সংবাদ শিরোনাম ::
বিধি ভেঙে আরএমও পদায়ন, ‘এম উদ্দিন’ ছদ্মনামে টেস্ট সিন্ডিকেটের অভিযোগ ইডকলে এনামুলের বিরুদ্ধে লুটপাটের রাজত্বের অভিযোগ সওজ কর্মকর্তা শাহনুর রশিদ এখন শতকোটি টাকার মালিক জালিয়াতি করে কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ বাশার-মঞ্জুরুলের বিরুদ্ধে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের সিএন্ডএফ ক্লিয়ারিং বাণিজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দুই মাসে ৫০০ কোটি টাকা মুনাফা টিকে গ্রুপের দেশের ৯ অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়ার শঙ্কা ববিতে লাগামহীন লোডশেডিংয়ে তীব্র ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা- ব্যহত বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম  বড়লেখার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা থেকে ভারতীয় দুটি এয়ারগান জব্দ বাঘায় বিদ্যুত স্পৃষ্টে যুবক নিহত

রহস্যময় গোলাপি লেক, যেখানে বাঁচে না কোনো প্রাণী

  • ফিচার ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:৩৪:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ৭৩৬ বার পড়া হয়েছে

প্রকৃতি সবসময়ই আমাদের বিস্মিত করে। কখনো পাহাড়ে রঙিন খনিজ, কখনো সমুদ্রে জ্বলজ্বলে নীল আলো, আবার কখনো মরুভূমিতে আগুনের গহ্বর। কিন্তু আপনি কি জানেন, পৃথিবীতে এমন একটি হ্রদ আছে, যার পানি স্বাভাবিক নীল বা সবুজ নয় বরং উজ্জ্বল গোলাপি রঙের? শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও সত্যি, অস্ট্রেলিয়ার লেক হিলিয়ার এমনই এক বিস্ময়, যা পৃথিবীর একমাত্র স্থায়ী গোলাপি লেক হিসেবে খ্যাত।

লেক হিলিয়ার অবস্থিত অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলে, মিডল আইল্যান্ডে, যা রিচার্চ আর্কিপেলাগোর অংশ। দ্বীপটি দক্ষিণ মহাসাগরের তীরে অবস্থিত এবং মূল ভূখণ্ড থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। লেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০০ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ২৫০ মিটার। আকারে খুব বড় না হলেও এর গোলাপি রংই এটিকে পৃথিবীর নজরকাড়া এক প্রাকৃতিক বিস্ময়ে পরিণত করেছে।

লেক হিলিয়ারের সবচেয়ে রহস্যময় দিক হলো এর অদ্ভুত গোলাপি রং। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন গবেষণা করে জানিয়েছেন, এই রঙের মূল কারণ হলো ডুনালিয়েলা স্যালাইনা নামের এক ধরনের শৈবাল। এই শৈবাল প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিনয়েড উৎপন্ন করে, যা গাজর বা টমেটোর মতো সবজিতে পাওয়া কমলা-লাল রঙের মতো এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ।

এছাড়া লেকের লবণাক্ত পানিতে বসবাসকারী কিছু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়াও এই রং তৈরি করতে সাহায্য করে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, লেক হিলিয়ারের পানি কেবল উপর থেকে নয়, বোতলে ভরলেও গোলাপি রংই থাকে। অন্য অনেক গোলাপি লেক আছে পৃথিবীতে, যেমন সেনেগালের লেক রেটবা বা অস্ট্রেলিয়ার লেক কেন্ডি, সেগুলোর রং ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায়। কেবল লেক হিলিয়ারই সারাবছর উজ্জ্বল গোলাপি থেকে যায়।

