থা অর্জন সহজ নয়। জনগণ এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন, তথ্যপ্রবাহ দ্রুত, আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি যাচাইয়ের মানদণ্ড কঠোর। তারেক রহমানকে তাই কেবল বক্তব্যে নয়, কর্মসূচি ও নীতিগত স্পষ্টতায় প্রমাণ করতে হবে যে তিনি পরিবর্তিত সময়ের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এসব বিষয়ে সুসংহত ও বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা জরুরি। দ্বিতীয়ত, বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন একটি বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলে দলীয় কাঠামো শিথিল হয়, নেতৃত্বে বিভাজন দেখা দেয়। তারেক রহমানের সামনে কাজ হলো দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, তৃণমূলকে সক্রিয় করা এবং তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা। কেবল অতীতের স্মৃতি বা আবেগ দিয়ে নয়, ভবিষ্যতমুখী রাজনীতির মাধ্যমে দলকে প্রস্তুত করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন একটি অপরিহার্য শর্ত। সংঘাতমুখী রাজনীতি, প্রতিহিংসার রাজনীতি এবং ‘সবকিছু বা কিছুই নয়’ মানসিকতা দেশকে বহুবার সংকটে ফেলেছে। তারেক রহমান যদি সত্যিই একবিংশ শতাব্দীর বিরল রাজনৈতিক অধ্যায়ের নায়ক হতে চান, তবে তাকে সংলাপ, সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির পথে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু নয়, ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হবে প্রকৃত প্রত্যাবর্তনের সার্থকতা। এখানেই আসে প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। ইতিহাসে আমরা দেখেছি নেলসন ম্যান্ডেলা, লেহ ভালেসা বা বেনজির ভুট্টোর মতো নেতাদের প্রত্যাবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার হবে। তিনি যদি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করেন, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ন্যায্য করেন এবং নাগরিকের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে ধাবিত হযন তবে তা সত্যিই একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে বিরল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন একবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি প্রতীকী মুহূর্ত। এটি অতীত ও ভবিষ্যতের সংযোগস্থল যেখানে পুরোনো অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রত্যাশা মুখোমুখি দাঁড়ায়। এই প্রত্যাবর্তন যদি গণতন্ত্রের বিস্তার, রাজনৈতিক শালীনতা এবং নীতিনির্ভর প্রতিযোগিতার পথে এগোয়, তবে তা ইতিহাসে ইতিবাচক অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হবে।
লেখকঃ- মোঃ ইউসুফ, সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, বেরোবি।
মোঃ ইউসুফ 

