লেক হিলিয়ারের পানিতে লবণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। লেকের চারপাশ ঘিরে আছে সাদা লবণের স্তর এবং ঘন ইউক্যালিপটাস ও মেলালিউকা গাছ। আকাশ থেকে দেখলে চারপাশের সবুজ বন, সাদা লবণ আর গভীর নীল সমুদ্রের মাঝে উজ্জ্বল গোলাপি হ্রদটি এক স্বপ্নময় দৃশ্য তৈরি করে। আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, লেক হিলিয়ারের পানি মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। লবণাক্ততার কারণে এখানে সহজে মাছ বা বড় কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না, কিন্তু পানি স্পর্শ করা বা এতে সাঁতার কাটা বিপজ্জনক নয়।

লেক হিলিয়ার প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৮০২ সালে। ব্রিটিশ নাবিক ম্যাথিউ ফ্লিন্ডার্সের অভিযানের সময়। তিনি এই অদ্ভুত রঙের হ্রদ দেখে বিস্মিত হন এবং তা নিয়ে রিপোর্ট করেন। এরপর থেকে লেক হিলিয়ার পর্যটক ও বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে।

আজ লেক হিলিয়ার অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র। তবে এটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সহজে যাওয়া যায় না। সাধারণত ছোট বিমান বা হেলিকপ্টারে করে পর্যটকরা আকাশ থেকে লেকটি দেখেন। আকাশ থেকে দেখা গোলাপি পানির দৃশ্য নিঃসন্দেহে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। বিশেষ অনুমতি নিয়ে কেউ কেউ দ্বীপে নেমে কাছ থেকে লেকটি দেখতে পারেন। তবে সরকার এর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় কঠোর নিয়ম মেনে দর্শনার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করে।

লেক হিলিয়ার শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, বিজ্ঞানীদের জন্যও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গবেষকরা এর পানির জীবাণু ও শৈবাল নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্যশিল্প বা ওষুধশিল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে। তাছাড়া পৃথিবীর পরিবেশগত বৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রেও এটি এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

প্রকৃতির বিচিত্র রং ও বৈচিত্র্যের নিদর্শন হলো লেক হিলিয়ার। যেখানে সাধারণত আমরা হ্রদকে নীল বা সবুজ হিসেবে কল্পনা করি, সেখানে গোলাপি রঙের এই হ্রদ আমাদের ধারণাকে ভেঙে দেয়। সূর্যের আলোয় ঝলমল করা গোলাপি পানির সঙ্গে চারপাশের সবুজ গাছ ও সাদা লবণ মিলে এটি হয়ে ওঠে এক অনন্য চিত্রকর্ম।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিধি ভেঙে আরএমও পদায়ন, ‘এম উদ্দিন’ ছদ্মনামে টেস্ট সিন্ডিকেটের অভিযোগ

রহস্যময় গোলাপি লেক, যেখানে বাঁচে না কোনো প্রাণী

আপডেট সময় ১২:৩৪:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫

প্রকৃতি সবসময়ই আমাদের বিস্মিত করে। কখনো পাহাড়ে রঙিন খনিজ, কখনো সমুদ্রে জ্বলজ্বলে নীল আলো, আবার কখনো মরুভূমিতে আগুনের গহ্বর। কিন্তু আপনি কি জানেন, পৃথিবীতে এমন একটি হ্রদ আছে, যার পানি স্বাভাবিক নীল বা সবুজ নয় বরং উজ্জ্বল গোলাপি রঙের? শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও সত্যি, অস্ট্রেলিয়ার লেক হিলিয়ার এমনই এক বিস্ময়, যা পৃথিবীর একমাত্র স্থায়ী গোলাপি লেক হিসেবে খ্যাত।

লেক হিলিয়ার অবস্থিত অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলে, মিডল আইল্যান্ডে, যা রিচার্চ আর্কিপেলাগোর অংশ। দ্বীপটি দক্ষিণ মহাসাগরের তীরে অবস্থিত এবং মূল ভূখণ্ড থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। লেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০০ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ২৫০ মিটার। আকারে খুব বড় না হলেও এর গোলাপি রংই এটিকে পৃথিবীর নজরকাড়া এক প্রাকৃতিক বিস্ময়ে পরিণত করেছে।

লেক হিলিয়ারের সবচেয়ে রহস্যময় দিক হলো এর অদ্ভুত গোলাপি রং। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন গবেষণা করে জানিয়েছেন, এই রঙের মূল কারণ হলো ডুনালিয়েলা স্যালাইনা নামের এক ধরনের শৈবাল। এই শৈবাল প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিনয়েড উৎপন্ন করে, যা গাজর বা টমেটোর মতো সবজিতে পাওয়া কমলা-লাল রঙের মতো এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ।

এছাড়া লেকের লবণাক্ত পানিতে বসবাসকারী কিছু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়াও এই রং তৈরি করতে সাহায্য করে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, লেক হিলিয়ারের পানি কেবল উপর থেকে নয়, বোতলে ভরলেও গোলাপি রংই থাকে। অন্য অনেক গোলাপি লেক আছে পৃথিবীতে, যেমন সেনেগালের লেক রেটবা বা অস্ট্রেলিয়ার লেক কেন্ডি, সেগুলোর রং ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায়। কেবল লেক হিলিয়ারই সারাবছর উজ্জ্বল গোলাপি থেকে যায়।

লেক হিলিয়ারের পানিতে লবণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। লেকের চারপাশ ঘিরে আছে সাদা লবণের স্তর এবং ঘন ইউক্যালিপটাস ও মেলালিউকা গাছ। আকাশ থেকে দেখলে চারপাশের সবুজ বন, সাদা লবণ আর গভীর নীল সমুদ্রের মাঝে উজ্জ্বল গোলাপি হ্রদটি এক স্বপ্নময় দৃশ্য তৈরি করে। আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, লেক হিলিয়ারের পানি মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। লবণাক্ততার কারণে এখানে সহজে মাছ বা বড় কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না, কিন্তু পানি স্পর্শ করা বা এতে সাঁতার কাটা বিপজ্জনক নয়।

লেক হিলিয়ার প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৮০২ সালে। ব্রিটিশ নাবিক ম্যাথিউ ফ্লিন্ডার্সের অভিযানের সময়। তিনি এই অদ্ভুত রঙের হ্রদ দেখে বিস্মিত হন এবং তা নিয়ে রিপোর্ট করেন। এরপর থেকে লেক হিলিয়ার পর্যটক ও বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে।

আজ লেক হিলিয়ার অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র। তবে এটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সহজে যাওয়া যায় না। সাধারণত ছোট বিমান বা হেলিকপ্টারে করে পর্যটকরা আকাশ থেকে লেকটি দেখেন। আকাশ থেকে দেখা গোলাপি পানির দৃশ্য নিঃসন্দেহে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। বিশেষ অনুমতি নিয়ে কেউ কেউ দ্বীপে নেমে কাছ থেকে লেকটি দেখতে পারেন। তবে সরকার এর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় কঠোর নিয়ম মেনে দর্শনার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করে।

লেক হিলিয়ার শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, বিজ্ঞানীদের জন্যও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গবেষকরা এর পানির জীবাণু ও শৈবাল নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্যশিল্প বা ওষুধশিল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে। তাছাড়া পৃথিবীর পরিবেশগত বৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রেও এটি এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

প্রকৃতির বিচিত্র রং ও বৈচিত্র্যের নিদর্শন হলো লেক হিলিয়ার। যেখানে সাধারণত আমরা হ্রদকে নীল বা সবুজ হিসেবে কল্পনা করি, সেখানে গোলাপি রঙের এই হ্রদ আমাদের ধারণাকে ভেঙে দেয়। সূর্যের আলোয় ঝলমল করা গোলাপি পানির সঙ্গে চারপাশের সবুজ গাছ ও সাদা লবণ মিলে এটি হয়ে ওঠে এক অনন্য চিত্রকর্ম।